
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: কলকাতার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ, অভিনেত্রী চিত্রাঙ্গদা শতরূপার জীবনে এখন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। মাতৃত্বের অপেক্ষায় থাকা এই অভিনেত্রীর ‘সাধ ভক্ষণ’ অনুষ্ঠানে যেন আনন্দের এক আলোকোজ্জ্বল আবহ তৈরি হয়েছিল। হলুদ শাড়ি, হালকা সাজ আর মুখজুড়ে মাতৃত্বের শান্ত আভা— সব মিলিয়ে চিত্রাঙ্গদার বিশেষ দিনটি হয়ে উঠেছিল সত্যিই স্মরণীয়। পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং প্রিয়জনদের উপস্থিতিতে সেই আয়োজন যেন পরিণত হয়েছিল এক উষ্ণ পারিবারিক উৎসবে।
এই অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে নজর কেড়েছিলেন চিত্রাঙ্গদা নিজেই। গোলাপি শাড়িতে মাতৃত্বের কোমল আভা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল তাঁর মুখে। পরনে ছিল স্লিভলেস ব্লাউজ আর ছিমছাম সোনার গয়না— সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন একেবারে সাবলীল অথচ মার্জিত। মায়ের নাম বহন করা এই অভিনেত্রীর চোখেমুখে ফুটে উঠছিল নতুন জীবনের আগমনের আনন্দ ও প্রত্যাশা। অন্যদিকে এই বিশেষ দিনে দিদির পাশে ছিলেন ছোট বোন, টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ঋতাভরী চক্রবর্তী। হলুদ শিফন শাড়িতে তাঁকেও দেখা গেল উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত রূপে। দিদির বেবি বাম্পে কান পেতে যেন নতুন অতিথির আগমনের শব্দ শুনতে চাইছিলেন ঋতাভরী। মাসি হওয়ার আনন্দে তিনি যেন আবেগে ভেসে গিয়েছিলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও সেই মুহূর্তের ছবি ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে ভক্তদের। পরিবারের আনন্দঘন মুহূর্তে দুই বোনের এই স্নেহমাখা দৃশ্য যেন অনেকের মন ছুঁয়ে গেছে।
সাধ ভক্ষণের আয়োজনেও ছিল বাঙালিয়ানা আর ঐতিহ্যের ছোঁয়া। গাঁদা ফুলের পাপড়ি দিয়ে সাজানো থালায় পরিবেশন করা হয়েছিল নানা ধরনের পদ। পাঁচ রকমের ভাজা, ডাল, সুক্তো, বিভিন্ন ধরনের মাছ, সঙ্গে ছিল নানা স্বাদের মিষ্টি— সব মিলিয়ে খাবারের তালিকা ছিল সমৃদ্ধ ও ঐতিহ্যবাহী। পরিবারের প্রবীণদের আশীর্বাদ আর হাসি-আনন্দে সেই অনুষ্ঠান হয়ে উঠেছিল সত্যিই প্রাণবন্ত। এই অনুষ্ঠানের মধ্যেই ঋতাভরী মজার ছলে দিদিকে নতুন নামও দিয়েছেন। তিনি এখন থেকেই চিত্রাঙ্গদাকে ‘সোনা মা’ বলে ডাকছেন। পাশাপাশি জামাইবাবু সম্বিৎ চট্টোপাধ্যায়কে তিনি স্নেহভরে ‘ভালো বাবা’ বলেও সম্বোধন করেছেন। তবে এই আনন্দঘন পরিবেশের মাঝেই সোশ্যাল মিডিয়ায় আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে একটি পুরনো প্রশ্ন। অনেকের মনেই কৌতূহল— একই মায়ের দুই মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও কেন ঋতাভরীর পদবি ‘চক্রবর্তী’ আর চিত্রাঙ্গদার পদবি ‘শতরূপা’?

আসলে এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের এক বিশেষ সিদ্ধান্তে। ঋতাভরী এবং চিত্রাঙ্গদা দুজনেই পর্দার মতো বাস্তব জীবনেও যথেষ্ট আধুনিক এবং প্রগতিশীল চিন্তাধারার মানুষ। চিত্রাঙ্গদা নিজের নামের সঙ্গে মায়ের নামকেই যুক্ত করেছেন। তাঁর পদবি ‘শতরূপা’ আসলে তাঁর মা, বিশিষ্ট পরিচালক ও অভিনেত্রী শতরূপা সান্যালের নাম থেকেই নেওয়া। নিজের পরিচয়ের সঙ্গে মায়ের নাম জুড়ে দেওয়ার মধ্যেই তিনি এক ভিন্ন বার্তা দিতে চেয়েছেন। অন্যদিকে ঋতাভরী তাঁর বাবার পদবি ‘চক্রবর্তী’ ব্যবহার করেন। যদিও একাধিক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, তাঁর বাবাকে তিনি কেবলই বায়োলজিক্যাল ফাদার হিসেবেই দেখেন। ছোটবেলাতেই বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের সাক্ষী ছিলেন দুই বোন। তাঁদের বাবা ছিলেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক উৎপলেন্দু চক্রবর্তী। তবে পারিবারিক নানা জটিলতার কারণে দুই বোনের সঙ্গে বাবার সম্পর্ক কখনও গভীর হয়ে ওঠেনি। এমনকি ছোট মেয়েকে গ্রহণ না করার ঘটনাও তাঁদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এই কারণেই চিত্রাঙ্গদা বাবার পদবি ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর কাছে মায়ের অবদানই ছিল সবচেয়ে বড়। মা শতরূপা সান্যাল একাই দুই মেয়েকে বড় করেছেন এবং জীবনের প্রতিটি কঠিন সময় তাঁদের পাশে থেকেছেন। সেই শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবেই তিনি নিজের নামের সঙ্গে মায়ের পরিচয়কে জুড়ে নিয়েছেন।
এদিকে চিত্রাঙ্গদার ব্যক্তিগত জীবনও অনেকটা রূপকথার মতোই। তাঁর স্বামী সম্বিৎ চট্টোপাধ্যায় পেশায় একজন সংগীতশিল্পী। তিনি কলকাতার জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘গোপন’-এর সদস্য এবং একজন দক্ষ ড্রামার হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ কয়েক বছর প্রেমের সম্পর্কের পর তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সংগীত, শিল্প এবং সৃজনশীলতার প্রতি ভালোবাসা থেকেই তাঁদের সম্পর্কের ভিত আরও মজবুত হয়েছিল। এবার সেই সম্পর্কেই যোগ হতে চলেছে নতুন পরিচয়— বাবা ও মা হওয়ার আনন্দ। জীবনের নতুন অধ্যায়ে পা দিতে চলেছেন চিত্রাঙ্গদা ও সম্বিৎ। আর সেই নতুন পথচলার আগেই সাধের অনুষ্ঠানে পরিবার ও প্রিয়জনদের ভালোবাসায় ভরে উঠল তাঁদের ঘর। মাতৃত্বের এই উজ্জ্বল মুহূর্ত যেন আরও একবার মনে করিয়ে দিল— জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো তৈরি হয় পরিবার, ভালোবাসা আর সম্পর্কের উষ্ণতায়।

