
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: দুর্গাপুজো মানেই শুধু দেবী আরাধনা নয়, শহরের মণ্ডপগুলিতে প্রতি বছরই উঠে আসে নানা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত বার্তা। উত্তর কলকাতার একাধিক পুজো কমিটিও এবার তাদের মণ্ডপসজ্জায় বেছে নিয়েছে ভিন্নধর্মী ভাবনা। কোথাও গঙ্গার বহমানতা ও দূষণের কথা, কোথাও আবার প্রাচীন শিল্পশৈলীর হাত ধরে মাটি, মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ককে তুলে ধরা হচ্ছে। অন্যদিকে, উত্তর কলকাতার পুরনো বাড়ি ও আধুনিক বহুতলের সহাবস্থানও জায়গা করে নিয়েছে একটি পুজোর থিমে।
∆ গঙ্গার স্রোতে পরিবেশের বার্তা— ‘বিস্তীর্ণ দুপারের অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনেও, নিঃশব্দে নীরবে ও গঙ্গা তুমি বইছ কেন?’— ভূপেন হাজারিকার জনপ্রিয় গানের এই আবহেই গঙ্গার কথা বলবে নলিন সরকার স্ট্রিট সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতির এবারের পুজো। গঙ্গার উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত নদীর যাত্রাপথ, তার বহমানতা, দূষণ এবং নদীভাঙনের নানা দিক মণ্ডপসজ্জার মাধ্যমে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিল্পী সনাতন দিন্দার পরিকল্পনায় মণ্ডপে ব্যবহার করা হচ্ছে মাটি ও কঞ্চির মতো প্রাকৃতিক উপকরণ। কোনও কৃত্রিম আলোর চমক নয়, বরং শিল্পের নিজস্ব ভাষাতেই জলের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে পাথর খোদাই করে মূর্তি তৈরির শিল্পরীতির আদলে মাটির প্রতিমাকেও দেওয়া হচ্ছে পাথরের মতো অবয়ব। পুজো কমিটির সম্পাদক সিদ্ধার্থ সান্যাল জানিয়েছেন, ভূপেন হাজারিকার ‘বিস্তীর্ণ দুপারে’ গানকে ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে মণ্ডপের থিম মিউজিক। ফলে মণ্ডপসজ্জার পাশাপাশি সুরের মাধ্যমেও গঙ্গার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং নদীর যন্ত্রণার কথা তুলে ধরার চেষ্টা থাকবে।
∆ ‘আদিম’-এ ফিরছে শিকড়ের গল্প— অন্যদিকে, কাশীবোস লেন দুর্গাপূজায় এবারের ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের প্রাচীন লোকশিল্প ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। মাটি, মানুষ এবং প্রকৃতির সহজ সহাবস্থান থেকেই জন্ম নেওয়া ওরলি শিল্পশৈলীর মাধ্যমে সেই সম্পর্ককে মণ্ডপে তুলে ধরা হচ্ছে। শিল্পী অনির্বাণের পরিকল্পনায় রং, রেখা ও ছন্দের মাধ্যমে ফুটে উঠবে প্রাচীন জীবনযাপনের নানা ছবি। পুজো কমিটির সদস্য ঐন্দ্রিলী শেঠের কথায়, শিকড়ের কাছে ফিরে গিয়ে জীবনের সহজ সৌন্দর্যকে খুঁজে নেওয়ার এই ভাবনার নাম দেওয়া হয়েছে ‘আদিম’।
∆ পুরনো-নতুনের সহাবস্থানে হাতিবাগানের ভাবনা— উত্তর কলকাতার অলিগলিতে এখনও পাশাপাশি দেখা যায় শতাব্দীপ্রাচীন বাড়ি এবং আধুনিক বহুতল। শহরের এই বৈপরীত্যকেই এবার নিজেদের পুজোর ভাবনায় তুলে ধরছে হাতিবাগান সর্বজনীন। পুরনো কলকাতার স্থাপত্য, নতুন শহুরে জীবন এবং পাড়ার বদলে যাওয়া চেহারার মধ্যে যে ভিন্নধর্মী সহাবস্থান, সেটিই মণ্ডপের মূল ভাবনায় জায়গা পাচ্ছে। হাতিবাগান চত্বরে একাধিক বড় পুজোর মধ্যে থিম ও মণ্ডপসজ্জা নিয়ে যে প্রতিযোগিতার আবহ তৈরি হয়, তা নিয়েও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন মুখ্য উদ্যোক্তা শাশ্বত বসু। তাঁর বক্তব্য, সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকলেও একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার মানসিকতা নেই। বরং একই এলাকায় একাধিক বড় পুজো হলে গোটা এলাকা দর্শনার্থীদের জন্য আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
ফলে এবারের দুর্গাপুজোয় উত্তর কলকাতার মণ্ডপগুলিতে শুধু প্রতিমা দর্শন নয়, গঙ্গা, প্রকৃতি, লোকশিল্প এবং শহরের পুরনো-নতুন জীবনের গল্পও দর্শনার্থীদের নজর কাড়তে চলেছে।
