গুয়াহাটি, ৩ এপ্রিল : 'অহমিয়া গহনা' নামে পরিচিত অসমের ঐতিহ্যবাহী অলঙ্কারকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করা হয়েছে মর্যাদাপূর্ণ ‘ভৌগোলিক নির্দেশক’ বা ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিক্যাশন’ (জিআই) ট্যাগ। এজন্য সংশ্লিষ্ট কারিগরদের আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্তবিশ্ব শর্মা। 'অহমিয়া গহনা' নামে খ্যাত অসমিয়া অলঙ্কারের গভীরে প্রোথিত সাংস্কৃতিক ও শৈল্পিক ঐতিহ্য। ‘ইনটেলেকচুয়াল প্ৰপাৰ্টি অফিস অব ইন্ডিয়া’-র ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিক্যাশন’ (জিআই) এই ঘোষণা করেছে। গতকাল বুধবার বিকালে জিআই কর্তৃপক্ষের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে এই রেজিস্ট্রেশনের বিবরণ প্রকাশ করা হয়েছে।
গতকাল রাতে নিজের এক্স হ্যান্ডলে রাজ্যের অনন্য তথা ঐতিহ্যবাহী অলঙ্কারের জিআই ট্যাগ স্বীকৃতিপ্রাপ্তির খবর দিয়েছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্তবিশ্ব শর্মা। তিনি এই অলঙ্কার সৃষ্টির পেছনে কারিগরদের আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন। এক্স-এ মুখ্যমন্ত্রী ড. শর্মা লিখেছেন, ‘কিছু সোনালী খবর শেয়ার করছি। অসমের অলঙ্কার - আমাদের ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ - তার নিজস্ব ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিক্যাশন’ (জিআই) ট্যাগ পেয়েছে।’ মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, ‘আমার স্পষ্ট মনে আছে, ২০১৮-১৯ বাজেটে আমরা আমাদের কারিগরদের সুরক্ষার জন্য জিআই ট্যাগ নিশ্চিত করার প্রস্তাব করেছিলাম। এই প্রচেষ্টা বাস্তবায়িত হয়েছে দেখে আজ আমি খুশি হয়েছি।’ প্রসঙ্গত, অহমিয়া গহনা হলো হস্তনির্মিত ঐতিহ্যবাহী অলঙ্কারের একটি অসাধারণ সংগ্রহ যা অসমের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সাংস্কৃতিক নিদর্শন এবং সাংগীতিক ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটায়। সোনালী ঔজ্জ্বল্যের জন্য পরিচিত এই গহনাগুলি লাল, কালো, সবুজ, নীল এবং সাদা রঙের রত্নপাথর দিয়ে সজ্জিত, পাশাপাশি জটিল এনামেলের কাজও করা থাকে।
অনন্য নকশার মোটিফগুলির মধ্যে রয়েছে পাখি। পাখা-লেজযুক্ত কবুতর, বাজপাখি (ঈগল), গৃহপালিত টিকটিকির ছাপ থাকে অসমিয়া অলঙ্কারে। নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র খচিত এই গহনায় থাকে ঐতিহ্যবাহী ঢোল এবং জোড়া শিঙা। সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে থাকে অসমিয়া জাপি, অর্ধচন্দ্র (জুন) এবং নৌকা (বেনা)। দক্ষ কারিগরদের হাতে তৈরি এই গহনাগুলি ‘সোনারিস’ নামে পরিচিত। অসমিয়া অলঙ্কার তৈরিতে ২২ ক্যারেট বা তার বেশি বিশুদ্ধ সোনা এবং ৯২.৫ শতাংশ বিশুদ্ধ রূপা ব্যবহার করেন কারিগররা। নকশাগুলিতে ব্যবহৃত সোনার ফয়েল বা পাতাগুলিও উচ্চ-বিশুদ্ধতার মান পূরণ করে। অন্যদিকে লাহ (লাক) প্রায়শই সোনার কাঠামোর মধ্যে ফিলার হিসাবে ব্যবহৃত হয়, যা টুকরোগুলিতে শক্তি এবং স্থায়িত্ব যোগ করে। অসমিয়া অলঙ্কারের ঐতিহ্য এক সহস্রাব্দেরও বেশি পুরনো, অর্থশাস্ত্রের মতো প্রাচীন গ্রন্থে অসমে সোনার ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। আহোম রাজত্বে সোনার অলঙ্করণ শিল্পের বিকাশ ঘটে। এতে অসমের নদনদী, বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্রের একটি প্রধান উপনদী সুবনসিরি থেকে প্রাকৃতিকভাবে সোনা সংগ্রহ করা হতো। ঐতিহাসিকভাবে সোনা ধোয়ার কাজে নিয়োজিত একটি জাতিগত সম্প্রদায় ‘সনোয়াল কছারি’রা গহনা তৈরির জন্য সোনার ধুলো সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
অসমিয়া সংস্কৃতি, প্রকৃতি এবং দৈনন্দিন জীবনের সাথে গভীর সংযোগ রয়েছে অসমিয়া গহনার সঙ্গে। প্রতিটি জিনিসের নামকরণ করা হয়েছে সেই সব বস্তুর নামে যা একে প্রতিনিধিত্ব করে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে শৈল্পিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণ করে। সবচেয়ে আইকনিক ডিজাইনের মধ্যে রয়েছে যথাক্ৰমে ‘জন বিড়ি’, মানে অর্ধচন্দ্রাকার দুল; ‘লোকাপারো’ মানে জোড়া পায়রা; ‘জেঠি পোতি’ মানে টিকটিকির লেজ দ্বারা অনুপ্রাণিত ভি-আকৃতির পদক; ‘ঢোল বিড়ি’ মানে ঢোল আকৃতির অলঙ্কার। জিআই ট্যাগ স্বীকৃতির মাধ্যমে, অসমিয়া অলঙ্কার অনুকরণের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা পাবে এবং রাজ্যের ইন্ডিজেনিয়াস কারুশিল্প ইন্ডাস্ট্রিকেও উৎসাহিত করবে। এই ঐতিহাসিক অর্জনে অসমিয়া অলঙ্করণের শতাব্দিপ্রাচীন ঐতিহ্য ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত থাকবে বলে বোদ্ধা এবং সংশ্লিষ্ট মহল মনে করে।