
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: বাঙালি পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, দুর্গাপুজোর আবেগ আর উৎসবের আমেজ থেকে নিজেকে কখনও পুরোপুরি দূরে রাখতে পারেন না। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরেও তাই মনের মধ্যে বয়ে চলে কলকাতার পুজোর স্মৃতি। ঠিক এমনই এক টান থেকেই তিন বছর আগে সুইডেনের লুন্ড শহরে কয়েকটি বাঙালি পরিবারের এক কাপ চায়ের আড্ডায় জন্ম নিয়েছিল এক স্বপ্ন। বিদেশের মাটিতেই যদি একটু হলেও ফিরিয়ে আনা যায় কলকাতার পুজোর সেই পরিচিত আবহ, ছোঁয়া যায় বাংলার উৎসবের স্বাদ—সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয়েছিল এক নতুন পথচলা।
সেই ছোট্ট ভাবনাই আজ রূপ নিয়েছে এক প্রাণবন্ত দুর্গোৎসবে। পুজোকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বন্ধুত্ব, রঙিন স্মৃতি ও প্রবাসের মাটিতে এক টুকরো নিজের ঘর। এখানে দুর্গাপুজো তাই কেবল দেবীর আরাধনা নয়; নিজস্ব শিকড়, সংস্কৃতির কাছে ফিরে যাওয়া। একসঙ্গে থাকার আনন্দকে ধরে রাখার এক প্রয়াসও বটে। অন্যতম উদ্যোক্তা শতরূপা বোস জানান, দুর্গাপুজোয় তাঁদের ভাবনা— ‘ত্রিধা’—সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশ। সৃষ্টি, পালন এবং পরিবর্তন— তিন চিরন্তন শক্তিকে সাজসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে এই উদযাপনে। ভারতের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে এবারের সজ্জায় জায়গা পেয়েছে মধুবনী শিল্পের রং, রেখা ও প্রতীক। বাংলার চিরপরিচিত দুর্গোৎসবের আবেগের সঙ্গে ভারতের আরেক সমৃদ্ধ লোকশিল্পের এই মেলবন্ধন, লুন্ড শহরের বুকে আয়োজিত দুর্গাপুজোটিকে এক অনন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছে।
প্রবাসী জীবনের সঙ্গেও যেন মিলে যায় এই সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশের ভাবনা। স্বদেশ থেকে মানুষ এখানে শিকড় সঙ্গে নিয়েই আসে। তারপর চলে নতুন দেশে তাকে যত্নে বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টা, এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুনভাবে এগিয়ে চলা। বাংলার পুজোর দিনক্ষণ মেনেই চলে এখানে চলে দুর্গাপুজোর আয়োজন। প্রস্তুতি শুরু হয় কয়েক মাস আগে। ভারত থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী আনা হয়। হাতে হাতে সাজসজ্জা তৈরি করা হয়। উদযাপন যাতে মনমতো হয়, তা নিশ্চিত করতে ঘন ঘন বৈঠক আর মহড়া চলে। কয়েকদিনের জন্য যেন চূড়ান্ত ব্যস্ততায় কাটে এ পুজোর আয়োজকদের সন্ধ্যা ও সপ্তাহান্তগুলি।
নবমীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এই উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। সেদিন গান, নাচ, অভিনয় আর আড্ডার মধ্য দিয়ে ফিরে আসে পরিচিত পুজোর আবহ। আর রকমারি খাবার ছাড়া যে বাঙালির পুজো অসম্পূর্ণ, তা বুঝি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অষ্টমীর লুচি-ছোলার ডাল, কলকাতা-স্টাইলের মাটন বিরিয়ানি, আর দশমীর দই কাতলা— এ স্বাদ মুখে এলেই মুহূর্তে ফিরে আসে স্বদেশে ফেলে আসা ঘরের স্মৃতি। সবচেয়ে বড় কথা, এই পুজো এখানকার নতুন প্রজন্মকেও তাদের শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। যারা হয়তো কলকাতার পুজো সরাসরি দেখেনি, তারাও গান, খাবার, গল্প ও উৎসবের মধ্য দিয়ে সেই সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। ঢাকের শব্দ, ধূপের গন্ধ, বাংলা ভাষায় অবাধ গল্পগাছা আর চেনা খাবারের স্বাদেই যেন কয়েকটি দিনের জন্য লুন্ড আর কলকাতার দূরত্ব সত্যিই কমে আসে। ঠিকানা খাতায় কলমে সুইডেন হলেও, দুর্গাপুজোর কয়েকটা দিনে লুন্ডবাসীর মন ফিরে যায় কলকাতাতেই।
