
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এক বছর পূর্ণ হলেই জনতার দরবারে পরীক্ষায় বসবেন শুভেন্দু অধিকারী। প্রশাসনের শীর্ষে থেকে গত এক বছরে প্রতিশ্রুতি পূরণে কতটা সফল হয়েছেন, সেই হিসাব আমজনতার কাছেই দিতে চান তিনি। কাজের ভিত্তিতে মুখ্যমন্ত্রীকে নম্বর দেওয়ার দায়িত্বও থাকবে রাজ্যবাসীর হাতে। পুরুলিয়ার মানবাজারে জাইকা জল প্রকল্পের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে গিয়ে এমনই বার্তা দিয়েছেন শুভেন্দু। তাঁর স্পষ্ট চ্যালেঞ্জ, “যদি ১০-এর মধ্যে ৯ না পাই, তাহলে ক্ষমা চেয়ে নেব।” ফলে মুখ্যমন্ত্রিত্বের প্রথম বর্ষপূর্তিতে জনতার ‘রিপোর্ট কার্ড’-এ কত নম্বর পান শুভেন্দু, এখন সেদিকেই নজর।আবাস যোজনায় রাজ্যে তৈরি হবে প্রায় ৩০ লক্ষ নতুন বাড়ি। পুরুলিয়ার মানবাজারে জাইকার জল প্রকল্পের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এই ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই সঙ্গে বাড়ি তৈরির কাজে তোলাবাজি, সিন্ডিকেটরাজ বা কাটমানির বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিয়েছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর স্পষ্ট ঘোষণা, “বাড়ি তৈরিতে যদি ১ টাকাও কেউ চায়, আমাকে খবর দেবেন।” জঙ্গলমহলে ছাদহীন কোনও বাড়ি থাকবে না বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি বাংলা আবাস যোজনায় দুর্নীতি নিয়ে পূর্বতন সরকারকে নিশানা করে ২০২৭ সালের মধ্যে শিক্ষক, পুলিশ-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রায় এক লক্ষ নিয়োগের কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গেই হবে সেই নিয়োগ।
বিগত সরকারের আমলে আবাস যোজনায় ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন শুভেন্দু। তিনি জানান, সব অবৈধ বালির ঘাটকে বৈধ করা হবে। পশ্চিমবঙ্গ আবাস ও প্রধানমন্ত্রী আবাসের জন্য বাড়িতে তৈরিতে ১২০০ টাকা করে বালি পাবেন উপভোক্তারা।রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠনের পর কেটেছে ১০০ দিন। সোমবার ১০০ তম দিনে পুরুলিয়ার মানবাজারে দাঁড়িয়ে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন কাজকর্মের খতিয়ান তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, এই ১০০ দিন নতুন সরকার রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ও সাংবিধানিক কর্তব্যকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বিগত সরকার যা করেনি বর্তমান সরকার তা করবে। স্বাধীনতার ৮০ তম বছরেও পুরুলিয়ার বিভিন্ন গ্রামে পৌঁছয়নি পানীয় জল। কেন্দ্রীয় সরকার জল জীবন মিশনের জন্য ২৭ হাজার কোটি টাকা দিয়েছিল। কিন্তু সেই টাকা নিয়ে দুর্নীতি হয়েছে। কল আছে কিন্তু জল নেই। এবার আর তা হবে না। ১২৯৬ কোটি টাকার জাইকার জল প্রকল্পের সূচনা করে তিনি আশ্বাস দেন, প্রতিদিন জন প্রতি ৭০ লিটার করে পানীয় জল পাবেন।
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, এতদিন ৬০০ কিলোমিটার বর্ডারে কোনও বেড়া ছিল না। হু হু করে রাজ্যে অবৈধ অনুপ্রবেশ হত। রাজ্যের জনবিন্যাস বদলে দেওয়া হয়েছিল। পালাবদলের পর বিএসএফকে জমি দেওয়ার কাজ শুরু করেছে বিজেপি সরকার। সেন্সাসের কাজ শুরু হয়েছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা চালু হয়েছে। বাতিল হয়েছে ওবিসিদের অবৈধ তালিকাও।
১৮ আগস্ট, মঙ্গলবার ১০০ দিনে পা রাখবে শুভেন্দু অধিকারী সরকার। ঠিক তার আগের দিনই ১ বছরের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করলেন শুভেন্দু। বললেন, “২০২৭ সালে ৯ মে, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে একবছর পূর্ণ হবে। ওই দিন আমার মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে এক বছর পূরণ করব। আপনাদের সামনে পরীক্ষায় বসবো। আপনারা আমাকে নম্বর দেবেন। আমি যদি ১০-এর মধ্যে ৯ না পাই তাহলে ক্ষমা স্বীকার করে নেব। মেনে নেব আমি পারলাম না।” তবে আত্মবিশ্বাসের সুরে এদিন তিনি আরও বলেন, “সেদিন আপনারাই বলবেন, সঠিক লোককে বেছে নিয়েছি। বিশ্বাস-ভরসা রাখুন, সময় দিন। আপনাদের কল্যাণে কাজ করবো।”
মঙ্গলবার ১০০ দিনে পা রাখবে শুভেন্দু অধিকারী সরকার। ১০০ দিনে কী কী কাজ করল সরকার, তা বঙ্গবাসীর কাছে তুলে ধরতে একটি বই প্রকাশ করেছে বিজেপি। বাড়ি বাড়ি প্রচারে গিয়ে ৪১ পাতার সেই বইটি তুলে দেওয়া হবে জনগণের হাতে। এমনই পরিকল্পনা দলীয় নেতৃত্বের। রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পর শুভেন্দু অধিকারী সরকার একাধিক ক্ষেত্রে সংস্কারমূলক কাজে হাত দিয়েছে। রাজ্যে কত বিনিয়োগ এসেছে, কত মানুষ সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন, প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কোন কোন সংস্কার হয়েছে, মহিলা সুরক্ষা, আর্থিক ক্ষমতায়নের মতো বিষয়গুলিতে কাজ সবিস্তারে তুলে ধরা হয়েছে ওই বইতে। কেন্দ্রীয় একাধিক প্রকল্পের পরিষেবা, যেগুলি থেকে বাংলার মানুষ এতদিন বঞ্চিত ছিল, ডবল ইঞ্জিন সরকারে তাও এবার বঙ্গবাসীর নাগালে। এসব কাজের খতিয়ান জনগণের মধ্যে পৌঁছে দিতে ‘পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সংকল্প এবং সাফল্যের ১০০ দিন’ নামে ৪১ পাতার বইতে এসবের বিস্তারিত রয়েছে। বাকি ৯ মাসে বাংলার মানুষের কল্যাণে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে ‘জনতার দরবারে’ পরীক্ষায় বসার কতা নিজেই জানিয়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী।
বাঁকুড়া, বীরভূম, পুরুলিয়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে অবৈধ বালি, পাথর পাচারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। রাজ্যে পালাবদলের পরে দুর্নীতি রুখতে ‘জিরো টলারেন্স’-এর বার্তা দিয়েছে প্রথম বিজেপি সরকার। বালি ও পাথর, কয়লা পাচার রুখতে কড়া প্রশাসন। বিভিন্ন জায়গায় অভিযানও চলছে। সেই আবহেই পুরুলিয়া থেকে বড় বার্তা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর, “সব বালির ঘাটকে বৈধ করব।” প্রসঙ্গত, কয়েক সপ্তাহ আগেই বীরভূমের বালি-পাথর মাফিয়া টুলু মণ্ডলের বিশাল অবৈধ কারবার ও সম্পত্তির হদিশ পেয়েছে প্রশাসন। দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় অবৈধ ঘাট বানিয়ে কারবার চলছিল বলে অভিযোগ। তৃণমূল আমলে সেই কারবার ঘিরে কোটি কোটি টাকা হাতবদল হত!
অবৈধ বালি কারবার বন্ধ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাজ্যের বিজেপি সরকার। বালিঘাট ঘিরে যে সব অবৈধ লেনদেন চলত, সেসবও রুখতে প্রশাসন বিভিন্ন জায়গায় ধরপাকড় চালাচ্ছে। পুরুলিয়া সফরে এসে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যেও এদিন উঠে এল সেই দুর্নীতি বন্ধের প্রসঙ্গ। সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে এদিন মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ন, “জানতে চাইব তোলাবাজি বন্ধ হয়েছে, হ্যাঁ কিনা? রাস্তায় হাত পাতা বন্ধ? গোমাতা পাচার বন্ধ, বেআইনি কয়লা পাচার বন্ধ? বালির ঘাট বন্ধ? এরপরেই শুভেন্দু বলেন, “আমি জানি, বালি রেট একটু বেশি হয়ে গিয়েছে। সমস্যা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী আবাস বা পশ্চিমবঙ্গ আবাসে বাড়ি বানাতে বালির জন্য ১২০০ টাকা করে পাবেন।” সরকারি বাড়ি বানাতে ১৫০০ টাকা করে বালির জন্য দেওয়া হয় বলে খবর।
মুখ্যমন্ত্রী বার্তা দেন, “একটু রেগুলারাইজড করতে দিন। আপনারা চান তো সরকারের ঘরে টাকা আসুক। সরকারের ঘরে এলেই তো আপনাদের দিতে পারব।” এরপরেই মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা, “সব বালির ঘাটকে বৈধকরণ করব। তোলাবাজি হবে না। সিন্ডিকেট চলবে না। কাটমানি বন্ধ। এবারে আমরা ৩০ লক্ষ সরকারি বাড়ি দেব। একটাকা যদি কেউ চায়, তাহলে আমায় খবর দেবেন।” সব বালির ঘাট সরকারি আওতায় আনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। বালি ঘাট সরকারি নিয়ন্ত্রণে এলে রাজস্ব বাড়বে। এছাড়াও অবৈধ বালি চালানের জন্য বাজারে বালির দামও বেশি থাকে। অনেক বেশি টাকা বালি কিনতে গুনতে হয়। বাজারে বালির দাম বৈধ ঘাট হলে নিয়ন্ত্রণে আসবে। এমনই মত ওয়াকিবহাল মহলের।
