
ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দেশে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হল। ভারতের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘সেন্ট্রাল ড্রাগস স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন’ (CDSCO) দেশের প্রথম ডেঙ্গু টিকা ‘কিউডেঙ্গা’-কে অনুমোদন দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর টিকার অপেক্ষায় থাকা দেশের জন্য এই অনুমোদন নিঃসন্দেহে একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাপানের তৈরি এই টিকা ইতিমধ্যেই বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে অনুমোদন পেয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-র প্রি-কোয়ালিফিকেশনও অর্জন করেছে এই টিকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে কিউডেঙ্গার অনুমোদন একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও শুধুমাত্র টিকার উপর নির্ভর করে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য পেতে হলে টিকাকরণের পাশাপাশি মশা নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জানা গিয়েছে, কিউডেঙ্গা ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি প্রধান ধরন থেকেই সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ডেঙ্গুর কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি কমাতেও এই টিকা কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ডেঙ্গু ভারতের জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর বর্ষার সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে দেখা যায়। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে শুধুমাত্র বর্ষাকাল নয়, বছরের বিভিন্ন সময়েও বহু রাজ্যে ডেঙ্গুর সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়। দ্রুত নগরায়ন, অপরিকল্পিত বসতি বৃদ্ধি, নিকাশি ব্যবস্থার দুর্বলতা, জল জমে থাকার সমস্যা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ডেঙ্গুর বিস্তারে বড় ভূমিকা নিচ্ছে। এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করা না গেলে শুধুমাত্র চিকিৎসা বা টিকার মাধ্যমে এই রোগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তাই নতুন টিকা এলেও ডেঙ্গু মোকাবিলার পুরনো পদ্ধতিগুলিকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কিউডেঙ্গার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে সাধারণ মানুষের কাছে এর সহজলভ্যতা। ভারতের মতো দেশে যেখানে বহু মানুষ এখনও চিকিৎসার খরচের বড় অংশ নিজেরাই বহন করেন, সেখানে টিকার দাম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। যদি এই টিকার মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকে, তাহলে ডেঙ্গুর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দা, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার, শিশু এবং প্রবীণদের মধ্যে ডেঙ্গুর ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। তাই সরকারের কাছে দাবি উঠছে, এই টিকাকে জাতীয় টিকাকরণ কর্মসূচির আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হোক। প্রয়োজন হলে ভর্তুকির মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে এই টিকা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। স্বাস্থ্য মহলের একাংশের মতে, ভবিষ্যতে দেশে টিকার উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে এবং একাধিক সংস্থা এই ক্ষেত্রে যুক্ত হলে দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে আরও বেশি মানুষ ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে টিকা এলেও ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে যাচ্ছে মশার বিস্তার রোধ করা। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা জল পরিষ্কার রাখা, নিয়মিত লার্ভা ধ্বংসের ব্যবস্থা করা, নিকাশি ব্যবস্থার উন্নতি, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ফগিংয়ের মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কারণ এডিস মশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যাবে। একইসঙ্গে রোগ দ্রুত শনাক্ত করা এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করাও জরুরি। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে জটিলতা অনেকটাই কমানো সম্ভব। তাই স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে নজরদারি বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে রোগের উপসর্গ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করাও প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই শুধুমাত্র সরকারের দায়িত্ব নয়। স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কিউডেঙ্গার অনুমোদন ভারতের স্বাস্থ্যক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এটি ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন আশার সৃষ্টি করেছে। তবে একটি টিকা কখনও সম্পূর্ণ সমাধান হতে পারে না। টিকাকরণ, মশা নিয়ন্ত্রণ, উন্নত স্বাস্থ্য পরিকাঠামো এবং জনসচেতনতার সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমেই ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে। বিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার যৌথ উদ্যোগেই তৈরি হবে ডেঙ্গুমুক্ত ভবিষ্যতের পথ।
