
ওয়াশিংটন: রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা বন্ধের দাবি তুলে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বিরুদ্ধে সরব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুধু সমালোচনাতেই থেমে থাকেননি তিনি, ইউক্রেনের জন্য নতুন প্রেসিডেন্টের প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে আমেরিকার ডিজেল সরবরাহ সংক্রান্ত চুক্তি ঘিরে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। যুদ্ধ থামানোর কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্যেই এই সংঘাত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের নেপথ্যে রয়েছে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আমেরিকার ডিজেল সরবরাহ সংক্রান্ত সমঝোতা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল সরবরাহের ব্যবস্থা করার কথা জানিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৩ লক্ষ টন ডিজেল সরবরাহের বিষয়টি সামনে এসেছে। আমেরিকার দাবি, জ্বালানির জোগান বাড়লে বাজারে দামের চাপ কমতে পারে।
কিন্তু এই সিদ্ধান্তকে মোটেই ভালো চোখে দেখছে না ইউক্রেন। কিয়েভের আশঙ্কা, রুশ জ্বালানি রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে মস্কোর হাতে অতিরিক্ত অর্থ আসবে। সেই অর্থ ব্যবহার করে রাশিয়া যুদ্ধের জন্য অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির ক্ষমতা বাড়াতে পারবে। ফলে যুদ্ধ থামার বদলে আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলিতে ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য, এই হামলার ফলে রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের জোগানের উপর চাপ বাড়ছে। তার প্রভাব পড়ছে আমেরিকার কৃষক, পশুপালক এবং সাধারণ ক্রেতাদের উপরও।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি জেলেনস্কিকে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা না চালানোর কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু তার পরেও ইউক্রেন হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর। এই পরিস্থিতিতে কড়া ভাষায় জেলেনস্কিকে সতর্ক করে ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেনকে এমন নেতৃত্ব বেছে নিতে হবে, যারা রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছতে পারবে।
মার্কিন প্রশাসনের এক আধিকারিকের দাবি অনুযায়ী, রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করার জন্য ওয়াশিংটন একাধিকবার কিয়েভকে অনুরোধ করেছিল। সেই অনুরোধ উপেক্ষা করা হয়েছে বলেই পুতিনের সঙ্গে ডিজেল চুক্তির পথে এগিয়েছেন ট্রাম্প। যদিও এই সিদ্ধান্ত ঘিরে আমেরিকার অভ্যন্তরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে জেলেনস্কি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ইউক্রেনের নেতৃত্ব কে দেবেন, তা নির্ধারণ করার অধিকার সে দেশের নাগরিকদেরই রয়েছে। বিদেশি কোনও রাষ্ট্রের চাপে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বা নেতৃত্ব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
জেলেনস্কির অভিযোগ, রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহের চুক্তি মস্কোকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কার্যত বাড়তি সুবিধা দেবে। তাঁর বক্তব্য, রাশিয়ার আয়ের প্রতিটি অতিরিক্ত ডলার যুদ্ধের খরচ মেটাতে সাহায্য করতে পারে। সেই কারণে রুশ জ্বালানি রফতানির উপর চাপ কমানোর বদলে মস্কোকে যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য করা উচিত আমেরিকার।
ইউক্রেনের বিদেশমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহাও জেলেনস্কির পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, দেশের নেতা বেছে নেওয়ার অধিকার ইউক্রেনের জনগণের। বিদেশ থেকে আসা এমন মন্তব্যের মধ্যেও দেশের মানুষের সমর্থনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে, রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া শহরে আবাসিক এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বলে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এই হামলার প্রসঙ্গ টেনে জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, রাশিয়ার উপর চাপ কমানো হলে মস্কো সেটিকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ হিসেবেই দেখছে।
ট্রাম্পের রাশিয়া নীতি নিয়ে শুধু ইউক্রেন বা ইউরোপের দেশগুলিই নয়, আমেরিকার রাজনৈতিক মহলের একাংশও প্রশ্ন তুলেছে। রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য ডন বেকন রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করার পক্ষে সওয়াল করেছেন। তাঁর বক্তব্য, মস্কোর উপর চাপ বাড়ানোর সময় নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা উচিত নয়।
অন্যদিকে, কংগ্রেস সদস্য ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করতে নতুন আইন আনার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। ফলে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত মার্কিন প্রশাসন এবং আইনসভার মধ্যেও মতবিরোধ তৈরি করতে পারে।
ইউরোপের একাধিক নেতাও ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের তরফে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করার অবস্থান জানানো হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদেশনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাসও সতর্ক করেছেন, রাশিয়ার আয় বাড়লে যুদ্ধ চালানোর ক্ষমতা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
এই বিতর্কের মধ্যেই ১১ অক্টোবর ট্রাম্প দাবি করেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন অবিলম্বে জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু জেলেনস্কি জানান, এমন কোনও সমঝোতার বিষয়ে তিনি আগে থেকে বিস্তারিত জানতেন না। পরে তিনি স্পষ্ট করেন, রাশিয়া একইভাবে হামলা বন্ধ করলে ইউক্রেনও সেই পথে হাঁটতে প্রস্তুত।
তবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরেও ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিকাঠামোয় রুশ হামলার খবর সামনে এসেছে। ফলে ট্রাম্পের ঘোষিত সমঝোতা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, রাশিয়ার সঙ্গে আমেরিকার ডিজেল চুক্তি এখন শুধু জ্বালানি বাজারের বিষয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও যুদ্ধের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। একদিকে ট্রাম্প দ্রুত সমঝোতার মাধ্যমে যুদ্ধ থামাতে চাইছেন, অন্যদিকে জেলেনস্কির আশঙ্কা, রাশিয়ার উপর চাপ কমালে যুদ্ধ আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন, মস্কো ও কিয়েভের পরবর্তী পদক্ষেপই ঠিক করবে, সংঘাত প্রশমনের পথে এগোবে, নাকি আরও গভীর হবে দুই দেশের বিরোধ।
