Editorial

10 months ago

21 July 1993: সেদিনের ২১ শে জুলাই যেন মনে করিয়ে দেয় ব্রিটিশরাজকে

21 July 1993  Story (File Picture)
21 July 1993 Story (File Picture)

 

দুরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্কঃ রাত পোহালেই ২১ শে জুলাই, তা নিয়ে তোড়জোড়ের শেষ নেই , মঞ্চ বাঁধা থেকে জনসংযোগ করা আরো না জানি কত রকমের ব্যবস্থাপনা , ব্যস্ততা। কিন্তু এই দিনের ইতিহাস হয়ত আমাদের অনেকেরই নয় অজানা নতুবা আধা জানা। সেই দিনের ক্যানভাসটা মনে পড়লে এখন শিউড়ে ওঠেন অনেকে। 

সালটা ১৯৯৩। বয়স তখন অনেকটাই কম , রাজনীতি নিয়ে তেমন সম্যক ধারনাও নেই। কিন্তু একটা নাম খুব চেনা "মমতা" সকলের মুখে মুখে ঐ নামটা বারবার উঠে আসছিল উক্ত সালের ২১ শে জুলাই-র দিনটিতে। সন্ধ্যাবেলার খবরে টেলিভিসনের সাদাকালো পর্দায় বারবার কিছু মানুষের বিবর্ণ, রক্তাত্ব,বিধ্বস্ত চেহারা উঠে আসছিল। সকলের আলোচনার বিষয় তখন একটাই মমতা ব্যানার্জী, রাইটার্স অভিযান করতে এসে দারুন ভাবে আহত হয়েছেন নেত্রী। সকলের মুখে একটাই কথা "পটুয়া পাড়ার অগ্নিকন্যা" বাব্বা। তবে ঈর্ষাকাতর নেতা তাঁকে ‘বেদের মেয়ে জোছনা' বলতেন , আর শাসক দল তাঁকে সম্বোধন করত ‘ওই অসভ্য মহিলা’। কিন্তু বদলপন্থীদের কাছে তিনি তখন প্রতিবাদের নামান্তর। 

পথেঘাটে চ্যাংড়া ছোকরাদের তীর্যক কথা হোক বা বাসে ট্রামে অসংযমী ভাষা হোক বা হাতের স্পর্শ মেয়ে থেকে যুবতী অথবা মহিলা সকলের মুখেই তখন একটাই নাম দিদি(মমতা) থাকলে দেখতিস কী হাল হত! 

বয়স বেড়েছে, জানার পরিধিতে খানিকটা গভীরতা এসেছে, সংবাদ পত্রে লেখালেখির সুবাদে সেদিনের ঘটনা সম্পর্কেও কিঞ্চিৎ জানার সুযোগ হয়েছে বহু বিদ্যজনের কাছ থেকে। সেদিনের সেই ঘটনার কথা শুনলে মন আজও বিচলিত হয়।

যাঁর কাছ থেকে ঐ দিনের ঘটনা শোনা তিনি বলা শুরু করলেন ঠিক এই ভাবে- ‘হল্ট! হল্ট! উনি বিধায়ক। ওঁকে মারবেন না।’ব্র্যাবর্ন রোডে টি-বোর্ড আর ইউকো ব্যাঙ্কের উল্টো দিকে চার রাস্তার ক্রসিংয়ের ট্রাফিক স্ট্যান্ডের মধ্যে তখন দুই হাঁটুর ফাঁকে মাথা গুঁজে বসে সৌগত রায়। তাঁর পিঠে পুলিশের লাঠি পড়ছে অনবরত। সাদা পোশাকের ভদ্রলোক শেষে পিস্তল বের করে আকাশের দিকে তাক করে বলে উঠলেন, ‘আমি কিন্তু এবার গুলি চালাতে বাধ্য হব। আমি এমএলএ সাহেবের বডিগার্ড। এসবি-তে (স্পেশ্যাল ব্রাঞ্চ) আছি।’উনি কল্যাণ চক্রবর্তী।ব্র্যাবোর্ন রোড ততক্ষণে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। একদিকে, যুব কংগ্রেস কর্মীদের ইটবৃষ্টি, অন্যদিকে মুহুর্মুহু পুলিশের কাঁদানে গ্যাসের সেল ছুটে আসছে। সঙ্গে অবিরাম লাঠিচার্জ। তার মধ্যেই হাওড়া ব্রিজের দিক থেকে পিল পিল করে লোক ঢুকছে। পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে ছত্রাকার। তারা খানিক দিশেহারা। সেই কারণেই মরিয়া। সেখান থেকে বাস্তবিকই ঢিল ছোড়া দূরে রাইটার্স বিল্ডিংস।


প্রসঙ্গত, সেই সময়ে তৎকালীন যুব কংগ্রেসের পশ্চিমবঙ্গের সভানেত্রী ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার জন্য সচিত্র ভোটার কার্ডের দাবি তোলেন তিনি। সেই দাবি নিয়ে তৎকালীন রাজ্যের বাম সরকারের মূল সচিবালয় মহাকরণ অভিযানের ডাক দেওয়া হয় কংগ্রেসের তরফে। ২১শে জুলাইয়ের দিনটিতে এই আন্দোলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সামিল হন যুব কংগ্রেস কর্মীরা।সেদিনের আন্দোলন ঘিরে ধুন্ধুমার কান্ড বাধে শহর কলকাতার রাজপথে।পরবর্তী সময়ে অভিযোগ ওঠে সেই সময়ে গুলি চালানো হয় তাঁদের মিছিলে। তাতে মৃত্যু হয় ১৩ জনের। ঘটনা ঘিরে সেই সময়ে তুঙ্গে ওঠে রাজনৈতিক তরজা। পরবর্তীকাল কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল দল গঠন করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়। নয়া দল শুরু করার পরেও ২১শে জুলাই ভোলেননি তিনি। প্রতি বছরই এই দিনটি শহিদ দিবস হিসাবে পালন করে আসছে তৃণমূল।  

সেদিনের ঘটনায় অসুস্থ হয়ে পড়েন জননেত্রী। হাসপাতালে ভর্তি করতে হয় তাকে।নেত্রীর সাথে সাথে  খারাপ ভাবে আহত হয়ে পড়েন অনেকেই।রাত বাড়তেই হাসপাতালের ইমার্জেন্সির বাইরে কেউ ভাই, কেউ দাদা, কেউ বন্ধুর খোঁজ করছেন। ক’জন মারা গিয়েছে, মৃত, আহতদের নাম-ঠিকানা কী, এসব জানতে চেয়ে শয়ে শয়ে মানুষ আর্তনাদ করছে। এসএসকেএমে তখন কোনও পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম ছিল না। পুলিশের মাইকে অনুরোধ করা হচ্ছিল ইমার্জেন্সি খালি করে দিতে। পরিস্থিতি এমন যে ভিতরে ঢুকে জানার সুযোগ হল না ইমার্জেন্সিতে আহতদের চিকিৎসা হচ্ছে কিনা বা সেখানে কোনও ডেডবডি আছে কিনা

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর অনেকগুলি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেন। সেগুলির অন্যতম হল ২১ জুলাই কমিশন। ওড়িশা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কমিশনের কাজ সম্পন্ন করে যথাসময়ে সরকারের হাতে রিপোর্ট তুলে দেন। তাতে তিনি বলেছেন, ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই তৎকালীন রাজ্য যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকে মহাকরণ অভিযান কর্মসূচি ঘিরে এমন কোনও পরিস্থিতি তৈরি হয়নি যা মোকাবিলা করতে পুলিশকে গুলি চালানোর দরকার ছিল। তিনি সেদিনের গুলিচালনাকে অসাংবিধানিক বলেছেন।

তবে সেদিন গুলি না চালিয়ে যে পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যেত । সেখানে সেদিন ডিউটিতে ছিলেন কলকাতা পুলিশের তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার চয়ন মুখোপাধ্যায়। রাজ্য ক্যাডারের এই পুলিশকর্তা পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত ডিজি হয়েছিলেন। ঠাণ্ডা মাথায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁর মতো দক্ষ অফিসার কম ছিল। ব্র্যাবোর্ন রোডে তিনি সেদিন পুলিশকে গুলি চালানোর নির্দেশ দেননি। যদিও পরিস্থিতি যে ভয়াবহ ছিল তার প্রমাণ সেখানে ১৩৩ রাউন্ড টিয়ার গ্যাসের সেল ফাটাতে হয়েছিল পুলিশকে। 

প্রসঙ্গত, তখন দেশে, রাজ্যে মানবাধিকার কমিশন ছিল না। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন যাত্রা শুরু করে সে বছর অক্টোবরে। পরের বছর চালু হয় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মানবাধিকার কমিশন।হয়ত কমিশন থাকলে পুলিশ কিছুটা সংযত আচরন করত। 

সেদিনের ঘটনা নিয়ে বহু কথা লোক মুখে ফেরে ,অনেকে মতে সেদিন বিক্ষোভকারীদের মধ্যে একদল লোক প্রথম থেকেই আক্রমণাত্নক ছিল। যেন গোলমাল বাঁধানোর পরিকল্পনা করেই এসেছিল তারা। তারা যুব কংগ্রেসের সমর্থক নাকি সিপিএম ভাড়াটে সেনা ঢুকিয়ে রেখেছিল, তা নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে।লালবাজার, রাইটার্স বিল্ডিংসের কর্তারাও ভিড় দেখে চমকে যান। সেই ভিড় লালবাজার আর রাইটার্স বিল্ডিংসের কর্তাদের চিন্তায় ফেলল তাই-ই শুধু নয়, রাজ্য কংগ্রেসের নবীন, প্রবীণ সব নেতাই বুঝে গেলেন, সরকার বদলাতে হলে আগে বদলাতে হবে তাঁদের। মমতার পথে রাজপথে লড়াইয়ের বিকল্প নেই। ততদিনে যদিও তাঁদের অনেকেরই শরীর মন দুই-ই ভারী হয়ে গেছে। বিশ্বাসযোগ্যতাও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল।


উল্লেখ্য, ১৯৯৩-এর ২১ জুলাই একাধিক ইস্যুতে রাইটার্স বিল্ডিংস অভিযানের ডাক দিয়েছিলেন। সেই অভিযানের প্রেরণা হিসাবে কাজ করেছিল মাস সাতেক আগের একটি জনসভা। ২৫ নভেম্বর, ১৯৯২। যুব কংগ্রেসের নামে ডাকা হলেও ব্রিগেডের সেদিনের সমাবেশের ছিল ব্যক্তি মমতার ডাকে জমায়েত সভা। সিপিএম, কংগ্রেস ছাড়া কোনও দল ব্রিগেডে সভা করার কথা ভাবতে পারত না তখন। ‘বামফ্রন্টের মৃত্যুঘণ্টা বাজানোর’ সেই সমাবেশে এতই ভিড় যে চারদিনের মাথায় বামফ্রন্টের সমাবেশের স্লোগান উঠল, ‘আয় দেখে যা মমতা বামফ্রন্ট সরকারের ক্ষমতা’, ‘আয় দেখে যা মমতা, জ্যোতি বসুর ক্ষমতা’ ইত্যাদি। শাসক দলই বুঝিয়ে দিল, লড়াই কংগ্রেসের সঙ্গে নয়, মমতার বিরুদ্ধে। 

ওই আন্দোলনের সুবাদে বাংলায় সিপিএম বিরোধী রাজনীতির প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন মমতা। রাজনীতি তে তিনি কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী বা জয়ললিতা ছিলেন না তিনি ছিলেন সেলফ-মেড উওম্যান। ’৯৩-এর ২১ জুলাই স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলার রাজনীতিতে এক অচলায়তনেরও অবসান হল। রাজনীতির নির্ধারক হয়ে উঠলেন একজন মহিলা। বিরোধী নেতা বদলে যান বিরোধী নেত্রীতে। বাম, কংগ্রেস সব দলেই মহিলা সদস্য থাকলেও পুরুষতান্ত্রিক শব্দটির ভার ছিল দুর্বহ। সেদিনের অভিযানের ঠিক পাঁচ বছরের মাথায় নিজের দল গঠন করলেন নেত্রী, তেমন না হলে হয়ত সেই অচলায়তন আজও ভাঙা সম্ভব হত না। 

প্রতি বছরই এই দিনটিতে শহিদ দিবস পালন করে তৃণমূল। এই দিনে বিশেষ করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলের আগামী দিনের রণকৌশল কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলে বলে দিয়ে থাকেন। এককথায় বলাই যায় এই দিনটি রাজ্যের শাসকদলের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত এই দিনটির মূল বক্তা দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আগামী দিনে দল কোন পথে চলবে, কর্মীরা কেমন ভাবে সংগঠন বাড়াবে, দলের রূপরেখা কী হবে, যাবতীয় কিছুর দিক নির্দেশ করেন মমতা।  

সেদিনের অভিযানে যাঁরা প্রান হারান যাঁদের প্রতিবাদে আজ আমরা পরিচয় পত্র হাতে নিয়ে নিজের ভোট নিজে দেওয়ার অঙ্গীকার করি সেই সকল শহিদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি। 

সেই ১৩ জন বীর সন্তান -

ইনু মিঞা,বন্দন দা্‌স,মুরারী চক্রবর্তী ,রতন মণ্ডল ,বিশ্বনাথ রায় ,কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ,অসীম দাস ,কেশব বৈরাগী ,শ্রীকান্ত শর্মা ,দিলীপ দাস ,প্রদীপ রায় ,রঞ্জিত দাস ,মহম্মদ আবদুল খালেক। 


You might also like!