
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: অনেকের কাছেই বর্ষাকাল মানেই ঘরবন্দি সময়। টানা বৃষ্টি, কাদামাটি আর মেঘলা আকাশের কারণে এই সময় ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে অনেকে দ্বিধায় ভোগেন। তবে প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের মতে, বছরের অন্য যে কোনও সময়ের তুলনায় বর্ষাতেই ভারতের কিছু জায়গা সবচেয়ে বেশি সুন্দর হয়ে ওঠে। বৃষ্টির জলে ধুয়ে-মুছে আরও সবুজ হয়ে ওঠে পাহাড়, জঙ্গল ও উপত্যকা। নদী-ঝরনা পায় নতুন প্রাণ, আর চারপাশের প্রকৃতি যেন রঙিন ক্যানভাসের মতো সেজে ওঠে। ফলে বর্ষাকে ‘অফ সিজন’ না বলে অনেকেই ‘প্রকৃতির সেরা সময়’ বলতেই বেশি পছন্দ করেন।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমন বহু পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে, যেগুলির আসল সৌন্দর্য ফুটে ওঠে বর্ষার দিনে। মেঘে ঢাকা পাহাড়, কুয়াশার চাদরে মোড়া উপত্যকা কিংবা বৃষ্টিভেজা অরণ্যের অপরূপ দৃশ্য পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কারণ। আজকের প্রতিবেদনে রইল এমনই কিছু গন্তব্য।
* কুর্গ, কর্ণাটক বৃষ্টির পর যেন এখানকার হাওয়ার গন্ধ খানিক পালটে যায়। কফিগাছের পাতা, সোঁদা মাটি, লতানে গোলমরিচ গাছের ঝাঁঝ— সব মিলেমিশে এক অনন্য সুঘ্রাণ তৈরি করে। ইরুপ্পু, মাল্লাল্লি, অব্বে জলপ্রপাত নতুন করে গতি পায়। পাহাড়ের কোলে কোলে জমা হয় সাদা মেঘের খণ্ড। বেড়ানোর ফাঁকে রিসোর্টের বারান্দায় বসে কফিতে চুমুক, সঙ্গে নিরন্তর বৃষ্টির আওয়াজ— আহা, স্বর্গসুখ!
* মুন্নার, কেরালা বছরভর সবুজাভ হয়ে থাকে মুন্নার। তবে বৃষ্টির পর যেন তার রূপ আর ধরে না! সবুজ চা-বাগানের মাঝে আঁকাবাঁকা পথ ধরে গাড়ি চলে যখন, পর্যটকের মনে হয়, কোথাও কোনও তাড়া নেই। ধীর, শান্ত জীবন বয়ে চলেছে পাহাড়ি নদীর মতো। লেটচমি টি এসটেটের পথ ধরে হাঁটা যায়, কিংবা পথপ্রান্তের একরত্তি চায়ের দোকানে থেমে বুক ভরে টেনে নেওয়া যায় ভিজে হাওয়া।
* সোহরা, মেঘালয় চোখের নাগালেই ভেসে বেড়ায় রাশি রাশি মেঘ। শ্যাওলা ঢাকা পথে পা ফেলে ফেলে হেঁটে বেড়ান যায় মেঘেদের দেশে। দেখতে পাওয়া যায় গাছের শিকড়ের তৈরি প্রাকৃতিক সেতু, যেন রূপকথা থেকে উঠে আসা কোনও দৃশ্য বাস্তব হয়ে গিয়েছে চোখের সামনে! নিচে বহমান খরস্রোতা নদী। এমন দৃশ্যপটের মাঝে দাঁড়িয়ে বারবার যাচাই করতে ইচ্ছে হয়, সত্যি করেই এমন ঘটছে কি-না!
* জিরো ভ্যালি, অরুণাচল প্রদেশ এক দিকে ধানের জমি, অন্যদিকে পাহাড় ছেয়ে গিয়েছে ঘন পাইনের জঙ্গলে। উপত্যকার খানাখন্দে কুয়াশার ভেলা ভেসে বেড়ায়। মাঝে মাঝে জেগে রয়েছে ছোট পাহাড়ি গ্রাম। দ্রুত ‘সাইট সিয়িং’ নয়, সময় নিয়ে ঘুরে দেখতে হয় এমন জায়গা। অনুভব করতে হয় এখানকার মানুষদের দৈনন্দিন যাপন। আকাশের দিকে মেঘেদের ধীর চলাচল দেখে কেটে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
* ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ারস্ ন্যাশনাল পার্ক, উত্তরাখণ্ড যোশীমঠ থেকে আরও খানিক চড়াই উঠলে, খুঁজে পাওয়া যায় এই লুকানো পার্কটিকে! ইউনেক্সো তালিকায় নাম রয়েছে এই পার্কের। বছরের বেশিরভাগ সময় বরফের চাদর বিছিয়ে থাকে এই এলাকার উপর। কেবল বৃষ্টি পড়লেই সেসব ধুয়ে যায়। বনাঞ্চল জুড়ে সেজে ওঠে রঙের মেলা। প্রিমুলা, অ্যানেমোন, আইরিস— হিমালয়ের পাদদেশ জুড়ে ফুটে থাকে প্রাণপ্রাচুর্যে।
* জুকৌ ভ্যালি, নাগাল্যান্ড-মণিপুর বর্ডার ভারতেই রয়েছি তো? এই উপত্যকায় পৌঁছে হয়তো বিস্ময়ে প্রশ্ন করে বসবেন পর্যটক। বিদেশ ভাবলে যেমন ছবি ভেসে ওঠে চোখে— বিস্তীর্ণ সবুজ উপত্যকা, মাঝে মাঝে ফুটে থাকা হলুদ-গোলাপি বুনোফুল—এই ভ্যালি ঠিক তাই। চারিদিকে পর্বতের সারি। থেকে থেকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টিপাত। তাঁবু খাটিয়ে যদি রাত কাটানো যায়, তবে নীল মহাকাশ জুড়ে তারাদের ফুটে থাকা চাক্ষুষ করা যেতে পারে।
* তীর্থন ও সাইঞ্জ উপত্যকা, হিমাচল প্রদেশ হিমাচলে এলে সাধারণত শরৎকালই বেছে নেয় ভ্রমণার্থী। তবে এই দুই উপত্যকা সবচাইতে বেশি শ্যামল হয়ে ওঠে কেবল বর্ষাকালেই। এখানে ঘিরে রয়েছে পাইন, ওক, দেওদারের জঙ্গল। পরিচ্ছন্ন সচল দীর্ঘ নদী। বিস্তৃত ফলের বাগান। গ্রেট হিমালয়ান ন্যাশনাল পার্কের সদর দুয়ার হিসেবে সেজে রয়েছে এই বনাঞ্চল। বর্ষা শেষে মানালি যাওয়ার পথে চোখে পড়ে এই অপরূপ শোভা।
তাই বৃষ্টিকে ভয় না পেয়ে, প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে বর্ষার সফরে বেরিয়ে পড়তে পারেন আপনিও। কারণ প্রকৃতির সবচেয়ে সতেজ, স্নিগ্ধ ও জীবন্ত রূপের সাক্ষী হওয়ার জন্য বর্ষাকালই হতে পারে আদর্শ সময়।
