
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: খাঁটি সোনার গয়নায় দেবীকে সাজিয়ে গঙ্গায় বিসর্জন! বিজয়া দশমীর রাতে প্রতিমার সঙ্গে সেই সোনার গয়নাও চলে যেত গঙ্গার জলে। আর বিসর্জনের পর মাঝিমাল্লারা জলে নেমে সেই গয়না খুঁজে তুলতেন। কিন্তু সেখানেই ছিল এই বনেদি পুজোর এক আশ্চর্য নিয়ম—বিসর্জনের জল থেকে যা কিছু উদ্ধার হোক না কেন, তা আর ফিরত না রাজকোষে। এমনই নানা রোমাঞ্চকর রীতি ও রাজকীয় আয়োজন ঘিরে এক সময় জমজমাট হয়ে উঠত ঠাকুরবাড়ির দুর্গোৎসব। সেই পুজোর জাঁকজমক একসময় গোটা কলকাতার নজর কাড়ত। প্রতিমার সাজ থেকে শুরু করে বিসর্জনের রীতি, সবেতেই ছিল আভিজাত্য আর ঐতিহ্যের ছাপ। কিন্তু সময়ের স্রোতে সেই জৌলুস আজ ইতিহাস। যে দালানে একসময় দুর্গাপুজোর ঢাক বেজে উঠত, সেখানে এখন আর সেই উৎসবের আয়োজন হয় না। কী কারণে বন্ধ হয়ে গেল কলকাতার এই বিখ্যাত বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো? কেমনই বা ছিল সেই পুজোর রাজকীয় আয়োজন? সেই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের পাতাতেই রয়েছে নানা চমকপ্রদ কাহিনি।
১৭৮৪ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষ নীলমণি ঠাকুর জোড়াসাঁকোয় এই পুজোর সংকল্প করেন। তবে পুজোর রমরমা আকাশ ছোঁয় প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের আমলে। সেকালে কলকাতার বনেদি পরিবারগুলোর মধ্যে পুজোর জাঁকজমক নিয়ে চরম রেষারেষি চলত। কার বাড়ির ভোগ বেশি সুস্বাদু, কার প্রতিমার সাজ কত দামি— এসব নিয়ে চলত দম্ভের লড়াই। ঠিক পাশেই ছিল শিবকৃষ্ণ দাঁ-র বাড়ি। জনশ্রুতি ছিল, দেবী নাকি মর্ত্যে এসে প্রথম গয়না পরেন এই দাঁ বাড়িতেই। পড়শিকে টক্কর দিতে পিছিয়ে থাকেননি প্রিন্স দ্বারকানাথও। প্যারিস থেকে দেবীর গয়না আনিয়ে চমকে দিয়েছিলেন সবাইকে। ঠাকুরবাড়ির দালানেই তৈরি হত প্রতিমা। শোনা যায়, দ্বারকানাথ ঠাকুরের স্ত্রী দিগম্বরী দেবীর মুখের আদলে গড়া হত দেবী দুর্গার মুখ। ঠাকুর পরিবার ছিল বৈষ্ণব ভাবধারায় বিশ্বাসী। তাই রক্তারক্তি বা পাঁঠাবলি একেবারেই হত না। বলি হিসেবে ব্যবহার করা হত কুমড়ো। পুজোর সূচনায় ছিল এক অনন্য প্রথা। পুজোর আগে ওড়ানো হত শঙ্খচিল। বিশ্বাস ছিল, সেই পাখির পথ ধরেই মর্ত্যে আসবেন দেবী। আর বিজয়ার দিন ওড়ানো হত নীলকণ্ঠ পাখি।
বিজয়া দশমীর দিনটি ছিল মেয়েদের কাছেও খুব স্পেশাল। সারা বছর কড়া নিয়মে বন্দি থাকা ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা শুধু ওই দিনেই তেতলার ছাদে ওঠার অনুমতি পেতেন। সেখান থেকেই তাঁরা দেখতেন প্রতিমার বিসর্জন শোভাযাত্রা। বিজয়ার রাতে নতুন জামা পরে ঠাকুরবাড়ির ছেলেরা প্রতিমার সঙ্গে বিসর্জনে যেতেন। বিসর্জন শেষে বসত এলাহি জলসা। বিখ্যাত ওস্তাদদের গানে, ঝাড়বাতির আলোয় মায়াবী হয়ে উঠত রাজবাড়ি। মিষ্টিমুখের জন্য তৈরি হত ফুটবলের মতো বিশালাকার মোয়া ও ক্ষীরের মিঠাই।
কিন্তু এত জমকালো পুজো কেন বন্ধ হয়ে গেল?
মূল কারণ ছিল পারিবারিক ভাবধারার পরিবর্তন। প্রিন্স দ্বারকানাথের পুত্র মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে ঠাকুরবাড়িতে প্রতিষ্ঠা পায় ব্রাহ্মধর্ম। দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন নিরাকার ঈশ্বরে বিশ্বাসী। ফলে মূর্তিপুজোর বিরোধী হওয়ার কারণে ধীরে ধীরে ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপুজো বন্ধ হয়ে যায়। তত্ত্ববোধিনী সভা প্রতিষ্ঠার বেশ কিছু বছর পরেও অবশ্য জগদ্ধাত্রী ও দুর্গাপুজো চলেছে। মহর্ষির ভাই নগেন্দ্রনাথ পুজো বজায় রাখার পক্ষে ছিলেন। কারণ, সামাজিক মিলনের এমন মাধ্যম আর ছিল না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে গতানুগতিক মূর্তিপুজো না করলেও, এই উৎসবের সামাজিক মিলনকে গভীর ভালোবাসতেন। তিনি মনে করতেন, শারদোৎসব হল আসলে বাঙালির ‘কন্যাপূজা’। ঘরের মেয়ে উমাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক আনন্দের মেলবন্ধন। আজ জোড়াসাঁকোর দালান শান্ত। বিজয়ার সেই ধুমধাম কিংবা শঙ্খচিল ওড়ানোর দিন অতীত ইতিহাস। তবুও কলকাতার দুর্গাপুজোর ইতিহাসে চিরকাল অমলিন হয়ে রইবে ঠাকুরবাড়ির এই রাজকীয় গল্প।
