
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: দিঘা মানেই নীল জলরাশি আর জনসমুদ্রের চেনা ছবি। কিন্তু সেই ভিড় থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে, মীরগোদা গ্রামের নিস্তব্ধতায় লুকিয়ে আছে এক প্রাচীন রহস্য। সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন দেবী লঙ্কেশ্বরী। প্রায় দুই হাজার বছরের পুরনো জনশ্রুতি আর লোকগাথা এই মন্দিরকে ঘিরে আবর্তিত হয়। পর্যটনের মানচিত্রে মীরগোদা হয়তো প্রচারের আলো পায়নি, কিন্তু এখানকার মাটির পরতে পরতে মিশে আছে এক প্রাচীন বিশ্বাস। স্থানীয়দের কাছে লঙ্কেশ্বরী কেবল আরাধ্যা দেবী নন, তিনি এই জনপদের রক্ষাকর্ত্রী এবং শেষ আশ্রয়।
লোকমুখে শোনা যায়, আজ থেকে বহু শতাব্দী আগে লঙ্কেশ্বরী দেবীর আগমন হয়। কথিত আছে, লঙ্কাধিপতি রাবণের অত্যাচারে ক্ষুব্ধ হয়ে দেবী লঙ্কা ছেড়ে সমুদ্রপথে পাড়ি দেন। একটি নৌকায় চেপে তিনি বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে এসে পৌঁছে যান মীরগোদায়। সেই থেকেই এই অঞ্চলে তাঁর অবস্থান।লিখিত কোনও তথ্য না পাওয়া গেলেও, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই বিশ্বাস আজও অটুট।
এক সময় এই মন্দির ছিল সমুদ্রের একেবারে ধারে। তখন এই এলাকায় ছোট বন্দর ছিল, দূরদেশের বণিক আর নাবিকদের যাতায়াত ছিল নিয়মিত। লঙ্কেশ্বরী দেবী তাঁদের যাত্রাপথে তাঁদের রক্ষা করতেন। সমুদ্রে নামার আগে দেবীর কাছে প্রার্থনা না করলে নাকি কেউ যাত্রা করত না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্র পিছিয়ে গিয়েছে, বদলেছে সব কিছু। তবে লঙ্কেশ্বরী দেবীর প্রতি মানুষের বিশ্বাস আজও অটুট।
ইতিহাস বলছে, বাংলায় কালাপাহাড়ের আক্রমণের সময় বহু প্রাচীন মন্দির ধ্বংস হয়েছিল। লঙ্কেশ্বরী মন্দিরও তার হাত থেকে রেহাই পায়নি। পুরনো মন্দির ধ্বংস হয়ে যায়। পরে প্রায় পাঁচশো বছর আগে স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে বর্তমান মন্দিরটি নির্মিত হয়।এই মন্দিরের সবচেয়ে রহস্যময় দিক হল মন্দিরের ভিতরের একটি গর্ত। জনশ্রুতি অনুযায়ী কান পাতলে এখান থেকে আজও শোনা যায় সমুদ্রের গর্জন। কখনও কখনও নাকি জলও দেখা যায় সেই গর্তে। অনেকে বিশ্বাস করেন, এটি দেবীর সমুদ্রযাত্রার স্মৃতি।অনেকে বলেন দেবী মূর্তি ভালো ভাবে দেখলে বোঝা যায় তিনি বিষ্ণুর বরাহ অবতারের রূপ। মন্দির খননে মিলবে প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ বলে বিশ্বাস অনেকের।এখানে আসা ভক্তরাও দেবীর মহিমায় আপ্লুত। কেউ বলেন বহুদিনের অসুখ সেরেছে, কেউ বলেন চাকরি হয়েছে, কেউ বা বলেন জীবনের অন্ধকার সময়ে এখানে এসে শান্তি পেয়েছেন।আজ দিঘা বেড়াতে এলে অনেকেই একটু সময় বের করে মীরগোদার লঙ্কেশ্বরী মন্দিরে আসেন। কেউ ভক্তি নিয়ে, কেউ কৌতূহল নিয়ে। সমুদ্রের ঢেউ আর লোককথার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই মন্দির যেন বলে সব ইতিহাস বইয়ে লেখা থাকে না, কিছু ইতিহাস মানুষের মনে বেঁচে থাকে।
