
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: মঙ্গলবার থেকে সময় যত এগিয়েছে, ততই চাঞ্চল্য বেড়েছে বীরভূমের মহম্মদবাজারের মিনার মণ্ডলের বাড়িতে উদ্ধার হওয়া বিপুল সম্পত্তি ঘিরে। পুলিশ সূত্রে দাবি, অনুব্রত মণ্ডল ঘনিষ্ঠ পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডল ওরফে মহম্মদ নাজিবুদ্দিনের আত্মীয় মিনারের বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছে প্রায় সাড়ে ২৮ কোটি টাকা নগদ এবং ১৫ কেজি সোনা। এই ঘটনার পরই মিনার মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে মিনারের পরিবারের দাবি, উদ্ধার হওয়া বিপুল টাকা ও সোনার সঙ্গে তাঁদের কোনও যোগ নেই। মিনারের স্ত্রীর বক্তব্য, তাঁরা জানতেনই না বাড়িতে এত সম্পত্তি রাখা রয়েছে। অন্যদিকে, তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, উদ্ধার হওয়া সম্পত্তির সঙ্গে টুলু মণ্ডলের যোগ থাকতে পারে। সেই সূত্রেই এখন পাথর ও বালি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত টুলুর একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। বিপুল পরিমাণ টাকা উদ্ধারের পর থেকেই টুলু মণ্ডলের খোঁজ মিলছে না বলে জানা গিয়েছে। তদন্তকারীদের নজর এড়াতে তিনি আত্মগোপন করেছেন কি না, তা নিয়েও শুরু হয়েছে জল্পনা।
বীরভূমের পাথর ব্যবসায় টুলু মণ্ডলের উত্থান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাথর খনি থেকে উত্তোলনের পর তা প্রথমে ক্রাশারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নির্দিষ্ট মাপে পাথর ভাঙার পর লরির মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করা হয়। এই পাথর পরিবহণ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নথি হল ডুপ্লিকেট কার্বন রিসিট বা ডিসিআর। অভিযোগ, এই ডিসিআর ব্যবস্থাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল বিশাল কারবার। বীরভূমের পাথর ব্যবসায় টুলু মণ্ডল এই ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মহম্মদবাজার থেকে মুরারই, নলহাটি-সহ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার ব্যাসল্ট পাথরের ব্যবসায় তাঁর প্রভাব ছিল বলে দাবি স্থানীয়দের।
বিজেপির অভিযোগ, পাথরবোঝাই লরি থেকে যে পরিমাণ সরকারি রাজস্ব জমা পড়ার কথা ছিল, বাস্তবে তার সামান্য অংশই সরকারের কোষাগারে যেত। বাকি অর্থ বেআইনি পথে সরানো হত বলে অভিযোগ গেরুয়া শিবিরের। যদিও এই সমস্ত অভিযোগের সত্যতা এখনও তদন্তের বিষয়। বর্তমানে মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া বিপুল টাকা ও সোনার উৎস খুঁজতে তদন্তে নেমেছে পুলিশ। উদ্ধার হওয়া সম্পত্তির প্রকৃত মালিক কে এবং এর সঙ্গে পাথর ব্যবসার কোনও বেআইনি লেনদেনের যোগ রয়েছে কি না, সেটাই এখন তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য। বলে রাখা ভালো, বাম আমলে পাথর খনি লিজ নিতেন যিনি তাঁকে রাজ্য সরকারের ভূমি রাজস্ব দপ্তরকে শুল্ক দিতে হত। ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত বাণিজ্যিক কর নিত। তাদের দেওয়া চালান না থাকলে লরি যাতায়াত সম্ভব হত না। তৃণমূলের জমানায় টন কিংবা কিউবিক মিটার পিছু শুল্ক নিত ভূমিরাজস্ব দপ্তর। টুলুর তৈরি করা জাল ডিসিআরের মাধ্যমে যে টাকা উঠত তা অবশ্য যেত না ভূমিরাজস্ব দপ্তরে। সুতরাং তার ফলে বিপুল টাকা ক্ষতি হয়েছে রাজ্যের কোষাগারে।
হিসাব বলছে, তৃণমূল সরকারের আমলে ডিসিআরের মাধ্যমে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবরে ১৯ লক্ষ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। নভেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হয়েছে ৭০ লক্ষ টাকা। বর্তমান সরকারের আমলে ১৭ মে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ কোটি ২০ লক্ষ টাকা। পরদিন বেড়ে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ হয়েছে ২ কোটি ৩০ লক্ষ। এই তথ্য থেকে স্পষ্ট ঠিক কতটা রাজ্যের কোষাগারের ক্ষতি হয়েছে। এই জালিয়াতির নেপথ্যে ভূমিরাজস্ব দপ্তরের আধিকারিকরা রয়েছেন বলেও মনে করা হচ্ছে। এভাবেই টুলু এত বিপুল অর্থের মালিক হয়ে গিয়েছিলেন বলেই অনুমান তদন্তকারীদের। আদতে কারা যুক্ত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
