
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো শুধু উৎসবের কয়েকটি দিন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির সাংস্কৃতিক সত্তা, ইতিহাস, আবেগ এবং আত্মপরিচয়ের গভীর যোগ। শরতের আকাশে কাশফুল দোলার সঙ্গে মণ্ডপে মণ্ডপে যেমন দেবীর আরাধনা হয়, তেমনই ফিরে আসে বাংলার অতীত, সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের নানা অধ্যায়। সেই আত্মপরিচয়েরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে এবারের দুর্গোৎসবের ভাবনায় তুলে ধরছে তালতলা সর্বজনীন দুর্গোৎসব। এ বার তাদের থিম ‘বঙ্গদর্শন’। আর এই ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে ‘বন্দে মাতরম’-এর ১৫০ বছরের ইতিহাস। পুজোর আবহে ঐতিহ্য, ইতিহাস ও বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনাকে একসূত্রে গেঁথে দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বন্দে মাতরম ধ্বনি যেন বিগত দেড়শো বছর ধরে কোটি বাঙালির হৃদয়ে আত্মপরিচয়ের মূল মন্ত্রটি সংরক্ষণ করেছে। সেই ‘বন্দে মাতরম’কেই এবার শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাচ্ছে তালতলা সর্বজনীন। ১৮৭৫ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ‘বন্দে মাতরম’। পরবর্তীকালে তাঁরই উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’-এ এই গান নতুন তাৎপর্য লাভ করে। ক্রমে তা পরাধীন ভারতের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, আত্মমর্যাদা এবং দেশমাতৃকার প্রতি শ্রদ্ধার এক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়। এই দীর্ঘ ইতিহাসই এবারের মণ্ডপে শিল্পের ভাষায় জীবন্ত হয়ে উঠবে। মণ্ডপে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই দর্শনার্থীদের সামনে উন্মুক্ত হবে উনিশ শতকের বাংলার এক বিস্তৃত সাংস্কৃতিক পরিসর। থাকবে বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যসাধনা, তাঁর সময় ও সৃষ্টির আবহ; হাতে লেখা পাণ্ডুলিপির আদলে নির্মিত শিল্পকর্ম ও পুরনো দিনের মুদ্রণশৈলী। অন্যদিকে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হবে ‘বন্দে মাতরম’কে ঘিরে স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তাল অধ্যায়— একটি গান কীভাবে মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে এক বৃহত্তর জাতীয় চেতনার অংশ হয়ে উঠেছিল, তারই নানা মুহূর্ত ফুটে উঠবে মণ্ডপসজ্জায়।
এই উপস্থাপনায় ইতিহাস হয়ে উঠবে অনুভবের অভিজ্ঞতা। শব্দ, আলো, শিল্পকর্ম ও দৃশ্যরূপের সমন্বয়ে দর্শক অনুভব করবেন ‘বন্দেমাতরম’-এর জন্মলগ্ন থেকে তার বিস্তারের কাহিনি, ঔপনিবেশিক ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উদ্বুদ্ধ মানুষের আবেগের সঙ্গে এ গানের জড়িয়ে যাওয়া। ‘বন্দে মাতরম’-এর ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে রয়েছে তার সুরের যাত্রাও। সেই যাত্রাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবারের মণ্ডপে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কণ্ঠে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে এই গানের পরিবেশনা থেকে শুরু করে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে স্বাধীনোত্তর ভারতের শ্রোতাদের কাছে তার নতুন আবেদন, পরবর্তীকালে এ আর রহমানের আধুনিক সঙ্গীতায়োজনে নতুন প্রজন্মের কাছে তার পুনরাবিষ্কার— বিভিন্ন সময়ের এই সুরযাত্রার প্রতিফলন দেখা যাবে মণ্ডপের দেওয়াল জুড়ে। একই গান কীভাবে সময়ের সঙ্গে তার পরিবেশনা ও সঙ্গীতভাষা বদলেছে, অথচ তার আবেগ ও আবেদনকে বহন করে চলেছে, সেই ধারাবাহিকতাও তুলে ধরা হবে। তালতলা সর্বজনীনের এবারের আয়োজন তাই নিছক অতীতচর্চা নয়।
