
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: কর্মক্ষেত্র, পরিবার কিংবা বন্ধুদের আড্ডা— জীবনের কোনও না কোনও পর্যায়ে অপমানের মুখোমুখি হতে হয় প্রায় সকলকেই। কারও কটূক্তি, তাচ্ছিল্য বা অপ্রত্যাশিত মন্তব্য মুহূর্তের মধ্যে রাগ বাড়িয়ে দেয়। তখনই পাল্টা জবাব দেওয়ার প্রবল ইচ্ছা হয়। কিন্তু মনোবিদদের মতে, সেই মুহূর্তে আবেগের বশে প্রতিক্রিয়া দেখানো অনেক সময় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বরং অপমানের পরের মাত্র ১০ সেকেন্ডই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেউ অপমান করলে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশ দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে না ভেবেই অনেক সময় এমন কথা বা কাজ করে ফেলি, যার জন্য পরে অনুশোচনা হয়। তাই প্রথম ১০ সেকেন্ড নিজেকে শান্ত রাখা, গভীর শ্বাস নেওয়া এবং পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করা অত্যন্ত জরুরি। প্রাচীন ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তক চাণক্যও তাঁর নীতিবাক্যে আত্মসংযমের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, যে ব্যক্তি ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে নিজের বিচারবুদ্ধিকেও দুর্বল করে ফেলে। অপমানের মুহূর্তে সংযম বজায় রাখতে পারলে নিজের মর্যাদা যেমন অক্ষুণ্ণ থাকে, তেমনই সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হয়।
মনোবিদদের পরামর্শ, অপমানের জবাব সবসময় সঙ্গে সঙ্গে দিতে হবে এমন কোনও নিয়ম নেই। প্রয়োজনে কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকুন, ধীরে ধীরে শ্বাস নিন, পরিস্থিতি মূল্যায়ন করুন এবং তারপর প্রয়োজন হলে শান্তভাবে নিজের বক্তব্য তুলে ধরুন। এতে অযথা বিবাদ এড়ানো যায় এবং মানসিক চাপও অনেকটাই কমে।
∆ প্রতিক্রিয়া জানানোর আগে অপমানটিকে বুঝুন: সব অপমান এক রকম নয়। কিছু মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে উসকানি দেয়, শুধু আপনার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। কারও আবার কটু কথা বলার স্বভাব থাকে। আবার অনেকে নিজের হতাশা-রাগ অন্যের দিকে ছুড়ে দেয়।
প্রথমেই নিজেকে প্রশ্ন করুন—
* যে বলেছে, তার মতামত কি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ?
* কোথায় বলা হয়েছে? অফিসের মিটিংয়ে সবার সামনে অপমান আর ব্যক্তিগত পরিসরে বলা কটু কথার প্রভাব এক নয়।
* কথাটির মধ্যে সত্য রয়েছে কি? এটাই সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন, তাই বেশিরভাগ মানুষ এড়িয়ে যান।
∆ অনুভূতিকে নাম দিন: স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী জেমস গ্রসের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, নিজের অনুভূতির নামকরণ করলে তার তীব্রতা কমে যায়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় অ্যাফেক্ট লেবেলিং (Affect Labelling)। অন্য কাউকে বলতে হবে না, নিজের মনে নির্ধারণ করুন যে অপমানটির ফলে আপনার যে অনুভূতি, তা কোন পর্যায়ে পড়ে? খারাপ লাগা, রাগ নাকি অপ্রস্তুত লাগা?
অনুভূতি দমন করলে ভেতরে চাপ তৈরি করে। কিন্তু বোঝার চেষ্টা করলে তা ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসে। আপনার সামনে থাকা মানুষটি এই অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া দেখতে পায় না। শুধু দেখে, আপনি অপমানের পড়েও ভেঙে পড়েননি। অনেক সময়েই পেশাগত ও সামাজিক পরিবেশে এই স্থিরতা আত্মবিশ্বাসের পরিচয় হিসেবে ধরা হয়। একটি তীক্ষ্ণ জবাব হয়তো মুহূর্তের জয় এনে দিতে পারে। কিন্তু সংযত প্রতিক্রিয়া মানুষের মনে আপনার সম্পর্কে দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক ধারণা তৈরি করে।
