Fun Page

2 hours ago

রায়গঞ্জের শেষ ট্রেন

The Last Train from Raiganj
The Last Train from Raiganj

 

ঋষভ দত্ত ,ষষ্ঠ শ্রেণি,  স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুল  

বর্ষার রাত, মেঘ ডাকছে, মদনপুর গ্রামের কাঁচা রাস্তা কাদায় ভরে গেছে, টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে টিনের চালে। ঐ গ্রামে একটা ছেলে থাকত, নাম—কালাচাঁদ শেখ। মা-বাবা হীন, কাজ শুরু ছিল ওর সম্বল। কালাচাঁদের দাদুই ছিল ওর পৃথিবী, ছোটবেলায় মা-বাবা মারা যাওয়ার পর দাদুই ওকে মানুষ করেছিল। দাদুর পুরোনো জমিদার বাড়ির একপাশে থাকত কালাচাঁদ। দাদু রোজ সন্ধ্যায় হারিকেন জ্বালিয়ে রামায়ণ পড়ে শোনাতো, কালাচাঁদ পাশে বসে নোট নিত। 

একদিন মাঝরাতে কয়েকটা গুন্ডা এল, জমির দলিল চাইল। দাদু দেয়নি। লোহার রড দিয়ে মেরে ফেলল দাদুকে। মারা যাওয়ার আগে দাদু কালাচাঁদকে একটা মোটা চামড়ার ডায়েরি লুকিয়ে রেখে গেল। পরদিন গুন্ডারা বাড়ি তছনছ করে ডায়েরিটা পেয়ে গেল। কিন্তু ওরা বুঝল না ওটার দাম। রায়গঞ্জের তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চলে গেল। কে যেন কুড়িয়ে নিল। দাদু মারা যাওয়ার পর কালাচাঁদ তিনদিন ভাত মুখে তুলতে পারেনি। ছাদের রেলিং ধরে একা দাঁড়িয়ে থাকত আর আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবত, "দাদুর ডায়েরিটা কোথায় গেল?" ডায়েরিটা খুঁজতে ও সারা বাংলা ঘুরেছে কিন্তু পায়নি। 

২৫ বছর বয়সে কালাচাঁদের বিয়ে হলো। মেয়েটার নাম—মায়াবতী, চোখ দুটো মায়ার সাগর। মায়াবতী কালাচাঁদের পাগলামো বুঝত। বলত, "দাদু ঠিকই তোমায় পথ দেখাবে একদিন।" ২৮ বছর বয়সে ওদের ছেলে হলো, নাম রাখল—কালু। কালু দেখতে পুরো দাদুর মতো, কপালের বাঁ পাশে একটা কালো তিল। 

কালুর ১২ বছর বয়সে এক রাতে ঝড় উঠল, কালু বাবার কাছে বায়না ধরল—"দাদুর গল্প শুনবে।" কালাচাঁদ ওকে সব বলল— গুন্ডাদের কথা, ডায়েরির কথা, দাদুর হাসির কথা। গল্প বলা শেষ হতেই কালু কেঁদে ফেলল, বলল, "বাবা আমি দাদুকে দেখিনি। তুমি দাদুকে খুঁজে এনে দাও।" কালাচাঁদ ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরল। সময় গড়ায়, কালাচাঁদের বয়স এখন ৪০, আগস্ট মাস। রায়াগড় স্টেশনের আগে ডিননি জগতের খুব কাছে ডলফিন মিনার ছাড়িয়েছে সেখানে মাঝে মাঝে ঘন্টা পুরানো জমানী ঘুরে বেড়ায়, কেউ কেউ পড়ে, আবার ফেলেও দেয়। 

সেদিন ও ছিল বর্ষার রাত, কালাচাঁদ রায়গড় স্টেশনে এল ট্রেন ধরতে। কলকাতায় মিটিং আছে, স্টেশনে পৌঁছে কলকাটা টিকিট কাটল। ট্রেন ঢুকলো রাত ১টায়। কালাচাঁদ ট্রেনে উঠে বসলো জানালার পাশে, কিছুক্ষণ পরেই বিদ্যুৎ চলে গেল। ১০ মিনিট পর স্টেশনের মাইকে ঘোষণা হলো- ট্রেনের ইঞ্জিন খারাপ হয়েছে। ট্রেন ছাড়বে রাত ২:৩০ টায়। 

প্লাটফর্মে ঠান্ডা, বৃষ্টির ছিটে আসছে। কালাচাঁদ প্ল্যাটফর্মের কোণে রামু চাচার দোকানে এসে বসলো। রামু - যথেষ্ট বুড়ো, মাথায় টাক, গায়ে গেঞ্জি, রামু চা বানাতে বানাতে বলল, "কি বাবু, এতে রাতে কোথায় যাবেন?" কালাচাঁদ হাসল, "কলকাতা, একটা মিটিং আছে, তারপর দাদুকে একটু খুঁজবো।" রামু চায়ের কাপটা এগিয়ে দিয়ে বললো, "দাদা না, একসময় বলেছিল কি বাবু, দাদুরা সবসময় নাতিদের খোঁজেই থাকে।" "নাহলে, আমরাই তো দাদুকে অনেক বছর ধরে খুঁজছি।" 

চা শেষ করে কালাচাঁদ ট্রেনে ফিরল। বিদ্যুৎ এসে গেছে। জানালার পাশের সিটটায় বসতে গিয়ে পা লেগে গেল, নিচে ধুলো-মাখা একটা ডায়েরি পড়ে আছে। কালাচাঁদের বুকের ঢিপ ঢিপ টা শুরু করে উঠল। কাঁপা হাতে ডায়েরিটা তুলল। চামড়ার বাঁধাই, নীলটা পোড়া। প্রথম পাতা খুলতেই চোখ আটকে গেল। দাদুর হাতের লেখা, বাঁকা বাঁকা অক্ষর। লেখা আছে:- "আমার মৃত্যুর পর আমি রায়গঞ্জ স্টেশনের পাশে রামুর চা দোকানে কাজ করছি। গুন্ডারা আমায় বিষ দিয়ে মেরেছিল। আমার নাতিটা আজও আমায় খোঁজে।" 

কালাচাঁদের দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ওটা তো দাদুর ডায়েরি। "দাদু!" কালাচাঁদ ডাকতে ডাকতে ট্রেন থেকে নেমে প্ল্যাটফর্মের কোণের চা দোকানটার দিকে দৌঁড়াল। চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে তাকালো— "দাদু— দাদু।" 

রামু মুখ তুলে হাসল, "এসেছিস বাবু? চা খাবি?" কালাচাঁদ অবাক হয়ে রামুকে দেখতে থাকল, সেই হাসি, ছোটবেলার হাসি। কালাচাঁদ আর একটু এগোতেই ঝড়ের বাতাস বইলো, কালাচাঁদ চোখ বন্ধ করল। যখন চোখ খুলল যা দেখতে পেল— কালাচাঁদ তা ভাবতে পারেনি। 

কোথায় চা দোকান, সব ফাঁকা, বেঞ্চ, কাপ, হ্যারিকেন—কিছু নেই। শুধু ভেজা মাটি আর একটা ঠান্ডা স্রোত গা ছুঁয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ শব্দ শুনলাম, ট্রেন ছুটছে। কালাচাঁদ দৌড়ে লাইনের দিকে গেল, কামরাগুলো আবছা, কালটাচ ট্রেন উঠতে হাত বাড়াল। কিন্তু ট্রেনটা... ট্রেনটা কুয়াশার মতো মিশিয়ে গেল, আর কালাচাঁদ টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেল—রেল লাইনের মাঝখানে। দূর থেকে আলো আসছে। মাটি কাঁপছে, ট্রেন আসছে। ব্রেকের আওয়াজ নেই। কালাচাঁদ চোখ বন্ধ করল। দাদুর কথা মনে পড়ল, "ভয় পাস না বাবু—" 

ট্রেনটা কালাচাঁদের শরীরের উপর দিয়ে চলে গেল, বুকের ভেতর দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া বয়ে গেল, অথচ গায়ে লাগল না। কালাচাঁদ উঠে বসে পিছনে তাকাল। লাইনের ধারে দাঁড়িয়ে আছে দাদু, গায়ে সেই গেঞ্জি, হাতে চায়ের কাপ। "উঠে আয় বাবু। ট্রেন আসছে তো?" 

কালাচাঁদ দেখে হাতে ভাসা দাদুর দিকে, কপালে সেই টিপটা— "দাদু, তুমি বেঁচে আছো? তুমি তো মরে গেছ, আমাকে চা করে খাওয়ালে—!" বলতে না বলতে দাদু মিলিয়ে গেল। ঘন অন্ধকার সবটা। শুধু লাইনের পাশের ঘাসে লেগে রইল আধা কাপ চায়ের দাগ। একটা লোক লণ্ঠন হাতে যাচ্ছিল, কালাচাঁদ কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করল, "দাদা, এখান থেকে বেরোবার রাস্তা কোনটা?" 

লোকটা কালাচাঁদের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল, "তুমি এখনো আছো? পালাও বাবু। এখানে রোজ রাত ২-৩০ টায় একটা ট্রেন আসে। ওটা মরা মানুষের ট্রেন। যাত্রী থাকে না, নামায় না। পিছনের দিকে ওই যে লেটটা দিয়ে এক দৌড়ে পালাও, পিছনে তাকাবে না।" কালাচাঁদ আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায়নি। প্রাণপণে দৌড়ে গেট পেরিয়ে গেল। শুধু শুনতে পেল দাদুর গলা, "সাবধানে যাস বাবু।" 

সেদিন রাতে কালাচাঁদ বুঝেছিল—দাদু মরেনি, দাদুর আত্মা ওকে বাঁচাতে এসেছিল। কালাচাঁদ দাদুর ডায়েরিটা বুকের সাথে চেপে ধরে বাড়ি ফিরল। এর পর ৪২ বছর কেটে গেছে, কালাচাঁদ ৮২ বছর বয়সে ঘুমের মধ্যেই চলে গেল। যাওয়ার আগে কালুকে ডেকে বলেছিল, "দাদুর সাথে আমার দেখা হয়েছিল। চা খাইয়েছিল।" 

পরদিন কালু কালাচাঁদের বালিশের নিচে পেল সেই ডায়েরিটা। শেষ পাতায় নতুন কালিতে লেখা— "আমি আসব নাতি এসো, ৪০ বছর পর। চা খাওয়াব।" ও এখন বুঝেছে, দাদুরা মরে না, কখনো মরে না! লোকে বলে, আজও বেশ বর্ষার রাতে রায়গঞ্জ স্টেশনে ২-৩০ টার পর একটা ট্রেনের হুইসেল শোনা যায়। যাত্রী থাকে না, শুধু প্ল্যাটফর্মের কোণে একটা চায়ের দোকান জ্বলে ওঠে। আর এক বুড়ো ডাকে, "বাবু চা খাবে?" 

You might also like!

not found