
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: কেন্দ্রের প্রস্তাবিত ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’—মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ সংক্রান্ত সংশোধনী বিল—নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর বিতর্কের আবহ তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে কোচবিহারের ঘোকসাডাঙার ছোটশিমূলগুড়ি ময়দানের জনসভা থেকে প্রথমবার মুখ খুললেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি অভিযোগ করেন, এই বিলের মাধ্যমে আসলে ভারতীয় জনতা পার্টি বঙ্গভঙ্গের ছক কষছে। তাঁর মতে, আসন পুনর্বিন্যাসের আড়ালে রাজ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মমতার এই মন্তব্য ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলি যেখানে বিলটিকে মহিলাদের ক্ষমতায়নের পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে, সেখানে শাসকদলের তরফে এর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “এখন বলছে বিল আনছে। মহিলাদের কত অসম্মান বলুন তো। ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ মহিলাদের। আমরা মন প্রাণ দিয়ে সমর্থন করেছি। সংসদে অনেক লড়াই করেছি। আমাদের দলও লড়াই করেছে। ৩৩ শতাংশ মহিলা সংরক্ষণ বিল তো অনেকদিন পড়ে রয়েছে। তার সঙ্গে জনবিন্যাস কেন করছো? একসঙ্গে কেন? বাংলাকে ভাগ করার চক্রান্ত করছো?” তাঁর আরও দাবি, এই বিল পেশের মাধ্যমে আসলে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া এবং এনআরসি কার্যকর করার চক্রান্ত লুকিয়ে রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ বিল পাশ হয়েছিল সংসদে। সেবার বিরোধীরাও ওই বিলটিকে সমর্থন করে। বিলে উল্লেখিত ছিল, মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষিত থাকবে। সেখানে আরও বলা হয়েছিল, জনগণনার পরে আসন পুনর্বিন্যাস করা হবে। তারপর ওই আসনের ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষিত রাখা হবে মহিলাদের জন্য।তার ফলে লোকসভা আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৮৫০ করা হতে পারে। কিন্তু এখন কেন্দ্র আর জনগণনার অপেক্ষা করতে চাইছে না। মোদি সরকার চাইছে, ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে আসন পুনর্বিন্যাস করে দিতে। সেই পুনর্বিন্যাসের ভিত্তিতেই মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষিত করা হবে। সেটারই বিরোধিতায় একজোট ইন্ডিয়া শিবির। সংখ্যার হিসাব বলছে, ভোটাভুটিতে বিলটি পেশ হলেও সেটি পাশ করাতে সাংসদদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন। লোকসভায় ৫৪৩ জনই হাজির থাকলে, ৩৬২টি ভোট দরকার হবে বিলের পক্ষে। কিন্তু এই মুহূর্তে মোদি সরকারের সেই শক্তিটা নেই। এখন লোকসভায় এনডিএ-র মোট সাংসদ সংখ্যা ২৯৩। আর ‘ইন্ডিয়া’র সাংসদ সংখ্যা ২৩০-২৪০। তবে সাংসদদের অনুপস্থিতি ভোটাভুটির দিন বহু অঙ্ক বদলে দিতে পারে।
আলিপুরদুয়ারের জনসভা থেকে চা শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “ভোট কাটার চক্রান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিন। বিজেপি-কে রাজনৈতিক ভাবে এই জেলার মাটিতে বিনাশ করুন। চা বাগানের শ্রমিকেরা শুনুন, মোদীজি এসে বলেছিলেন আলিপুরদুয়ার-জলপাইগুড়িতে পাঁচটি চা বাগান খুলে দেবেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত খোলেননি। আমরা খুলেছি।”
বিজেপি-কে বিঁধে মমতা বলেন, “কী করেছে তারা! বাইরে থেকে লোক নিয়ে এসে হোটেল বুক করে টাকা ডিস্ট্রিবিউশন করছে। যখন বন্যা হয়েছিল, তখন কোথায় ছিল? ঝড়ে, জলে, সাইক্লোনে, বন্যায়, বাড়ি ভেঙে গেলে, উন্নয়নে দেখা নাই। ভোটের সময়ে তাই বলছি, আগামী পাঁচ বছর তোমার দেখা নাই গো, তোমার দেখা নাই। বাংলায় তোমাদের জায়গা নেই। পরিষ্কার।”
মমতা আরও বলেন, “ওদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য কী জানেন? আমরা করি সমস্যার সমাধান। আর ওরা করে অত্যাচার এবং মানুষের সঙ্গে ব্যবধান। ভবিষ্যতের জন্য চালাকিটা শুনুন। সতর্ক করে দিয়ে যাচ্ছি। যাদের ফর্ম ফিলাপ করছে, ওই ফর্মের মধ্যে আপনার নাম, ঠিকানা, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, পরিবারের ফোন নম্বর সব নিয়ে নিচ্ছে বিজেপির এজেন্সি বাইরে থেকে এসে। এর পরে যেই ভোট মিটে যাবে, আপনার অ্যাকাউন্টে যেটুকু টাকা আছে, সেটুকুও নিয়ে নেবে।”

এনআরসি-র নোটিস প্রসঙ্গে বলেন, “অসম থেকে এনআরসি-র নোটিস পাঠাচ্ছে। জেনে রাখুন, ভোট চলাকালীন মহিলাদের সংরক্ষণ দেওয়ার নামে আসন পুনর্বিন্যাস বিল নিয়ে আসছে। আমার তো ৩৭ শতাংশ মহিলা আছে। আমাকে তার জন্য সংরক্ষণ করতে হয়নি। আমি মহিলা সংরক্ষণকে সমর্থন করি। কিন্তু বলুন তো, মহিলাদের জন্য একই বিলে কেন আসন পুনর্বিন্যাস করে পশ্চিমবঙ্গকে খণ্ড খণ্ড করবে! মহিলাদের আত্মসম্মান আছে। মহিলাদের অসম্মান করা হচ্ছে, ব্ল্যাকমেলিং করা হচ্ছে। মহিলা বিল অনেক দিন আগে পাশ হয়ে আছে। তুমি এখনও কার্যকর করোনি কেন? জবাব চাই।” মমতা বলেন, “আমরা সরকারি কর্মীদের ২৫ শতাংশ ডিএ শুধু দিয়েছি, তা-ই নয়, তারা অনেক ছুটি পায়। দুর্গাপুজো হোক, কালীপুজো হোক, ছট্পুজো হোক। পাঁচ বছর অন্তর তারা বিদেশেও যেতে পারে। রাজ্যেও ঘুরতে পারে। একমাত্র রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ যেখানে পেনশন আছে। প্রধানমন্ত্রী বলে গেলেন, আপনারা আসলে সপ্তম পে কমিশন চালু করবেন। আরে ওটা তো ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা চালু করে দিয়েছি। কিছু বলার আগে আপনার প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারটাকে তো সম্মান করুন। মিথ্যা কথা বলার আগে ভাল করে ক্রসচেক করুন।পশ্চিমবঙ্গের বাইরে এ রাজ্যের মানুষ কাজ করতে গেলে, বিজেপির রাজ্যে তাদের উপর অত্যাচার হয়। তাদের মারা হয়, খুন করা হয়। আমাদের রাজ্যেও বাইরের অনেক পরিযায়ী শ্রমিক আছে। আমরা তো তাদের অত্যাচার করি না।”
মমতা বলেন , “কখনও কখনও আপনাদের জঙ্গলে হাতির কোপে পড়তে হয়। সেটা দুর্ভাগ্য। হাতিকে কেউ কিছু করতে দেবে না ওরা। কিন্তু অন্য অনেক জায়গা আছে, তারা কী করে আমি জানি। আমি সেটা বলতে চাই না। আমি বন, অরণ্য, জঙ্গল, চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা, সব মানুষকে নিয়ে বাঁচতে চাই। ওরা বলে যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে চাকরি হয়নি। তা আপনাদের চাকরি কোথায় গেল! আপনারা বলেছিলেন ভোটের আগে যে প্রতি বছরে ২ কোটি চাকরি দেবেন। তাতে ১২ বছরে আপনাদেরও ২৪ কোটি চাকরি হওয়ার কথা। কিন্তু রেলে কাজ করার জন্য গ্যাংম্যানও নেই।ভোটের সময়ে বহিরাগতেরা আপনার এলাকায় বসে আছে। বাইরে থেকে এসে হোটেল, গেস্ট হাউসে বসে আছে। কেউ উত্তরপ্রদেশ, কেউ রাজস্থান, কেউ মধ্যপ্রদেশ, কেউ অসম থেকে এসেছে। আপনাদের টাকা দেবে বলছে। ওই টাকা নিয়ে ওদের ফাকা করে দিন। নিজেদের লোক নেই। এজেন্সির লোকেদের দিয়ে ফর্ম ফিলাপ করছে।”

