
একবিংশ শতাব্দীতে শিশুর শৈশব আর চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। খেলার মাঠের পাশাপাশি এখন তাদের অবাধ বিচরণ স্মার্টফোনের পর্দায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্মে এবং নানা ধরনের ডিজিটাল দুনিয়ায়। প্রযুক্তি যেমন শিশুদের সামনে জ্ঞানের নতুন দরজা খুলে দিয়েছে, তেমনই তৈরি করেছে একাধিক অদৃশ্য বিপদ। সাইবার বুলিং, অনলাইন প্রতারণা, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, যৌন হয়রানি এবং অনুপযুক্ত কনটেন্টের মতো ঝুঁকি ক্রমশ উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এই বাস্তবতায় শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ নতুন করে সামনে এনেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে গিয়ে তাদের ডিজিটাল স্বাধীনতার পরিসর কতটা সংকুচিত করা উচিত?
সুপ্রিম কোর্টের সামনে উঠে আসা শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা সংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি দিক আসলে একটি বৃহত্তর ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে। একদিকে রয়েছে শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার সাংবিধানিক দায়িত্ব। অন্যদিকে রয়েছে তথ্য, শিক্ষা, মতপ্রকাশ এবং প্রযুক্তির সুফল পাওয়ার অধিকার। এই দুইয়ের মধ্যে সংঘাত তৈরি হলে কোনও একটি দিককে সম্পূর্ণ অগ্রাধিকার দিয়ে অন্যটিকে উপেক্ষা করা যায় না। কারণ শিশুদের নিরাপত্তা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনই তাদের স্বাভাবিক বিকাশের পথ বন্ধ করে দেওয়াও কোনও সুস্থ সমাজের লক্ষ্য হতে পারে না।
প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল, ডিজিটাল পরিসরে শিশুদের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা কোনওভাবেই অস্বীকার করা যায় না। ইন্টারনেটের জগতে একজন শিশু কখন, কার সঙ্গে এবং কী ধরনের যোগাযোগের মধ্যে প্রবেশ করছে, তা সবসময় অভিভাবকদের পক্ষে জানা সম্ভব হয় না। অনেক সময় পরিচিতির আড়ালে অপরিচিত ব্যক্তি শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। কখনও অনলাইন গেমের মাধ্যমে, কখনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যক্তিগত বার্তায়, আবার কখনও ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার করে শিশুদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা চলে। এই পরিস্থিতিতে শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি এবং ডিজিটাল পরিচয় ভয়াবহভাবে অপব্যবহৃত হতে পারে।
বিশেষ করে শিশুদের ছবি ও ব্যক্তিগত মুহূর্তের অননুমোদিত ব্যবহার অত্যন্ত গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। একবার কোনও ছবি বা তথ্য ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে তা সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারও নতুন ধরনের বিপদ তৈরি করছে। কোনও শিশুর আসল ছবি ব্যবহার করে ভুয়ো ছবি, ভিডিও কিংবা আপত্তিকর কনটেন্ট তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তাকে আর শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মানবাধিকার, ব্যক্তিগত মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
তবে এখানেই সুপ্রিম কোর্টের আলোচনার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিকটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শিশুদের সুরক্ষার নামে এমন কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত নয়, যা তাদের বৈধ অধিকার এবং স্বাভাবিক বিকাশের সুযোগকে অযথা বাধাগ্রস্ত করে। ডিজিটাল প্রযুক্তি আজ শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন শিক্ষার্থীও ইন্টারনেটের সাহায্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের জ্ঞানভাণ্ডারে পৌঁছতে পারে। অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল লাইব্রেরি, শিক্ষামূলক ভিডিও এবং বিভিন্ন গবেষণামূলক উপকরণ শিশুদের শেখার পরিসরকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই নিরাপত্তার যুক্তিতে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কিংবা নির্বিচারে নিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে শিক্ষার উপরেও।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন। শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অর্থ তাদের প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা নয়। বরং তাদের এমনভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম করে তোলা, যাতে তারা বিপদ চিনতে পারে, নিজের ব্যক্তিগত তথ্যের গুরুত্ব বুঝতে পারে এবং কোনও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে সাহায্য চাইতে পারে। ভয় দেখিয়ে কিংবা কঠোর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে সচেতনতা তৈরি করা যায় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের কারণে শিশুরা নিজেদের অনলাইন কার্যকলাপ গোপন করতে শুরু করে। ফলে বিপদের আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে স্মার্টফোন দেওয়ার পর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তাকে শেখাতে হবে, অনলাইনে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য ভাগ করে নেওয়া কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। কোনও অস্বস্তিকর বার্তা, ছবি কিংবা যোগাযোগের মুখোমুখি হলে তা গোপন না করে অভিভাবককে জানানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও বুঝতে হবে, সন্তানের প্রতিটি ডিজিটাল পদক্ষেপের উপর নজরদারি চালানো এবং তার ব্যক্তিগত পরিসর সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করে দেওয়া এক বিষয় নয়। নিরাপত্তা এবং বিশ্বাসের মধ্যে একটি সুস্থ সম্পর্ক তৈরি করাই এখানে সবচেয়ে জরুরি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিরও এই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। স্কুলের পাঠ্যক্রমে ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং সাইবার নিরাপত্তার বিষয়গুলি আরও গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। শুধু কম্পিউটার চালানো কিংবা ইন্টারনেট ব্যবহার শেখালেই হবে না, ডিজিটাল নাগরিক হিসেবে দায়িত্বশীল আচরণের শিক্ষাও দিতে হবে। অনলাইন বুলিং, ভুয়ো খবর, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং ডিজিটাল সম্মতির মতো বিষয় সম্পর্কে ছোটবেলা থেকেই সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। কারণ প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে, ডিজিটাল বিপদের ধরনও তত পরিবর্তিত হবে।
একই সঙ্গে প্রযুক্তি সংস্থাগুলির দায়বদ্ধতার প্রশ্নটিও সামনে আসা দরকার। শিশুদের ব্যবহার করা প্ল্যাটফর্মগুলিতে বয়স যাচাই, নিরাপদ ডিফল্ট সেটিংস, ক্ষতিকর কনটেন্ট শনাক্তকরণ এবং অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কোনও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শুধুমাত্র ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি কিংবা ব্যবসায়িক লাভের কথা ভেবে শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্নকে উপেক্ষা করতে পারে না। শিশুদের তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহার করার ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে অ্যালগরিদমের মাধ্যমে শিশুদের সামনে কী ধরনের কনটেন্ট তুলে ধরা হচ্ছে, তা নিয়ে আরও কঠোর মূল্যায়ন প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের দায়িত্বও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। আইন থাকা যথেষ্ট নয়, তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের বিরুদ্ধে অনলাইন অপরাধের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত, অপরাধীদের শনাক্তকরণ এবং ভুক্তভোগীদের মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের নামে শিশুদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কিংবা বৈধ ডিজিটাল অধিকার যেন ক্ষুণ্ণ না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে। সুরক্ষার নামে নির্বিচার নজরদারি কোনও গণতান্ত্রিক সমাজের কাম্য হতে পারে না।
সুপ্রিম কোর্টের এই গুরুত্বপূর্ণ আইনি আলোচনার বৃহত্তর তাৎপর্য এখানেই যে, শিশুদের ডিজিটাল জগৎকে শুধু বিপদের জায়গা হিসেবে দেখলে চলবে না, আবার প্রযুক্তির স্বাধীন ব্যবহারের নামে তাদের অসহায় অবস্থায় ছেড়েও দেওয়া যায় না। নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতা পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়। সঠিক নীতি, কার্যকর আইন এবং সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা সম্ভব।
আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নাগরিক। তাদের জন্য এমন একটি ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে তারা ভয় ছাড়াই শিখতে পারবে, নিজের প্রতিভা বিকশিত করতে পারবে এবং প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে। একই সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত মর্যাদা, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা থাকবে সুরক্ষিত। আদালতের পর্যবেক্ষণ থেকে তাই সবচেয়ে বড় যে বার্তাটি উঠে আসে, তা হল—শিশুদের রক্ষা করার নামে তাদের ভবিষ্যতের দরজা বন্ধ করা যাবে না। আবার স্বাধীনতার নামে তাদের নিরাপত্তাকেও অবহেলা করা চলবে না। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে এই ভারসাম্যই হতে পারে নিরাপদ ও মানবিক ডিজিটাল শৈশব গড়ে তোলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
