
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: মাতৃআরাধনা বাঙালির সংস্কৃতি ও আবেগের সঙ্গে গভীর ভাবে জড়িয়ে রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সেই শারদোৎসবের পরিসর ছড়িয়ে পড়েছে প্রকৃতি ও মাতৃশক্তির আরাধনায় বিশ্বাসী বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও। বাংলাদেশে এমন বহু ছোট-বড় আদিবাসী সম্প্রদায় রয়েছে, যাঁরা প্রতি বছর উৎসাহ ও আনন্দের সঙ্গে শারদীয়া দুর্গাপুজোয় সামিল হন। এই পুজোয় কখনও হিন্দু ব্রাহ্মণ পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করেন, আবার কোথাও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রশিক্ষিত প্রতিনিধিরাই পুজোর আচার-অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। প্রতিমার গড়নে খুব বেশি পার্থক্য না থাকলেও সাজপোশাক, পুজোর রীতি এবং উৎসব পালনের ধরনে কোথাও কোথাও ফুটে ওঠে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ছাপ। ফলে বাংলাদেশের সমতলভূমির জনবহুল শহর থেকে শুরু করে পাহাড়ঘেরা প্রত্যন্ত গ্রাম—বিভিন্ন প্রান্তেই শারদোৎসবের আবহে মেতে ওঠেন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষজন। প্রকৃতির সান্নিধ্যে তাঁদের দুর্গাপুজো হয়ে ওঠে ধর্মীয় আচার, লোকসংস্কৃতি এবং নিজস্ব ঐতিহ্যের এক অনন্য মেলবন্ধন।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের নেতা সঞ্জীব দ্রং জানান, দেশের অন্তত ১৫টি জনগোষ্ঠীর মানুষ দুর্গাপুজো করেন। এদের মধ্যে রয়েছেন ত্রিপুরা, হাজং, বানাই, ওরাওঁ, মাহাতো, পাত্র, কোচ, বর্মন, গঞ্জু, ডালু ইত্যাদি। সঞ্জীব জানান, এক সময় এসব জনগোষ্ঠীর মানুষদের অধিকাংশই ছিলেন প্রকৃতি পূজারী। মহানগর সর্বজনীন পুজো কমিটির সভাপতি মনীন্দ্রকুমার নাথ বলেন, ক্ষুদ্র বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে যাঁরা ধর্মান্তরিত হননি, তাঁরা কমবেশি সবাই সনাতন ধর্মাবলম্বী। তিনি জানান, এসব গোষ্ঠীর মানুষেরা সনাতন ধর্ম পালন করলেও তাঁদের প্রত্যেকের আলাদা ধর্মাচার রয়েছে।
নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুর ও তার আশপাশের পাহাড়ি অঞ্চলের হাজং সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজোর মণ্ডপগুলি তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং উৎসবমুখর আবহ ফুটিয়ে তোলে। এই অঞ্চলে হাজংরা সনাতন ধর্মের রীতি মেনে প্রতি বছর ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনায় দুর্গাপুজো উদযাপন করেন। হাজংদের দুর্গাপুজো মণ্ডপের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও আকর্ষণ হল সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি তাদের ঐতিহ্যবাহী উৎসব ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনের প্রকাশ।
পুজোর দিনগুলিতে হাজং নারীরা তাঁদের নিজস্ব তাঁতে বোনা রঙিন ও ঐতিহ্যবাহী ‘রাঙা পাথিন’ পোশাক পরেন। পুরুষরাও বিশেষ ধরনের ধুতি-কুর্তা পরে মণ্ডপে যান। বিজয়া দশমী ও পুজোর রাতগুলোতে মণ্ডপ প্রাঙ্গণে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী গান, নাচক এবং নাটক পরিবেশন করেন এই সম্প্রদায়েক মানুষেরা। মণ্ডপগুলিতে শুধু হিন্দু বা হাজং সম্প্রদায়েপ মানুষেরা নয়, স্থানীয় গারো আদিবাসী এবং মুসলিম বাঙালিরাও উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেন। সুসং দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদী, সাদা মাটির পাহাড় এবং মনোরম সবুজ প্রকৃতির কোলে স্থাপিত এই মণ্ডপগুলি দর্শনার্থীদে মন কাড়ে।
বাংলাদেশের রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, সিলেট, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, রাজশাহী-সহ কয়েকটি জেলায় বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষেরা দুর্গাপুজো সাড়ম্বরে উদযাপন করেন। নিজস্ব আচার ও সংস্কৃতি মেনেই পুজোয় মাতেন তাঁরা। জাতিগোষ্ঠীগুলির নিজস্ব সংস্কৃতির বিভিন্ন আচারের মিশেল ঘটেছে দুর্গাপুজোয়। আদতে তো এরা কেউ সূর্যপুজো করেন, কেউ বা করেন গাছের পুজো, আবার কেউ ধানের পুজো, কেউ বা মনসার পুজো করে থাকেন।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, ব্রিটিশ শাসনকাল থেকে হিন্দু বাঙালিদের দুর্গাপুজোকে ধীরে ধীরে আপন করে নেন বাংলার আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলিও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেবে, বাংলাদেশে ত্রিপুরা জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যা এক লাখ ৩৩ হাজারের মতো। এই জনগোষ্ঠীর বড় অংশটি পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের জেলাগুলোতে বাস করেন। তিন পার্বত্য জেলা ছাড়াও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর কেউ কেউ সিলেট, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা এবং ফরিদপুর এলাকায় বসবাস করেন। ত্রিপুরারা হিন্দু ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠী। বহু বছর ধরেই তাদের মধ্যে দুর্গাপুজোর প্রচলন রয়েছে।
বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী ফাল্গুনী ত্রিপুরা জানান, মূলধারার বাঙালি হিন্দুদের দুর্গাপুজো উদযাপনের সঙ্গে ত্রিপুরাদের দুর্গাপুজোর তেমন একটা পার্থক্য নেই। ফাল্গুনী বলেন, তাদের দুর্গাপুজোর আচারে পরিবর্তন এসেছে গত কয়েক দশকে। অন্যতম পরিবর্তন হল দুর্গা প্রতিমার পোশাক। আগে এক সময় ত্রিপুরারা দুর্গাকে বাঙালিদের মতোই শাড়ি পরাতেন। এখন ত্রিপুরা নারীর পোশাক ‘রিনাই-রিসা’ পরানো হয়। পোশাকে পরিবর্তন আসার সঙ্গে সঙ্গে কয়েক বছর ধরে পুজোর মন্ত্রপাঠের জন্য জনগোষ্ঠীরই প্রশিক্ষিত পুরোহিতদের ব্যবহার করা হচ্ছে।
নেত্রকোনার বিরিশিরিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক আকাডেমির পরিচালক সুজন হাজং জানান, তাঁদের সম্প্রদায়ের লোকেরা নিজেদের সংস্কৃতি অনুযায়ী কিছুটা ভিন্নভাবে উৎসব উদযাপন করেন। হাজংদের দুর্গাপুজোর প্রার্থনা বা উপাসনার ধরণ আলাদা হয়। ধর্মীয় আচার পালনের জন্য বাঙালি পুরোহিত না এনে নিজেদের সম্প্রদায়ের পুরোহিত দিয়ে মন্ত্রপাঠ ও অন্যান্য আচার করানো হয়। যদিও হাজংদের প্রধান পুজো হল দেউলী পুজো। যা মূলত ধান কাটার সময় আয়োজন করা হয়। এই সময় কাদা খেলা এবং জলকেলী-সহ নানা ধরণের খেলার আয়োজন করে হয়।
বাংলাদেশে বানাই সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা ঠিক কত, সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ঢাকার কাছে সাভার, গাজীপুর, শ্রীপুর-সহ বেশ কয়েকটি এলাকায় তাদের বাস। এদের সঙ্গে বানাইদের সংস্কৃতি, আচারের মিল রয়েছে। জনগোষ্ঠীর নেতা রিপন বানাই জানান, তাঁদের সম্প্রদায়ের মানুষেরা এক সময় কেবলই প্রকৃতির পূজারী ছিলেন। পরে দুর্গাপুজো শুরু করেন। ১৭৫৭ সালে এই অঞ্চলে ইংরেজ শাসন শুরুর আগেই দুর্গাপুজো শুরু হয়। দেবীদুর্গাকে বানাই নারীর পোশাক ‘পাথিন’ পরানো হয়। বানাইরা বিসর্জনের পর নানা আনন্দ আয়োজন করে। যার মধ্যে রয়েছে, কাদা খেলা, যাকে বানাইরা বলেন ‘প্যাক’ বা ‘পাক’ খেলা।
বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলির অন্যতম পাত্র। বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে বসবাসকারী পাত্ররা হিন্দু ধর্মের অনুসারী। এরা দুর্গাপুজোকে ‘খেমুং লারাং’ নামে ডাকেন। দুর্গাপুজোয় পাত্ররা হাঁস বলি দেন, নানা ধরণের আনন্দ আয়োজন করেন। ওরাওঁ সম্প্রদায় মূলত প্রকৃতি উপাসক। এখন তাদের মধ্যেও দুর্গাপুজো প্রচলিত। আরেকটি জনগোষ্ঠী কোচদের মধ্যে দুর্গাপুজোর পাশাপাশি কালীপুজো এবং সরস্বতীর পুজোরও প্রচলন রয়েছে। বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে বসবাসকারী স্বল্প পরিচিত এই জনগোষ্ঠীর লোকেরা হিন্দু ধর্মের অনুসারী।
