
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: ঢাকের বাদ্যি, ধূপ-ধুনোর গন্ধ আর পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণে মুখর হয়ে ওঠে পুজোমণ্ডপ। আর মহাষষ্ঠীর পুজোয় পট্টবস্ত্র পরে সংকল্পে বসেন থানার ওসি। কলকাতা পুলিশের থানার উদ্যোগে আয়োজিত দুর্গাপুজোর তালিকায় ইতিমধ্যেই নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে শেক্সপিয়র সরণি সার্বজনীন দুর্গোৎসব। এ বছর সেই পুজো পা দিচ্ছে দশম বছরে। আর দশ বছর পূর্তির বছরে সাবেকি পুজো থেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে ‘থিমের পুজো’র আয়োজন করছে শেক্সপিয়র সরণি থানা।
২০১৬ সালে থানার ঠিক উল্টোদিকে অল্প পরিসরে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল এলাকার মানুষের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগ আরও দৃঢ় করা। সময়ের সঙ্গে সেই ছোট আয়োজনই ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠেছে। এবারের পুজোর ভাবনা ‘মা দুর্গার সৃষ্টি’। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর-সহ দেবতাদের তেজ থেকে কীভাবে মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গার আবির্ভাব, মণ্ডপসজ্জা ও উপস্থাপনার মাধ্যমে সেই কাহিনিই তুলে ধরা হবে। শেক্সপিয়র সরণি থানার আধিকারিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, থানার প্রায় তিন কিলোমিটারের মধ্যে বড় কোনও দুর্গাপুজো নেই। এলাকার বাসিন্দাদের একটা বড় অংশ বহুতলে বসবাস করেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি। ফলে প্রয়োজন না হলে পুলিশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ খুব একটা তৈরি হত না। সেই দূরত্ব কমাতেই তৎকালীন ওসি সুজিত চক্রবর্তীর উদ্যোগে শুরু হয়েছিল এই পুজো। পুজোর আয়োজনের প্রায় প্রতিটি কাজেই সক্রিয় ভূমিকা নেন থানার পুলিশকর্মী ও আধিকারিকরা। বাজার করা থেকে শুরু করে ডেকরেটার্সের সঙ্গে যোগাযোগ, প্রতিমা নির্বাচন, মণ্ডপ ও আলোর ব্যবস্থা, মাইক, ফুল-ফল, পুজোর সামগ্রী, ঢাকির ব্যবস্থা এবং আমন্ত্রণপত্র তৈরি—সবই নিজেদের দায়িত্বে সামলান তাঁরা। পাশাপাশি পুজোর মাধ্যমে কলকাতা শহর এবং কলকাতা পুলিশের সার্বিক মঙ্গল কামনাও করা হয়।
প্রথম দিকে পুজোয় এলাকার বাসিন্দাদের অংশগ্রহণ ছিল তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু বছরের পর বছর সেই ছবি বদলেছে। ধীরে ধীরে স্থানীয় বাসিন্দারাই পুজোর সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেন। এবারও তাঁদের একটি বড় অংশ এগিয়ে এসে পুজোর আয়োজনের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। সম্প্রতি থানার আধিকারিকদের সঙ্গে তাঁদের বৈঠকও হয়েছে। প্রতিবারের মতো এবারও পঞ্চমীর দিন পুজোর উদ্বোধন হবে। মহাষষ্ঠীতে পুরোহিতের সঙ্গে সংকল্পে বসবেন থানার ওসি অয়ন ভৌমিক। উপস্থিত থাকবেন অতিরিক্ত ওসি-সহ অন্যান্য আধিকারিক ও পুলিশকর্মীরা। বোধনের পর নির্দিষ্ট রীতি মেনেই শুরু হবে দুর্গাপুজো। পুলিশকর্মীদের পরিবারের সদস্য এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি কাছাকাছি একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীরাও পুজো এবং পুষ্পাঞ্জলিতে অংশ নেন। পুজোর চার দিনই থাকছে ভোগের আয়োজন। বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন ও ব্যবসায়ী সংস্থা ভোগের দায়িত্ব নেয়। বিশেষ করে মহাষ্টমী ও মহানবমীতে কয়েক হাজার মানুষ ভোগ গ্রহণ করেন। পাশাপাশি প্রতিদিনই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
তবে পুজোর উদ্যোক্তা হওয়ার পাশাপাশি পুলিশকর্মীদের দায়িত্ব কিন্তু কমে না। পুজোর আয়োজন সামলানোর পাশাপাশি তাঁদের পালন করতে হয় নিয়মিত আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বও। এ বছর পার্ক স্ট্রিটের অ্যালেন পার্কের পুজোর আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মূল দায়িত্বও থাকবে শেক্সপিয়র সরণি থানার পুলিশকর্মী ও আধিকারিকদের উপর। সেই ব্যস্ততার মধ্যেও নিজেদের পুজো নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা। এক দশক আগে জনসংযোগের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া এই পুজো তাই এখন শুধু পুলিশের পুজো নয়, স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশগ্রহণে ধীরে ধীরে একটি মিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। দশম বছরে ‘মা দুর্গার সৃষ্টি’ থিমে সেই সম্পর্কের বন্ধনই আরও দৃঢ় করার বার্তা দিচ্ছে শেক্সপিয়র সরণি থানার দুর্গোৎসব।
