
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক:দেশবাসীকে ৮০-তম স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। শনিবার সকালে এক্স মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মোদী স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা বার্তায় জানান, "স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে আন্তরিক শুভেচ্ছা। আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে সেই অগণিত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মরণ করি, যাঁদের সাহস, আত্মত্যাগ ও অবিচল নিষ্ঠা ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান নিশ্চিত করেছিল। 'বিকশিত ভারত' গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমরা যখন সম্মিলিতভাবে কাজ করছি, তখন তাঁদের স্বপ্নই আমাদের প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে চলেছে। ১৪০ কোটি ভারতবাসীর শক্তিতে বলীয়ান হয়ে আমাদের দেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতির নতুন উচ্চতা স্পর্শ করছে। আগামী দিনগুলিতেও এই অগ্রযাত্রা আরও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলুক—এই কামনাই করি।"
স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এদিন সকালে রাজঘাটে গিয়ে জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর সমাধিস্থলে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বাপুকে শ্রদ্ধা জানানোর পর, সেখান থেকে লালকেল্লায় পৌঁছন প্রধানমন্ত্রী। লালকেল্লায় প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অফ অনার দেওয়া হয়। এরপর লালকেল্লার প্রাকারে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন প্রধানমন্ত্রী।
তাঁর কথায়, ‘২০৪৭-এ স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তিতে বিকশিত ভারত হবেই।’ একই সঙ্গে তিনি বলে দিলেন, ‘এখন আর ছোট স্বপ্ন দেখার সময় নয়। বড় স্বপ্ন দেখুন। বড় প্রতিজ্ঞা করুন।’ লালকেল্লা থেকে আত্মনির্ভর ভারতের বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি বলেন, ‘নিজেদের স্বার্থ নিজেদের রক্ষা করতে হয়। অন্যের উপরে ভরসা করে দেশ গড়া যায় না।’ তিনি বলেন, আত্মনির্ভরতাই ভারতকে বিকশিত হয়ে ওঠার পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ৮০-তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে শনিবার সকালে লালকেল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছেন। ক্যাপ্টেন সোনিয়া সিং চৌহান জাতীয় পতাকা উত্তোলনে প্রধানমন্ত্রীকে সহায়তা করেন। বন্দে মাতরমে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা লালকেল্লা চত্বর। জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে ২১টি তোপধ্বনি দেওয়া হয়। এরপর লালকেল্লার প্রাকার থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। নিজের বক্তব্যের শুরুতেই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের শ্রদ্ধা জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই স্বাধীনতা দিবসে আমি বাপু এবং সমস্ত স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। এটি একটি ঐতিহাসিক দিন। স্বাধীনতার পর এই প্রথম লালকেল্লার প্রাকার থেকে 'বন্দে মাতরম' ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হলো।
প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেছেন, "আমরা সবাই ৮০-তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করছি। প্রতিটি হৃদয়ে 'বন্দে মাতরম'-এর ধ্বনি অনুরণিত হচ্ছে। আজ প্রতিটি ঘরে তেরঙা পতাকা উড়ছে এবং তা প্রতিটি মানুষের মনে বিরাজ করছে; নতুন সংকল্প নিয়ে দেশ উদ্দীপনা ও উৎসাহের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে।" প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেছেন, "গত কয়েক দিনে দেশের কিছু অংশে বন্যা হয়েছে, যার ফলে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আমি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আশ্বস্ত করছি, পুরো দেশ তাদের পাশে রয়েছে।" প্রধানমন্ত্রী মোদী আরও বলেন, "এখন ভারতের সামনে ২০৪৭ সালের মধ্যে একটি বিকশিত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার বড় স্বপ্ন রয়েছে। বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল দেশ যখন বিকশিত রাষ্ট্র হওয়ার সংকল্প নেয়, তখন তা আমাদের সাহসিকতারই পরিচয় বহন করে এবং বিশ্ব আমাদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে বাধ্য হয়।"
তাঁর কথায়, "একটি দেশ তখনই মহান হয়ে ওঠে ও নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করে, যখন নিজস্ব স্বপ্ন, সংকল্প ও নিজস্ব অন্তর্নিহিত শক্তির দ্বারা চালিত হয়ে এগিয়ে চলে। ছোট স্বপ্ন দিয়ে আর কাজ চলবে না। আমাদের বড় স্বপ্ন দেখতে হবে, কারণ বড় স্বপ্ন আমাদের চিন্তাভাবনাকে প্রসারিত করে এবং আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিধিকে বিস্তৃত করে। আমাদের সংকল্প হতে হবে অটল; সংকল্প যখন দৃঢ় হয়, তখন প্রতিকূলতা ও বিপর্যয়ের মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে বের করার সক্ষমতা আপনা-আপনিই গড়ে ওঠে।"
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, "গত ১২ বছরে প্রতিরক্ষা উৎপাদন চার গুণ বেড়েছে; খাদি ও গ্রামোদ্যোগের উৎপাদন পাঁচ গুণ বেড়েছে; ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন সাত গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মোবাইল ফোন উৎপাদন ৩৩ শতাংশ এবং ডিজিটাল লেনদেন ১০০ শতাংশ বেড়েছে।" প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, "আমরাও এক বিশাল স্বপ্নের রূপরেখা তৈরি করেছি—এমন এক স্বপ্ন যা বাস্তবায়নের পথে আমরা অবিচল সংকল্প নিয়ে এগিয়ে চলেছি এবং নতুন উচ্চতা স্পর্শ করার লক্ষ্য স্থির করেছি। আমাদের লক্ষ্য হলো, স্বাধীনতার শতবর্ষ পূর্তির সময়—অর্থাৎ ২০৪৭ সালের মধ্যে—ভারতকে একটি বিকশিত রাষ্ট্রে পরিণত করা। ১৪০ কোটি নাগরিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমেই আমাদের এই লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল দেশ যখন একটি উন্নত রাষ্ট্র হয়ে ওঠার সংকল্প নেয়, তখন তা বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের সাহসিকতার এক অনন্য নিদর্শন হয়ে ওঠে; আর তখন বিশ্ব আমাদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে বাধ্য হয়।"
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, "গত ১২ বছরে অগণিত নাগরিক—তাঁরা দলিত, নিপীড়িত, প্রান্তিক বা আদিবাসী; গ্রামীণ বা শহুরে; দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত; তরুণ বা প্রবীণ; নারী বা পুরুষ; কিংবা উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব বা পশ্চিম—যাঁরাই হোন না কেন, তাঁরা সবাই অটল সংকল্প ও নিষ্ঠার সঙ্গে দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য সম্ভাব্য সব রকম প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। আমি তাঁদের এই প্রচেষ্টাকে সশ্রদ্ধ স্বীকৃতি জানাই।"
তিনি বলেন, 'আত্মনির্ভর ভারত' হয়ে ওঠা অত্যন্ত জরুরি। তাই গত কয়েক বছর ধরে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে, ভারতের আর অন্য কোনও দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকা উচিত নয়; আমাদের আত্মনির্ভর হতে হবে। আমাদের নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। এই সংকল্প নিয়ে আমরা 'আত্মনির্ভর ভারত'-এর পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে চলেছি। প্রতিটি ভারতীয় 'মেক ইন ইন্ডিয়া', 'স্বদেশী' এবং 'লোকাল ফর লোকাল'-এর মতো উদ্যোগগুলোর সাথে যুক্ত হচ্ছেন।"
প্রধানমন্ত্রী মোদী আরও বলেন, "বর্তমান ডিজিটাল ও প্রযুক্তিগত যুগে চিপ-এর (সেমিকন্ডাক্টর চিপ) অপরিসীম গুরুত্ব আমরা বুঝি। ইলেকট্রনিক পণ্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম কিংবা পরিবহন ব্যবস্থা—সবক্ষেত্রেই চিপ অপরিহার্য; এগুলো ছাড়া পৃথিবী অচল হয়ে পড়বে। ভারত এই ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়েছে; ইতিমধ্যেই তিনটি বড় সেমিকন্ডাক্টর কারখানা স্থাপিত হয়েছে এবং আমাকে জানানো হয়েছে যে, রফতানির উদ্দেশ্যে এসব কারখানায় উৎপাদনও শুরু হয়ে গেছে। আগামী ৭-৮ বছরের মধ্যে আরও পাঁচ থেকে আটটি সেমিকন্ডাক্টর কারখানায় কার্যক্রম শুরু হতে চলেছে।"
প্রধানমন্ত্রী মোদী আরও বলেন, "গত ১০-১২ বছরে আমরা অনেক বিপদের মুখোমুখি হয়েছি। কোভিড পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার পরপরই ইউক্রেন ও পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরুর খবর আসতে শুরু করে। চারদিকে এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ভবিষ্যদ্বক্তারা যে কী সব ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তা ঈশ্বরই জানেন! দেশে টিকা পাওয়া যাবে না কিংবা পেট্রোল, ডিজেল ও সার পাওয়া যাবে না—এমন সব গুজব ছড়িয়ে দেশকে আতঙ্কিত রাখার মধ্যে কিছু মানুষ আনন্দ পেত। দেশের মধ্যে উদ্বেগের পরিবেশ তৈরি করেও অনেকে আনন্দ লাভ করত।" প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, "এখনও দেশকে অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভর করে থাকতে হচ্ছে; এর কারণ হলো আমাদের ত্রুটিপূর্ণ চিন্তাধারা। আপনারা জেনে অবাক হবেন, আমরা আমাদের উপকূলরেখার ৯৯ শতাংশকেই 'নো-গো এলাকা' (নিষিদ্ধ বা প্রবেশ-অযোগ্য এলাকা) হিসেবে ঘোষণা করে রেখেছিলাম। সমুদ্রের তলদেশে অনুসন্ধান বা অন্বেষণের কাজে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত আমরা নিজেরাই নিয়েছিলাম। এটি ছিল চিন্তার দৈন্যদশা। যেসব ক্ষেত্রকে একসময় 'নো-গো এলাকা' হিসেবে দেখা হতো, সেগুলোই এখন 'গো-অ্যাহেড এলাকা' (অগ্রগতির ক্ষেত্র) হয়ে উঠেছে।"
