
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: রাজ্য পুলিশের আধুনিকীকরণ ও কর্মীসংকট দূর করতে একগুচ্ছ বড় ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার বিধানসভায় পুলিশ বাজেটের জবাবি ভাষণে তিনি দাবি করেন, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে পুলিশ ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি, বরং একাধিক ঘাটতি রয়ে গিয়েছে। সেই পরিস্থিতি বদলাতেই নতুন সরকারের লক্ষ্য পুলিশকে আরও আধুনিক, দক্ষ ও জনমুখী করে তোলা। এই উদ্দেশ্যে শীঘ্রই ২০ হাজার কনস্টেবল নিয়োগের পাশাপাশি দুর্নীতির অভিযোগে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বিশেষ কন্ট্রোলরুম চালুর ঘোষণাও করেন মুখ্যমন্ত্রী।
শুভেন্দুর দাবি, “তৃণমূল সরকার মতামত দেওয়ার সুযোগ দেয়নি। ১৩ বছর স্বরাষ্ট্রদপ্তরের বাজেট নিয়ে বঞ্চিত ছিল। আগের সরকার বাজেট গিলোটিনে পাঠাত। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা মানেনি আগের সরকার। পুলিশ দপ্তরকে যতটা সম্ভব নিচে নামানো হয়েছে। বছরের পর বছর পুলিশে কোনও নিয়োগ হয়নি।” সিভিক ভলান্টিয়ার নিয়োগ নিয়েও পূর্বতন সরকারকে তোপ দাগেন মুখ্যমন্ত্রী। “আমি দীঘা থানায় গিয়ে দেখলাম ৪০০ সিভিক ভলান্টিয়ার। এসআই ২, এএসআই ৩, ১৫ কনস্টেবল। জিজ্ঞাসা করলাম চালান কি করে? শুধু সিভিক নিয়োগ করা হয়েছে। স্থায়ীভাবে নিযুক্তরা সব কথা শুনে চলবেন না। তাই সিভিক ভলান্টিয়ার নিয়োগ করা হয়েছে। কোনও যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ছাড়াই সিভিক ভলান্টিয়ার নিয়োগ করেছে। শুধুমাত্র ওরা রাজনৈতিক আনুগত্য দেখাবে বা টাকার বিনিময়ে নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক এবং তোলা তোলার কাজে লাগানো হয়েছে তাদের।”
রাজ্য পুলিশে মোট পদ ১ লক্ষ ২১ হাজার ৩৪৪। এখনও পর্যন্ত ৪৩ হাজার ৭৩ পদ ফাঁকা। পুজোর আগেই রাস্তায় নামবে ১৬ হাজার কনস্টেবল। সবমিলিয়ে মোট ২০ হাজার নিয়োগ করা হবে। শুধু শূন্যপদই নয়। থানায় থানায় পরিকাঠামোর উন্নয়নও হয়নি বলেই জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, “কলকাতা পুলিশে সিস্টেম কিছুটা আছে। আর বাকি সব জিরো। পুলিশ বারাক, রান্নাঘর, ডিএ, পে কমিশন, বদলি নীতি নেই। আপনি যেদিকে তাকাবেন সেদিকে অন্ধকার।” ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুর্নীতি ইস্য়ুতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি শুভেন্দু প্রশাসনের। পুলিশের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠলেও রেয়াত করা হবে না বলেই জানিয়েছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা, একটি কন্ট্রোলরুম খোলা হবে। ওই কন্ট্রোলরুমের হেল্পলাইন নম্বরে জানানো যাবে অভিযোগ। ফোন পেলেই তৎক্ষণাৎ নেওয়া হবে ব্যবস্থা।
তিনি জানান, ‘ভাইপো’র অবস্থা শওকত মোল্লা ও জাহাঙ্গির খানের থেকেও খারাপ হবে। অভিষেকের পাশাপাশি তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও তীব্র আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। অভিষেককে কটাক্ষ করে শুভেন্দু বলেন, “উনি প্রতিষ্ঠিত চোর। যত ভোটে জিতেছেন, তত ভোটে যদি আপনাকে হারাতে না পারি! মিলিয়ে নেবেন। সওকত, পুষ্পাদের থেকেও খারাপ অবস্থা হবে।” মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “একটি আঞ্চলিক দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক, গরুর গাড়ির হেডলাইট।”
বিধানসভায় দাঁড়িয়ে অভিষেককে ‘ছোঁড়া’ বলেও কটাক্ষ করেন শুভেন্দু। সম্প্রতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, “যদি বেঁচে থাকি সুদে-আসলে ২০৩১-এ সব ফেরত দেব।” একুশের মঞ্চ থেকেও ‘হিসাব নেওয়া’র কথা বলেছিলেন তিনি। এবিষয়ে বুধবার পালটা শুভেন্দু বলেন, “আরে বাইরে থাকলে তাহলে তো হিসাব নেবেন!” মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পরই অনেকে মনে করছেন, অভিষেকের জেলযাত্রা আসন্ন। যত ভোটে অভিষেক জিতেছেন তত ভোটে তাঁকে হারানোর হুঁশিয়ারি দেন তিনি। শুভেন্দুর কথায়, “ভাইপোপন্থী তৃণমূলের নাম নিশান পশ্চিমবঙ্গে থাকবে না, দায়িত্ব নিলাম। কোনও ভোটে জিততে পারবে না কালীঘাট তৃণমূল।”
কালীঘাট তৃণমূলের একুশে জুলাইয়ের সমাবেশে ভিড় নিয়েও কটাক্ষ করেন শুভেন্দু। তিনি বলেন, “অনেকে বলছে একুশে জুলাই করতে দেয়নি। করতে যদি না-ই দিতাম, তাহলে পৃথিবীর কোনও শক্তি আপনাদের সভা করতে দিতে পারত না।” বিড়লা তারামণ্ডলের সামনে কত লোক হয়েছে তারও ‘হিসাব’ দেন শুভেন্দু। তাঁর কথায়, “পঞ্চায়েতে ৪০ হাজার চোর আছে। তার ১০ শতাংশ এলেও ৪ হাজার। ৪ হাজার চোর কাউন্সিলর আছে। তার ১০ শতাংশ এলেও তো ৪০০। জেলে ঢুকে বেরিয়ে এসেছে এমন ২৫০-৩০০ জন আছে। জেলে যাওয়ার ভয়ে কলকাতায় এসে লুকিয়ে আছে এরকম ১০০০-১২০০ আছে। সব মিলিয়ে ৪-৫ হাজার তো হতেই পারে।”
এছাড়াও বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মমতাকে তীব্র আক্রমণ করে শুভেন্দু জানান, বিগত সরকারের আমলে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নারী নির্যাতন নিয়ে অসংবেদনশীল ছিলেন। ধর্ষণের রেট চার্ট প্রস্তুত করেছিলেন তিনি। কামদুনী, বারাসত, কাকদ্বীপ, হাঁসখালি, ময়নাগুড়ি, আর জি করে নারী নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে একাধিক মন্তব্য করেছিলেন মমতা। এক একটি মামলা ধরে ধরে সেই মন্তব্যগুলি বিধানসভায় তুলে ধরেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, বারুইপুরে নাবালিকার ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় বিজেপি সরকার কী ভূমিকা নিয়েছে তা গোটা বাংলা দেখেছে।
রাজ্যে ‘ডিম থেরাপি’ ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কে এবার মুখ খুললেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন তৃণমূল নেতাকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ার একাধিক ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এই ধরনের প্রতিবাদ বাংলার সংস্কৃতির অংশ নয় এবং তিনি কোনওভাবেই ডিম নিক্ষেপের রাজনীতিকে সমর্থন করেন না। বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে ২০২১ সালের নন্দীগ্রামে তাঁর উপর হওয়া হামলার স্মৃতিও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু প্রতিবাদের নামে হিংসা বা আক্রমণের সংস্কৃতি কখনও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
একুশের নির্বাচনের ফলপ্রকাশের দিনে নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর উপর হামলার ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “২০১৮ সাল থেকে রাজ্যে রাজনৈতিক হিংসা চলছে, বিশেষ করে ২০২১। দোসরা মে কাউন্টিংয়ের দিন আমি নিজে সাক্ষী ১ হাজার ৯৫৬ ভোটে আপনাদের নেত্রী হেরে গেলেন। হলদিয়া এসডিও অফিসে সার্টিফিকেট নিতে গেছিলাম। ছোট ইটের টুকরে নয়, বড় বড় আধলা পাথর ছোড়া হচ্ছিল। এখন সাধারণ মানুষ নিজেদের আক্রোশ, ক্রোধে ডিম ছুড়ছেন। যদিও আমি ডিম ছোড়াকে সমর্থন করি না। পুলিশ অ্যাকশনও নিয়েছে। কিন্তু আমার উপর যে আক্রমণ হয়েছে। সেদিন সার্টিফিকেট নেওয়া তো দূরের কথা। আমি বেঁচে ফিরতাম না। সিআরপিএফের বুলেট প্রুফ গাড়িতে ছিলাম তাই প্রাণে বেঁচে গেছি।” পাশাপাশি মানস মানস সাহার হত্যার কথা মনে করিয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কড়া আক্রমণ শানান শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, “মগরাহাটে মানস সাহাকে পিটিয়ে মেরেছেন। ১০ হাজার ছেলে রাজ্য ছেড়েছে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। ৩ দিনে ৫৬ জনকে খুন করেছেন। ১২ হাজার দোকান লুট করেছেন, ১০ হাজার বাড়িতে জেসিবি চালিয়ে দিয়েছেন। ৩০০-র বেশি মহিলাকে ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি, বিবস্ত্র করে অত্যাচার, কোচবিহারে বিজেপি সভানেত্রীকে বিবস্ত্র করে ২ কিলোমিটার ছুটিয়েছেন।”
মমতাকে নিশানা করে শুভেন্দু অধিকারীর কড়া হুঁশিয়ারি, “বিড়লা তারামণ্ডল থেকে উনি বলছেন, বেঁচে আছি দেখে নেব। আমি বলছি, বেঁচে থেকে আপনি প্রাক্তন হয়েছেন। বেঁচে থাকতেই আপনাকে প্রতিষ্ঠিত চোর প্রমাণ করব। বেঁচে থাকতেই সব দেখে যাবেন। আপনি যা করেছেন একুশের পরে, ৪৭-এর আগে ব্রিটিশরা এমন করেনি। কী ভাবছেন, আমি ছেড়ে দেব? দরকারে সিবিআইকে মামলা দিয়ে দিতে বলব।” সেই সঙ্গে ভবানীভবনের যে অভিযোগগুলো কার্যত ঠান্ডাঘরে চলে গিয়েছেল। সব ফাইল খুলে নতুন করে তদন্ত করার হুঁশিয়ারি দেন শুভেন্দু। তিনি জানান, “গুন্ডাদমন আইন চালু করেছি, ভবিষ্যতের বাংলাকে সুরক্ষিত করার জন্য। আগামী দিনে শাহজাহান-শওকত-জাহাঙ্গিরের মতো গুন্ডাদের চিরস্থায়ী সমাধান করার জন্য।” অভিষেকের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর হুঙ্কার, “ভোটে লড়ুন, কোথায় থাকবেন দেখবেন। দূরবীণ লাগবে দেখতে। অমিত শাহকে বলেছিলেন ডিজে বাজাবেন। বাংলার লোকই ডিজে বাজিয়ে দিয়েছেন।”
পূর্বতন সরকারের আমলে ঘটা একাধিক নারী নির্যাতনের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “কামদুনি ছোট্ট ঘটনা। বারাসত শরীর থাকলে যেমন সর্দিকাশি জ্বরজারি হয় তেমন একটু আধটু রেপ-টেপ হয়। কাকদ্বীপে ফুল রেপে ১০ হাজার, হাফ রেপে ৫ হাজার। হাঁসখালির ঘটনা মেয়েটা অন্তঃসত্ত্বা ছিল। ময়নাগুড়ির ঘটনা লাভ অ্যাফেয়ার্স। আর জি কর ওঁর বাবা-মা চাইলে তো ১০ লাখ দিতে পারি। এই তো ছিল নারী নিরাপত্তা। আর নিরাপত্তা কীভাবে দিতে হয়, ঘটনা ঘটলে কীভাবে মোকাবিলা করতে হয় বারুইপুরের ছোট্ট মেয়ে, প্রমাণ করে দিয়েছে সরকার। পুলিশের মিটিংয়ে বলি আমরা কেউ ভারতপিতা বলি না মাতা বলি। কোনও মহিলার উপরে কিছু ঘটলে কারও নির্দেশের উপরে অপেক্ষা করবেন না। যা ইচ্ছা হয় করে দেবেন। আপনাকে ঢাল হিসাবে রক্ষা করবেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী।”ফাঁসির নির্দেশ হলেও কেন তা কার্যকর হল না সে প্রশ্নও তোলেন শুভেন্দু। তাঁর কথায়, “মাটিগাড়া, কুলতলি ফাঁসির আদেশ হল। কার্যকর করতে পারলেন না কেন? হাই কোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট, বাড়ির লোক রাষ্ট্রপতির কাছেও যেতে পারেন। যদি দিল্লিতে নির্ভয়ার ক্ষেত্রে ৪ জনের চূড়ান্ত শাস্তি কার্যকর করতে পারে, তাহলে আমাদের রাজ্যে ১৮টি মামলায় কেন ফাঁসির নির্দেশ কার্যকর করতে পারলেন না? কোনও মনিটরিং নেই। মিডিয়াতে এসে ভাষণ দিয়ে তু ঘিচ মেরি ফটো। এই করতে করতে রাজ্যটাকে রসাতলে দিয়েছে।”
ক্ষমতায় আসার পরই আর জি কর ফাইলস খুলেছে শুভেন্দু প্রশাসন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমরা কী করছি শুধু দেখতে থাকুন। নারী নির্যাতন সে শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ, গণধর্ষণ কিংবা শিশু অত্যাচার হোক – এই সরকার আইনের মাধ্যমে কত দূর যেতে পারে তা দেখতে থাকুন। আর জি করে তিন আইপিএস অফিসার। তাঁদের মধ্যে একজন এডিজি পদমর্যাদার। সহজ নয়। সাসপেন্ড করতে হলে চার্জগঠন করতে হয়। অভয়ার ক্ষেত্রে এসব ভাবিনি। দ্রুততার সঙ্গে সাসপেন্ড করেছি। সন্দীপ ঘোষ, বিরুপাক্ষদের সাসপেন্ড করেছি। আমার কাছে ডকুমেন্ট আছে তিনি ফাইল চেপে রেখেছিল। আমি এনওসি দিয়ে দিয়েছি।” বলে রাখা ভালো, ইতিমধ্যে নারী সুরক্ষায় দুর্গারক্ষা স্কোয়াড, মহিলা থানা, হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে।
