
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: ২০০৭ সাল। সঙ্গীতের মঞ্চে তখন এক নতুন তারকার উত্থান। স্টার প্লাসের জনপ্রিয় গানের রিয়্যালিটি শো ‘স্টার ভয়েস অব ইন্ডিয়া’-র গ্র্যান্ড ফিনালেতে একের পর এক প্রতিভাবান প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে সেরার শিরোপা জিতে নেন পাঞ্জাবের মাত্র ১৯ বছরের তরুণ ইশমিত সিং। বিচারকের আসনে ছিলেন অলকা ইয়াগনিক, অভিজিৎ ভট্টাচার্য এবং আদেশ শ্রীবাস্তবের মতো তারকারা। ফাইনালে হার্শিত সাক্সেনাকে হারিয়ে রাতারাতি জাতীয় স্তরে পরিচিত হয়ে ওঠেন ইশমিত। কিন্তু সেই সাফল্যের রেশ কাটতে না কাটতেই তাঁর জীবনে নেমে আসে মর্মান্তিক পরিণতি। জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছনোর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই ২০০৮ সালের জুলাই মাসে মালদ্বীপে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে মৃত্যু হয় এই তরুণ গায়কের।
‘স্টার ভয়েস অব ইন্ডিয়া’-র বিজয়ের পর ইশমিতকে ‘ছোট উস্তাদ’ অনুষ্ঠানের কয়েকজন খুদে প্রতিযোগীর সঙ্গে মালদ্বীপে একটি কনসার্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ২০০৮ সালের ২৯ জুলাই একটি বিলাসবহুল রিসোর্টের সুইমিং পুলে ‘ছোট উস্তাদ’-এর শিশু প্রতিযোগী ব্যোমের সঙ্গে ছিলেন ইশমিত। আচমকাই খবর ছড়িয়ে পড়ে, পুলের জলে ডুবে গিয়েছেন তিনি। দ্রুত তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি। চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রাথমিক ময়নাতদন্তের রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ডুবে যাওয়ার কথাই উঠে আসে। রিপোর্ট অনুযায়ী, তাঁর ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রে জল ঢুকে গিয়েছিল। অর্থাৎ আপাতদৃষ্টিতে ঘটনাটি নিছক একটি দুর্ঘটনা বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের মনে শুরু থেকেই ছিল একাধিক প্রশ্ন। ইশমিত সাঁতার জানতেন— এমন দাবি ছিল পরিবারের। তাহলে একজন সাঁতার জানা তরুণ কীভাবে আচমকা সুইমিং পুলে ডুবে গেলেন? এই প্রশ্ন থেকেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় সন্দেহের জটিলতা। ইশমিতের কাকা চরণ কমল চড্ডা প্রকাশ্যে দাবি করেন, তাঁর ভাইপোর মৃত্যু শুধুমাত্র দুর্ঘটনা নয়; এর পেছনে ষড়যন্ত্র থাকতে পারে।
ইশমিতের মৃত্যুর মাত্র দু’সপ্তাহ আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার কথাও সামনে আনেন তাঁর কাকা। তাঁর দাবি, ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই মুম্বাই থেকে পুনে যাওয়ার সময় ইশমিতের গাড়িকে লক্ষ্য করে একটি অন্য গাড়ি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এসে চালকের দিক থেকে ধাক্কা মারে। সংঘর্ষে গাড়িটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান ইশমিত। পরিবারের সন্দেহ ছিল, ওই ঘটনাটি নিছক পথ দুর্ঘটনা ছিল না। বরং মালদ্বীপের ঘটনার সঙ্গে এর কোনও যোগসূত্র ছিল কি না, সেই প্রশ্নও উঠতে শুরু করে।
মালদ্বীপের রিসোর্টে ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়েও তৈরি হয় রহস্য। ইশমিতের কাকার বক্তব্য অনুযায়ী, পুলে পড়ার আগে তাঁর উপর আঘাত করা হয়ে থাকতে পারে। ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে তিনি সেখানে উপস্থিত খুদে প্রতিযোগী ব্যোমের সঙ্গে কথা বলেছিলেন বলেও দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য, শিশুটির সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁর মনে হয়েছিল, কেউ যেন আড়াল থেকে উত্তর বলে দিচ্ছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নিয়েও তৈরি হয় অসঙ্গতি। দলের সদস্য অরুণিমা নামে এক প্রতিযোগী দাবি করেছিলেন, তিনি অন্য একটি সুইমিং পুলে ছিলেন এবং তাই ইশমিতের ডুবে যাওয়ার ঘটনা দেখতে পাননি। কিন্তু পরে রিসোর্ট কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই রিসোর্টে নাকি মাত্র একটি সুইমিং পুলই ছিল। ফলে অরুণিমার বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ইশমিত সিংয়ের মৃত্যু তাই শুধু একজন প্রতিশ্রুতিমান তরুণ গায়কের আকস্মিক প্রয়াণের ঘটনা হয়ে থাকেনি। ময়নাতদন্তে ডুবে যাওয়ার কথা বলা হলেও পরিবারের সন্দেহ, মৃত্যুর আগে হামলার ঘটনা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের অসঙ্গতি— সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল একাধিক প্রশ্ন।
আজ এত বছর পরেও ইশমিতের মৃত্যুকে ঘিরে সেই প্রশ্নগুলির সম্পূর্ণ উত্তর মেলেনি। সত্যিই কি এটি ছিল একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, নাকি অকালপ্রয়াত এই তরুণ গায়কের মৃত্যুর আড়ালে লুকিয়ে ছিল অন্য কোনও রহস্য? উত্তরহীন সেই প্রশ্নই আজও ইশমিত সিংয়ের মৃত্যুকে ঘিরে আলোচনার অন্যতম কারণ।
