
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: নীল সমুদ্রের সামনে বিয়ের আসর কিংবা পাহাড়ের কোলে বিয়ের আয়োজন— ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের এমন ধারণা এখন বেশ জনপ্রিয়। তারই অনুকরণে এবার ভাইফোঁটাকেও একটু অন্যভাবে উদযাপনের ভাবনা আসছে। চেনা বাড়ির চার দেওয়ালের বাইরে পছন্দের কোনও পর্যটনস্থলে ভাই-বোন মিলে কাটিয়ে আসতে পারেন কয়েকটি আনন্দের মুহূর্ত।
ভাইফোঁটা শুধু একটি পারিবারিক উৎসব নয়, ভাই-বোনের ভালোবাসা, স্নেহ ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধের প্রতীক। এই বিশেষ দিনটিকে আরও স্মরণীয় করে তুলতে সপরিবারে ছোট্ট ভ্রমণের পরিকল্পনা করা যেতে পারে। সপ্তাহান্তের দু’-তিন দিনের ছুটিতে প্রকৃতির কোলে সময় কাটানো, পুরনো স্মৃতি ভাগ করে নেওয়া আর একসঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠা— সব মিলিয়ে এবারের ভাইফোঁটা হয়ে উঠতে পারে একেবারে অন্যরকম। প্রশ্ন হল, কোথায় হতে পারে এই ‘ডেস্টিনেশন ভাইফোঁটা’?
বুনকুলুং: চোখের সামনে রোজ বহুতল দেখেন। এক রাতের মধ্যেই যদি সেই ছবিটা বদলায়? পৌঁছে যেতে পারেন এমন কোথাও, যেখানে হাত বাড়ালেই রয়েছে পাহাড়, নদী, অরণ্য, তবে কি ভাইফোঁটার আনন্দ-অনুষ্ঠান দ্বিগুণ হবে না? চলুন বুনকুলুং। শিলিগুড়ি শহর ছাড়ালেই শালের জঙ্গল। সেই সবুজে চোখ ডুবতে না ডুবতেই উঁকি দেয় চা-বাগান। খানিক যেতে না যেতেই শুরু হয় পাহাড়। সেই পাহাড়ি পথ ধরেই পৌঁছোনো যায় বুনকুলুঙে। বালাসন ও মুরমা নদী বয়ে গিয়েছে কোলাহলবর্জিত ছোট্ট গ্রামটির উপর দিয়ে। গ্রামের ছোট ছোট বাড়িতে রঙিন ফুলের সম্ভার। বুনকুলুঙের আনাচেকানাচে রয়েছে দারচিনির খেত। ঘুরে নিতে পারেন গ্যামন সেতু। দু’পাশে পাহাড়, নীচ দিয়ে বয়ে গিয়েছে পাহাড়ি নদী। স্থানীয়দের কাছে এই জায়গাটি জনপ্রিয় পিকনিক স্পট। হোম স্টে-তে থাকার বন্দোবস্ত এখানে। চাইলে ভাইফোঁটা উপলক্ষে কথা বলে জমিয়ে রান্নাও করতে পারেন। আর যদি ভাইফোঁটার আচার-অনুষ্ঠান বাদও দেন, খেয়ে, ঘুমিয়ে, ঘুরে দিব্যি কেটে যাবে দুই দিন। শিলিগুড়ি বা মিরিক, দুই জায়গা থেকেই বুনকুলুং বেশ কাছে। শিলিগুড়ি থেকে জায়গাটির দূরত্ব ৪৮ কিলোমিটার। মিরিক থেকে ১৬ কিলোমিটার মতো।
কী ভাবে যাবেন?
ট্রেনে, বাসে বা গাড়িতে পৌঁছোন শিলিগুড়ি বা নিউ জলপাইগুড়ি। সেখান থেকে দুধিয়া হয়ে বংকুলুং যাওয়া যায়, আবার মিরিক হয়েও যাওয়া যায়। দুধিয়া ছাড়িয়ে গেলে মঞ্জু পার্ক। সেখান থেকে ৭-৮ কিলোমিটার গেলেই বুনকুলুং। মিরিকগামী শেয়ার গাড়িতে উঠে সৌরিনী বাজারে নেমে, সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করেও বংকুলুং আসতে পারেন।
গুলমা: উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় পর্যটকেরা গেলেও, এ স্থান রয়ে গিয়েছে লোকচক্ষুর আড়ালে। শিলিগুড়ি থেকে হিলকার্ট রোড ধরে এগিয়ে গেলে সুকনা মোড় আসার আগে ডান দিকের রাস্তা। অল্প গেলেই গুলমা টি এস্টেট। জায়গাটি সমতল। কিন্তু পাহাড় এখান থেকেই শুরু। গ্রামটি কার্যত পাহাড়ের কোলে। মহানন্দা নদীর ধারে। শিলিগুড়ি থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস ধরে আরও উত্তরে গেলে সেবকের আগে গুলমা স্টেশন। গুলমা ছাড়ালেই পেরোতে হয় মহানন্দা। একটা বা দু’টি দিন প্রকৃতির কোলে বিশ্রাম নেওয়ার পক্ষে দারুণ জায়গা এটি। থাকার জন্য এখানে মিলবে হোম স্টে। চাইলে এখান থেকে পাহাড়েও ঘুরে আসতে পারেন।
কী ভাবে যাবেন?
ট্রেনে, বাসে বা গাড়িতে চলুন নিউ জলপাইগুড়ি অথবা শিলিগুড়ি। শিলিগুড়ি থেকে সড়কপথে দূরত্ব পড়বে ১০-১২ কিলোমিটারের মতো।
বেলপাহাড়ি: নভেম্বরের সময়টায় বেলপাহাড়ির আবহাওয়া থাকে বেশ মনোরম। দিনে গরম হলেও, রাতে কিন্তু চাদর বা হালকা সোয়েটার চাপাতেই হবে। দু’টি দিন ঘুরে আসুন সেখানেই। ঝাড়গ্রামের বিনপুর-২ নম্বর ব্লকের অন্তর্গত বেলপাহাড়ি সুন্দর একটি পর্যটনকেন্দ্র। পাহাড়, জলাধার, শাল-শিমুলের জঙ্গলে সজ্জিত বেলপাহাড়ি হতেই পারে ক্লান্তি কাটানো এবং অলস যাপনের সঠিক ঠিকানা। ঝাড়গ্রাম হয়ে পৌঁছোতে পারেন সেখানে। ঘোরার জন্য রয়েছে রানিবাঁধ, সুতানের জঙ্গল, তালবেড়িয়া ড্যাম, খাঁদারানি হ্রদ, কেতকী ঝর্না, ঢাঙ্গিকুসুম-সহ একাধিক জায়গা। যদি কোথাও যেতে ইচ্ছা না করে, হেঁটেই আশপাশ ঘুরতে পারেন। তালবেড়িয়া ড্যামের ধারে বা সুতানের জঙ্গলের শোভা দেখে, আড্ডায় কাটিয়ে দিতে পারেন সারাটি দিন। বেলপাহাড়িতে আরামদায়ক একাধিক রিসর্ট, হোটেল মিলবে। অরণ্যের মধ্যে, পাহাড়ের কোলে হোমে স্টে-ও পাবেন আশপাশে।
কী ভাবে যাবেন?
বেলপাহাড়ির রাস্তা বেশ ভাল। পথশোভা উপভোগ করতে হলে গাড়ি নিয়ে যাওয়া সবচেয়ে ভাল। কলকাতা থেকে দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটারের মতো। না হলে ট্রেনে ঝাড়গ্রাম স্টেশনে পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে নিতে পারেন। ধর্মতলা থেকে ঝাড়গ্রাম বা বেলপাহাড়ির বাসও পাওয়া যায়।
রাজমহল: নদী, ঝর্না, পাহাড়, ইতিহাস— এই সবকিছু নিয়েই অপেক্ষা করছে ঝাড়খণ্ডের সাহিবগঞ্জ জেলার রাজমহল। সাহিবগঞ্জ (লোকমুখে যা সাহেবগঞ্জ নামেই পরিচিত) জুড়েই রয়েছে ঢেউখেলানো সবুজ পাহাড়। গঙ্গা এখানে বেশ চওড়া। গঙ্গা দর্শনের পাশাপাশি ঘুরে নিতে পারেন মোতি ঝর্না, সিংহী দালান, ছড়িয়ে থাকা একাধিক মন্দির, জামা মসজিদ-সহ বিভিন্ন স্থান। সাহিবগঞ্জ থেকে মোটামুটি ৪০ কিলোমিটার দূরে রাজমহলে রয়েছে সিংহী দালান। জানা যায়, ১৭ শতকের মধ্যভাগে এটি তৈরি। খিলান দেওয়া বিস্তৃত হল। সেখান থেকেই গঙ্গার সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। সিংহী দালান থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে রয়েছে জামা মসজিদ। মোগল স্থাপত্যের অনুকরণে তৈরি হয়েছিল সুবিশাল মসজিদটি। জামি মসজিদ থেকে চলে আসতে পারেন বারোদুয়ারি। ১২টি দরজা থেকে এই স্থানের নাম বারোদুয়ারি। শোনা যায়, ১২টি সুড়ঙ্গপথে একসঙ্গে বেরিয়ে শত্রুদের ঘিরে ফেলতেই এটি তৈরি হয়েছিল। অনেক সিঁড়ি পেরিয়ে পৌঁছোনো যায় উপরের খোলা চত্বরে। থাকার জন্য এখানে একাধিক হোটেল রয়েছে।
কী ভাবে যাবেন?
হাওড়া থেকে রাতে জামালপুর এক্সপ্রস ধরলে পরের দিন সকালেই পৌঁছে যাবেন সাহিবগঞ্জ। সেখান থেকে অটো বা গাড়ি ভাড়া করে দ্রষ্টব্য স্থানগুলি ঘুরে নিন। সড়কপথেও যাওয়া যায়। বিমানে গেলে রাঁচি হয়ে যেতে পারেন সেখানে।
নেতারহাট: আলসেমি আর আড্ডায় দু’টি দিন কাটাতে ঘুরে আসতে পারেন পড়শি রাজ্য ঝাড়খণ্ডের হিলস্টেশন নেতারহাট থেকেও। পাহাড়, অরণ্য, প্রকৃতির রূপ এখানে উজাড় করা। লোধ জলপ্রপাতের প্রবল জলস্রোত মন ভরিয়ে দেবে। পলামুর পাহাড়ি এলাকার সবচেয়ে সুন্দর অঞ্চল হল নেতারহাট। সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের অনন্য সৌন্দর্য ধরা পড়ে এখান থেকে। ম্যাগনোলিয়া ভিউ পয়েন্ট থেকে পড়ন্ত বিকেল দারুণ উপভোগ্য। পাইনের জঙ্গল, নাসপাতির বাগান, অরণ্যঘেরা পথ, জলাধার ঘুরে নিন দিনদুয়েকে। বিশেষত নেতারহাট থেকে ৫৯ কিলমোটার দূরের লোধ জলপ্রপাতের সৌন্দর্য অনুপম। নেতারহাটে থাকার জন্য সরকারি অতিথি আবাসের পাশাপাশি একাধিক হোটেলও রয়েছে।
কী ভাবে যাবেন?
হাওড়া থেকে রাত ১০টা ১০ মিনিটে ছেড়ে ক্রিয়াযোগ এক্সপ্রেস রাঁচী পৌঁছোয় ভোর ৫টা ৪০ মিনিটে। সেখান থেকে গাড়িতে ১৬০ কিলোমিটার নেতারহাট। দুপুরের মধ্যেই পৌঁছোনো যাবে। দু’দিনেই নেতারহাট ঘুরে নেওয়া যায়।
