
দুর্গা বলতেই সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে দশভুজা দেবীর মহিষাসুর বধের চিরপরিচিত রূপ। তবে পুরাণ ও শাস্ত্রে দেবীর রূপের বৈচিত্র্যও কম নয়। কোথাও তিনি অষ্টভুজা, কোথাও অষ্টাদশভুজা। আবার শাস্ত্রজ্ঞদের বর্ণনায় কখনও উঠে আসে কুড়িভুজা দুর্গার কথাও। কিন্তু বাংলার এক প্রাচীন পুজোয় দেবীর রূপ একেবারেই আলাদা। হুগলির বলাগড়ের সোমড়াবাজারে সেন পরিবারের দুর্গা পরিচিত ত্রিভুজা হিসেবে। দেবীর একদিকে রয়েছে দু’টি হাত, অন্যদিকে তিনটি হাত। প্রায় তিনশো বছরের পুরনো এই পুজো শুধু দেবীর ব্যতিক্রমী রূপের জন্যই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা অলৌকিক কাহিনির জন্যও আজও আকর্ষণের কেন্দ্র।পরিবার সূত্রে জানা যায়, একসময় এই সেন পরিবারের বাস ছিল কৃষ্ণনগরে। রাজা রামচন্দ্র সেনের বাবা কৃষ্ণরাম রায় এই পুজোর সূচনা করেন। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতায় তাঁকে কৃষ্ণনগর ত্যাগ করতে হয়। সেই সময় কৃষ্ণরামের ছেলে রামচন্দ্র দিল্লি পাড়ি দেন। নিজের পাণ্ডিত্যে মুঘল সম্রাটের নজর কাড়েন। ১৭৪৩ সালে তিনি রায়ান উপাধি রান। তাঁকে ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলা, বিহার এবং ওড়িশার দেওয়ান নিযুক্ত করে। সেই সময় থেকে বলাগড়ে পাকাপাকিভাবে বসবাস শুরু করে সেন পরিবার।
এরপর ১৭৬০ সালে রামচন্দ্র সেন ফের পুজো শুরু করেন। স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী তৈরি করা হয় প্রতিমা। দেবী এখানে ত্রিভুজা। একদিকে দু’টি হাত এবং আরেকদিকে একটি। দু’টি হাতের একটিতে খড়্গ এবং আরেকটিতে শূল। আরও একটি হাতে দেবী ধরে রয়েছেন অসুরের চুল এবং নাগপাশ। দেবীর দুই কাঁধে আরও ছোট ছোট সাতটি হাত রয়েছে। সেগুলি অবশ্য দেখা যায় না। পুজো শুরুর প্রথমদিকে মণ্ডপ কাঠ দিয়ে তৈরি করা হত। তবে একবার বিজয়া দশমীতে হামলাকারীরা মণ্ডপ ধ্বংস করে দেয়। তবে কারা হামলা চালিয়েছিল, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন হামলাকারীরা বর্গি আবার কারও মতে ইংরেজদের মদতপুষ্ট দুষ্কৃতীরা এই কাজ করেছিল। ধীরে ধীরে স্থায়ী মন্দির তৈরি করা হয়।জন্মাষ্টমী তিথিতে কাঠামো পুজো করা হয়। তারপরই শুরু হয় প্রতিমা তৈরির কাজ। এবারও সেই নিয়মের কোনও ব্যতিক্রম হয়নি। জোরকদমে চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ।
প্রতিমা নিরঞ্জনের ক্ষেত্রে রয়েছে বিশেষ রীতি। পারিবারিক প্রথা মেনে আজও বড় বাঁশের একটি দোলনা তৈরি করা হয়। তাতে চড়িয়ে গঙ্গায় প্রতিমা বিসর্জন করা হয়। এখন আর শুধু সেন পরিবারের নয়। এই পুজো যেন প্রকৃতপক্ষেই হয়ে উঠেছে সকলের।
