
কলকাতা, ১১ সেপ্টেম্বর : জেসি ওয়েন্স একজন বিশ্বখ্যাত আমেরিকান ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড অ্যাথলিট। যিনি ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকে লংজাম্পে চারটি স্বর্ণপদক পেয়ে যে রেকর্ড তিনি গড়েছিলেন দীর্ঘ পঁচিশ বছর তা অক্ষত ছিল। পরবর্তীতে আমেরিকার ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড বিভাগে শ্রেষ্ঠ কীর্তি স্থাপনকারীকে দেওয়া হয় জেসি ওয়েন্স পুরস্কার। জেসি ওয়েন্সকে ১৯৯৯ সালে বিবিসি শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ ক্রীড়া ব্যক্তিত্বের তালিকায় ষষ্ঠ স্থান দেয়।
অলিম্পিকের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ অ্যাথলিট হিসেবে তাকে গণ্য করা হয়।এই কিংবদন্তি অ্যাথলিটের জন্ম ১৯১৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আলাবামার ওকভিলে।
ক্লিভল্যান্ডের ফেয়ারমাউন্ট জুনিয়র হাই স্কুলে জেসি ওয়েন্সের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। তারপর তিনি ভর্তি হন ইস্ট টেকনিক্যাল হাই স্কুলে। স্কুলে পড়াশুনা করা কালীনই জেসি ওয়েন্সএর দৌড়ের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ জন্মায়। ফেয়ারমাউন্ট জুনিয়র হাই স্কুলে ট্র্যাক প্রশিক্ষক চার্লস রিলের সান্নিধ্যে এসে তিনি অ্যাথলেটিক্সে মনোনিবেশ করেন। খেলাধুলার খরচ যোগাতে তিনি কখনো স্টিলের কারখানায়, কখনো জুতো সারাইয়ের দোকানে, কখনো আবার মুদির দোকানের মালপত্র বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কাজও করেছেন!
তার প্রথম প্রতিযোগিতা জেসি ওয়েন্স শিকাগোর ন্যাশনাল হাই স্কুলে আয়োজিত প্রতিযোগিতায়। সেই প্রতিযোগিতায় একশো গজ দৌড় মাত্র ৯.৪ সেকেন্ডে শেষ করেন এবং লং জাম্পের ক্ষেত্রে ৭.৫৬ মিটার দৈর্ঘ্যের লাফ দিয়ে রেকর্ড গড়েন। এর পর থেকেই জাতীয় স্তরে অ্যাথলিট হিসেবে তিনি পরিচিত পেতে থাকেন।এরপর ওয়েন্স ভর্তি হন ওহিও বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে ল্যারি সিণ্ডারের প্রশিক্ষণে আরো দক্ষ অ্যাথলিট হয়ে ওঠেন তিনি। তিনি যে একজন দক্ষ অ্যাথলিট তা প্রমাণ করে দেন ১৯৩৫ আর ১৯৩৬ সালে পরপর বিশ্বসেরা রেকর্ডগুলি গড়ে। ১৯৩৫ সালের ২৫ মে জেসি ওয়েন্স অ্যাথলেটিক্সে চারটি বিশ্ব-রেকর্ড করেন। তিনি ১০০ গজের দৌড়, ২২০ গজের স্প্রিন্ট, ২২০ গজের লো-হার্ডলস, লং জাম্প ইত্যাদিতে পরপর চারটি বিশ্ব-রেকর্ড করেছিলেন।
১০০ গজের দৌড়ে ৯.৪ সেকেন্ড, লং জাম্পে ৮.২৩ মিটার দৈর্ঘ্য, ২২০ গজের লো-হার্ডলস মাত্র ২২.৬ সেকেণ্ডে শেষ করায় বিশ্বে জেসি ওয়েন্স এক খ্যাতিমান অ্যাথলিট হিসেবে স্বীকৃতি পান। এরপরেও কৃষ্ণকায় মানুষ হওয়ার জন্য তাকে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
১৯৩৬ সালে জার্মানির বার্লিন অলিম্পিকে এক কৃষ্ণকায় আফ্রো-আমেরিকান অ্যাথলিট হওয়ার কারণে অলিম্পিকে যোগদানের আবেদন বানচাল করার পরিকল্পনা করেছিলেন এনএএসিপি সেক্রেটারি ওয়াল্টার ফ্রান্সিস হোয়াইট।
শেষ পর্যন্ত অলিম্পিক কমিটি ওয়েন্স এবং তাঁর সহযোগীদের ‘আন-আমেরিকান এজিটেটরস’ হিসেবে ঘোষণা করলে তাঁদের অলিম্পিকে যোগদান করতে দেওয়া হয়।
আর এই বার্লিন অলিম্পিকেই আমেরিকা মোট এগারোটি পদক জেতে যার মধ্যে ছ'টি পদকই ছিল কৃষ্ণকায় অ্যাথলিটদের অর্জিত। জেসি ওয়েন্স এই অলিম্পিকেই মোট চারটি স্বর্ণপদক অর্জন করেন যথাক্রমে ১০০ মিটার দৌড়, লং জাম্প, ২০০ মিটার ও ৪০০ মিটার রিলে প্রতিযোগিতায়।
বিশ্বের ইতিহাসে দীর্ঘ ২৫ বছর পর্যন্ত এই রেকর্ড আর কোনো অ্যাথলিটের পক্ষেই ভাঙা সম্ভব হয়নি। ২৫ বছর পরে অ্যাথলিট আরভিন রবার্সন ১৯৬০ সালে অলিম্পিকে এই রেকর্ড ভেঙে দেন।
১৯৮৪ সালে প্রথম তাঁর জীবনকে কেন্দ্র করে একটি জীবনী-চিত্র নির্মিত হয় ‘জেসি ওয়েন্স’স স্টোরি’ নামে। তারপর ২০১৬ সালে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের কাহিনিচিত্র মুক্তি পায় ‘রেস’ নামে যেখানে জেসি ওয়েন্সের চরিত্রে অভিনয় করেন স্টিফেন জেমস। ১৯৭১ সালে সংযুক্ত আরব আমীরশাহী কিংবদন্তি অলিম্পিকজয়ী জেসি ওয়েন্সের স্মরণে একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে।জেসি ওয়েন্স নানা সময় বহু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ১৯৭৬ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি জেরাল্ড ফোর্ডের কাছে তিনি ‘প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অফ ফ্রিডম’ লাভ করেন। ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিমি কার্টার তাঁকে ‘লিভিং লেজেণ্ড’ সম্মানে ভূষিত করেন। শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ এই ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব জেসি ওয়েন্স ১৯৮০ সালের ৩১ মার্চ অ্যারিজোনায় ৬৬ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান।
