
কলকাতা, ১৪ এপ্রিল : কয়েকদিন আগে এক বড় ক্লাবের কর্মকর্তা বললেন, পয়লা বৈশাখে আমাদের ক্লাবে চলে আসুন। বার পুজো হবে তো? জিজ্ঞাসা করলাম। হবে না মানে? বেশ ঘটা করেই হবে, বললেন তিনি। বার পুজোর কথা ভাবতে ভাবতেই কয়েক বছর আগের ময়দানের ছবিটা মনে পড়ল, আজ থেকে ৩০-৪০ বছর আগে বড় ক্লাবে কর্মকর্তাদের কথা। পুরনো সেই দিনগুলো। প্রাচীন হয়ে যাওয়া কাহিনী গুলো। ভোর হতে না হতেই ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানের কর্মকর্তারা সবাই দলবেঁধে বেরিয়ে পড়তেন। কালীঘাট মন্দিরে গিয়ে পান্ডাদের নিয়ে দোকানে গিয়ে ডালা সাজাতেন। তারপর ডালা নিয়ে একেবারে ময়দানের দরবারে হাজির। ততক্ষণের পূজা দিতে ভক্তরা লাইন দিয়েছেন অনেকের হাতেই খেরোর খাতা, ঝুড়িতে সিদ্ধিদাতা গণেশ। ময়দানের বড় ক্লাবের জন্য অবশ্য অন্য ব্যবস্থা আগেভাগেই করা থাকত। সটান তারা মায়ের কাছে পৌঁছে নতুন বছরের সাফল্য প্রার্থনা করতেন।বলতেন মা, এবার যেন ফুটবলে সব ট্রফি আমরা জিততে পারি। কেউ কেউ আবার ট্রফি জয়ের জন্য শর্ত আরোপ করতো। মা অন্তত তিন-চারটে ট্রফি পেলেই জোড়া পাঁঠা দেব। পূজো দিয়ে সোজা মাঠে। মা কালীর সিঁদুর লাগানো হতো ক্লাবের প্রবেশ দ্বারে, বার পোস্টে। ফুল মালায় মালায় সাজানো 'বার' এর শুদ্ধিকরণ এভাবেই করা হতো।
সভ্য সমর্থকরা ভোর থেকেই ক্লাবের বাইরে ভিড় জমাতেন। বার পুজোর সময়টাতে বর্তমান ও প্রাক্তন খেলোয়াড়রা থাকতেন। এরপর বিকেল পর্যন্ত পুরো সময়টা লোকজনের আসা যাওয়া। ওই হুল্লোড় খাওয়া দাওয়া অবিরাম চলত। ওই সময়টা বার পুজোর পৃথক একটা সত্তা অনুভূত হওয়ার কারণ, এর আগে আগেই হয়ে যেত দলবদল। মোহনবাগানে যেবার গৌতম সরকার, শ্যাম থাপারা এলেন,সেই ৭৭ এর পহেলা বৈশাখ দারুন জমে গিয়েছিল। তখন কলকাতার ফুটবলে দলবদল নিয়ে সভ্য সমর্থকদের মধ্যে যে উন্মাদনা তা আজ আর নেই। দলবদলের সংজ্ঞা টাই এখন বদলে গেছে।
খাঁটি মোহনবাগানি হয়েও অজয় শ্রীমানী ছিলেন ইস্টবেঙ্গলের ফুটবল সচিব। সেই অজয় শ্রীমানি বার পুজো নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কিছুটা নস্টালজিক হয়ে বললেন,' এখন আর আমি ক্লাবে যাই না, যেতেও পারি না। কেউ ডাকেও না। ৬০- ৭০ সাল পর্যন্ত বার পুজো দেখেছি, দারুন উন্মাদনা ছিল। এখন সেসব মনে করলে বড় কষ্ট হয়। বর্তমানে তো শুনেছি কালীঘাটে পুজো দেয়া হয়। মাঠে পুরোহিতও আসে, জ্যোতিষও আসে। ওসব কথা থাক, সব ভুলে যেতে চাই।'
দিন বদলেছে, ১০ বছর আগে মোহনবাগান তাবুতে বাংলা নববর্ষের দিনে স্বশরীরে হাজির হয়েছিলাম। সভ্য সমর্থকদের ভিড় হইচই হুল্লোর সব ছিল। ড্রেসিং রুমের বাইরে লোহার পায়া ওয়ালা লম্বা বেঞ্চ গুলোতে অনেকেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে। ক্লাব সচিব অঞ্জন মিত্রের ঘরে অনেক চেনা অচেনা মুখের ভিড়। মুখ বাড়িয়ে শুভ নববর্ষ জানাতেই বললেন,'আরে!খেয়ে যাবে কিন্তু।' ভরপুর আন্তরিকতা। ঠিক তার ঘরের বাইরে প্রশস্ত হল ঘরের মাঝে বিশালাকাল লম্বা টেবিলের দু' দিকে তখন পাত পেড়ে চলেছে খাওয়া-দাওয়া।পাতে গরম লুচি, আলুর দম, কমলা ভোগ পড়ছে। তার মধ্যেই প্রাক্তন ফুটবলার কেউ কেউ আসছেন, গল্প করছেন আবার চলেও যাচ্ছেন পাশের ইস্টবেঙ্গলে।
একই রকম দৃশ্য ময়দানের বড়র পাশাপাশি মাঝারি ও ছোট ক্লাবে। মুসলিম অধ্যুষিত মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবেও বার পুজো হয় বেশ ধুমধামের সঙ্গেই। কামনা এটাই, বছরের বাকি দিনগুলোও যেন সবাই এভাবেই রঙিন হয়ে কাটাতে পারে। ময়দানে খিদিরপুর ক্লাবের পাশেই ছিল বিড়লা ক্লাব। ওখানেই একসময় গোলকিপার তৈরীর কারিগর পটা গুপ্ত এবং তার ভাই বুড়ো গুপ্তর আড্ডা ছিল। পটাদা সারা বছর হাটু পর্যন্ত ধুতি আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো সাদা হাফ শার্ট পরে ঘুরে বেড়াতেন। সকালে শুধু জামাটা খুলে গোলকিপারদের নানা টেকনিক শেখাতেন। পটাদার গোলকিপার ট্রেনিং সেন্টারেও নববর্ষের সকালে কালীঘাট মন্দিরের পূজো দেয়ার পর হইচই এর শেষ থাকতো না। বিড়লা তাবুর বাইরে রান্না হতো। পটাদা খুব ভালো রান্না করতে পারতেন। নিউমার্কেট থেকে মাছের কাঁটা কিনে আনা হতো। কাঁটা চচ্চড়ি মাংস আর ভাত। পুরুষ ও মহিলা ফুটবলাররা বড় আনন্দ করে খাওয়া দাওয়া করতেন। সেই পটা দাও আজ অতীত ইতিহাস। এখন সেদিনের অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে।হারিয়ে গেছে ময়দানি জৌলুস। ময়দানের বার পুজো আছে। তবু যেন অনেক কিছুই থেকেও নেই।
