
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: বাংলার দুর্গাপুজোয় একেক বনেদি বাড়ির একেক রকমের ঐতিহ্য। কোথাও দেবীকে ঘরের মেয়ে উমা হিসেবে বরণ করা হয়, কোথাও আবার পুজোর আচারেই মিশে থাকে বহু পুরনো পারিবারিক প্রথা। হাওড়ার আন্দুলের দত্তচৌধুরী বাড়ির দুর্গাপুজোও তেমনই এক ব্যতিক্রমী ঐতিহ্যের সাক্ষী। এখানে দেবীপক্ষ শুরু হলেই পরিবারের অবিবাহিত কন্যারাও হাতে শাঁখা পরেন। তবে শাঁখার সঙ্গে পলা বা লোহা পরার রীতি নেই। কারণ, এই বাড়িতে দুর্গাকে দেবী হিসেবে নয়, ঘরের মেয়ে উমারূপেই পুজো করা হয়।
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে জানা যায়, একাদশ শতকে সেন বংশের শাসনকালে কনৌজ থেকে বাংলায় পাঁচ ব্রাহ্মণ ও পাঁচ ক্ষত্রিয় বংশের আগমন ঘটে। সেই পাঁচ ক্ষত্রিয় বংশের অন্যতম ছিল দত্তচৌধুরী পরিবার। পরবর্তী সময়ে পরিবারের বংশধররা হাওড়ার বালি থেকে আন্দুলে এসে বসতি স্থাপন করেন। বাংলায় সুলতানি শাসনের সময় পরিবারের উত্তরপুরুষ দেবদাস দত্ত জমিদারের স্বীকৃতি পান এবং পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘চৌধুরী’ উপাধি। পরবর্তীকালে রামশরণ দত্তচৌধুরীর হাত ধরে এই বাড়িতে দুর্গাপুজোর সূচনা। সেই থেকেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে এই পুজো। দেবী এখানে উমারূপে পূজিত হন। ষষ্ঠীতে দেবীকে সবুজ ও দশমীতে লাল রঙের ওড়না পরানোর রীতিও রয়েছে। এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও বেশ কিছু বিশেষ আচার। একসময় পশুবলির প্রচলন থাকলেও পরে পরিবারের এক সদস্য স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর সেই প্রথা বন্ধ হয়ে যায়। নবমীর সকালে প্রতিমার সামনে ২৮টি কালি প্রদীপ জ্বালিয়ে বিশেষ আরতি করেন পুরোহিত। আরতি শেষে প্রদীপগুলি উল্টে রেখে নিভিয়ে দেওয়ার রীতি রয়েছে।
নবমীর দিনেই হয় কুমারী পুজো ও ধুনো পুজো। পরিবারের বধূরা মাথায় জ্বলন্ত ধুনো নিয়ে বিশেষ আচার পালন করেন। পারিবারিক মঙ্গল কামনায় এই রীতি আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা হয়। শুধু পুজোর আচারেই নয়, ভোগেও রয়েছে দত্তচৌধুরী বাড়ির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। দেবীর ভোগে দেওয়া হয় পুরীর জিভেগজা। পাশাপাশি থাকে নারকেল নাড়ু, চন্দ্রপুলি, ক্ষীরের ছাঁদ, মনোহরা-সহ নানা ধরনের মিষ্টি। মিষ্টি দিয়ে সাজানো চূড়ার উপরে থাকে পেস্তা, বাদাম ও কিশমিশ। খিচুড়ি এবং পোলাওও দেবীর ভোগে নিবেদনের রীতি রয়েছে। শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও ঐতিহ্যে ছেদ পড়েনি। বরং পুরনো রীতিনীতি, পারিবারিক বিশ্বাস এবং পুজোর বিশেষ আচারকে সঙ্গে নিয়েই প্রতি বছর নতুন করে শুরু হয় দেবীর আরাধনা। এ বারও তাই আন্দুলের দত্তচৌধুরী বাড়িতে বনেদিয়ানার সেই পুজোকে ঘিরে প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে।
