
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: দিনমজুরি আর গৃহশিক্ষকতা করে একসময় সংসার চালাতেন তিনি। সকাল থেকে মাথায় ঝুড়ি নিয়ে পাথর তোলা, গাড়িতে পাথর বোঝাই করার মতো কঠিন পরিশ্রমের পরও পরিবারের মুখের দিকে তাকিয়ে সন্ধ্যায় ভাঙা সাইকেলে ছুটে যেতেন ছোটদের পড়াতে। সংসারের ন্যূনতম চাহিদা মেটাতে বছরের পর বছর এমন সংগ্রামের জীবন কাটাতে হয়েছিল তাঁকে। শুনলে মনে হতে পারে কোনও সিনেমার চিত্রনাট্য। কিন্তু এটি কোনও কাল্পনিক গল্প নয়। এটি বীরভূমের পাথর ব্যবসার অন্যতম আলোচিত নাম টুলু মণ্ডল ওরফে মহম্মদ নাজিবুদ্দিনের জীবনের শুরুর দিকের কাহিনি বলে দাবি স্থানীয়দের। বর্তমানে হাজার কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক হিসেবে যাঁকে নিয়ে চর্চা হয়, কয়েক দশক আগে তাঁর জীবন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কীভাবে সেই কঠিন পরিস্থিতি থেকে উঠে এসে তিনি বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুললেন, তা নিয়েই এখন নানা প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষ করে তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও সোনা উদ্ধারের পর সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। পুলিশ সূত্রে দাবি, উদ্ধার হওয়া সম্পত্তির সঙ্গে টুলু মণ্ডলের যোগ থাকতে পারে। যদিও বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। জানা গিয়েছে, রাতভর তল্লাশি চালানোর পর মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছে প্রায় সাড়ে ২৮ কোটি টাকা নগদ এবং ১৫ কেজি সোনা। এরপর বৃহস্পতিবার সকালে পুলিশ মিনার মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করে। উদ্ধার হওয়া টাকা ও সোনা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে এবং তাঁর বাড়ি সিল করে দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের নজরে আসা মিনার মণ্ডল এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে টুলু মণ্ডলের কর্মী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। স্থানীয়দের মতে, তাঁর জীবনযাত্রায় একসময় বিশেষ কোনও চাকচিক্য ছিল না। পরিবারের দাবি, মিনারের ছেলের চাকরি রয়েছে এবং মেয়ের বিয়ে হয়েছে এক শিক্ষকের সঙ্গে। এলাকায় তাঁর ভাবমূর্তিও ছিল সাধারণ মানুষের মতোই। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও মিনার মণ্ডল উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থায় বাস চালকের কাজ করতেন। পরে সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছাবসর নিয়ে টুলু মণ্ডলের পাথর ব্যবসার দায়িত্ব সামলাতে শুরু করেন তিনি। টুলু মণ্ডলের ইজারা নেওয়া কয়েকটি ডিসিআর (ডুপ্লিকেট চালান রিসিপ্ট) গেটের মধ্যে রায়পুরের গেট পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন মিনার। মহম্মদবাজার থানা এলাকার ডেউচা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় তাঁর দোতলা বাড়ি রয়েছে। বাইরে থেকে দেখলে বাড়িটি সাধারণ বলেই মনে হলেও, সেখান থেকেই এত বিপুল পরিমাণ টাকা ও সোনা উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
এক সরকারি কর্মী থেকে পাথর ব্যবসায়ীর ঘনিষ্ঠ ম্যানেজার হয়ে ওঠার মধ্যেই বদলে গিয়েছিল মিনারের জীবন, এমনটাই দাবি স্থানীয়দের। তবে আচমকা এই বিপুল সম্পত্তির উৎস নিয়ে এখন তদন্ত শুরু হয়েছে। মিনারের পরিবারের দাবি, উদ্ধার হওয়া টাকা বা সোনার সঙ্গে তাঁদের কোনও সম্পর্ক নেই। তাঁর স্ত্রীও জানিয়েছেন, তাঁদের নিজস্ব কোনও বড় সম্পত্তি নেই, সামান্য পেনশনের টাকাতেই সংসার চলে। তাহলে কোথা থেকে এল এত এত টাকা? মিনারের স্ত্রীর দাবি, ঘটনার সূত্রপাত বছর খানেক আগে। টুলু মণ্ডল নিজে গিয়ে নাকি তাঁদের বাড়িতে রেখে এসেছিলেন ট্রাঙ্ক। জানিয়েছিলেন তাতে প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র রয়েছে। তালাবন্ধ সেই ট্রাঙ্কের চাবি নাকি টুলুর কাছেই ছিল। ফলে মিনার বা পরিবারের অন্যদের কারও আন্দাজও ছিল না যে বাড়িতে এত টাকা ও সোনা রয়েছে। বুধবার পুলিশ তল্লাশি চালানোয় নাকি টাকার বিষয়টা জানতে পারেন সকলে। মিনারের স্ত্রীর কথায়, তাঁর স্বামী কিছুই জানতেন না, অথচ গ্রেপ্তার হতে হল!
উল্লেখ্য, মিনারের বাড়িতে বিপুল টাকা উদ্ধারের পরই উঠে এসেছিল টুলু মণ্ডলের নাম। কারণ, অনুব্রত ঘনিষ্ঠ এই পাথর ব্যবসায়ীর ম্যানেজার হিসেবেই কাজ করতেন মিনার। আর টুলুর সম্পত্তির আন্দাজ কমবেশি সকলেরই রয়েছে। তৃণমূল আমলে বীরভূম জেলায় বেআইনি পাথর ও বালির ব্যবসার বেতাজ বাদশা হয়ে উঠেছিলেন টুলু মণ্ডল। নকল ডিসিআর (ডুপ্লিকেট চালান রিসিপ্ট) বানিয়ে দৈনিক কয়েক কোটি টাকা রোজগার করতেন তিনি। সেই টাকার ভাগ তৃণমূল আমলে দলের জেলা থেকে রাজ্য নেতৃত্ব পর্যন্ত সব জায়গাতেই পৌঁছে যেত বলেও অভিযোগ। বিধানসভা ভোটের আগে নিউটাউনে একটি গাড়ি থেকে ৫ কোটি টাকা উদ্ধার করে এসটিএফ, সেই ঘটনাতেও নাম জড়িয়েছিল টুলু মণ্ডলের। ২০২২ সালে একটি খুনের মামলায় টুলু মণ্ডলকে গ্রেপ্তারও করে মহম্মদবাজার থানার পুলিশ। খুন, হুমকি, অস্ত্র প্রদর্শন, ঝামেলায় উসকানি-সহ একাধিক ধারায় তার বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়। বছর দুয়েক আগে বলিউডের তারকাদের উপস্থিতিতে সিউড়িতে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে টুলু মণ্ডলের মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানও অনেকেরই নজর কেড়েছিল। যা নিয়ে সরব হয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী সহ অনেকেই।
অন্যদিকে, পুলিশ পুরো ঘটনার তদন্ত চালাচ্ছে। উদ্ধার হওয়া সম্পত্তির প্রকৃত মালিক কে এবং এর উৎস কোথায়, তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারীরা। এই ঘটনায় বীরভূমের পাথর ব্যবসা ও তার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
