
ধলাই, ১৪ আগস্ট : ২০২১ থেকে আরম্ভ করে ২০৪৭ পর্যন্ত মোট ছাব্বিশ বছরের সময়কালকে অমৃত কাল ধরে নিয়ে স্বাধীনতার উদযাপন চলছে দেশজুড়ে । এই উদযাপন শেষ হবে দেশ যখন স্বাধীনতার শতবর্ষে পৌঁছবে । এরকম উদযাপন ' মেরি মিট্টি মেরি দেশ ' শব্দমালার আওতায় এবারই প্রথম হচ্ছে এমন নয় । ২০২১ থেকে উদযাপন চলছে । অনেকেই এই উদযাপনকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমালোচনা করছেন । বলার চেষ্টা হচ্ছে ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনের দিকে লক্ষ্য রেখে দলের পক্ষে ভোট টানতে এই উদ্যোগ । আরও অনেকের বক্তব্য, ভারত সরকার নিজের ব্যর্থতা থেকে দেশবাসীর দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে এই কর্মসূচি হাতে নিয়েছে । আরও অভিযোগ উঠছে, হিন্দি ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল নেওয়ার । আর এই কর্মসূচির সমর্থনে যারা রয়েছেন তাদের বক্তব্য, বর্তমান প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা এবং দেশপ্রেমকে আরো তাৎপর্যপূর্ণ এবং সক্রিয় করে তুলতে এই উদযাপনের কোন বিকল্প নেই । ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচন যখন দোরগোড়ায় তখন এই যুক্তি পাল্টা যুক্তির বাস্তবতা যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে ।
ভারতবর্ষ বলতে আমরা আজকে যে ভূখন্ড বুঝি স্বাধীনতার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত কিন্তু এরকম ছিল না । ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট মধ্যরাতে স্বাধীনতার ঘোষনার আগে পর্যন্ত তা ছিল আরো বিশাল ও বিস্তৃত এক ভূখন্ড । ইংরেজ শাসকদের কৌশলে এবং মুসলিম লীগের একাংশ নেতার চাপে ও কিছু রাজনৈতিক নেতৃত্বের অপরিণামদর্শী আচরণে ভারতবর্ষ ভেঙে ভারতবর্ষ ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন দেশ তৈরি হয় । এখনকার বাংলাদেশ তখন ছিল পাকিস্তানের অধীন । নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান । পরে ১৯৭২ এ বাংলাদেশ নামে নতুন একটি দেশ তৈরি হয় । যে কয়েকটি দেশ প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি জানিয়েছিল তার মধ্যে ছিল ভারতবর্ষ । ১৯৪৭ এ ভারতবর্ষ যে স্বাধীনতা পেয়েছি তা ছিল খন্ডিত স্বাধীনতা । বিচ্ছেদ যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট সদ্য স্বাধীন দেশে তখন আরও এক সমস্যা তৈরি হয়েছিল । ভারতবর্ষের যেসব এলাকা পাকিস্তান বা পূর্ব পাকিস্তানে পড়েছিল সেখান থেকে দলে দলে মানুষ চলে আসেন এই দেশে । জীবন বাঁচাতে এবং নিজের দেশে জীবন কাটানোর টানে ভিটেমাটি, জমি, সম্পত্তি ছেড়ে মানুষ চলে আসেন ভারতে । কয়েকটি এলাকায় এই চলে আসাকে কেন্দ্র করে জাতি দাঙ্গায় প্রাণ হারান বহু নিরপরাধ মানুষ । এই রকম কঠিন ও অবর্ণনীয় পরিস্থিতকে কাটিয়ে দেশ যখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার চেষ্টা করছিল তখন এই গতিময়তা অনেকেরই সহ্য হয়নি । এর ফল হিসাবে ১৯৯৯ পর্যন্ত মোট ছয়বার বিদেশি আক্রমণ প্রতিরোধ করতে হয়েছে ভারতবর্ষকে । ১৯৪৭, ১৯৬৫, ১৯৭১ ও ১৯৯৯ তে পাকিস্তানের আক্রমণ এবং ১৯৬২ ও ১৯৬৭ তে চিনের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে হয় । দেশের স্বাধীনতা ও অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্বকে অখ্যত রাখে ভারতীয় সেনা । তবে ১৯৪৭ এর পাকিস্তান আক্রমণে কাশ্মীরের কিছু এলাকা দখল করে নেয় পাকিস্তান । এই এলাকায় ' পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর ' বা ' আজাদ কাশ্মীর ' হিসাবে পরিচিত ।
সরাসরি আক্রমণ বা প্রত্যক্ষ লড়াইয়ের মাধ্যমে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা বা অখণ্ডতা ভাঙতে পারেনি দুই দেশ । তবে এই পরিকল্পনা কেবল দুই দেশের ছিল এমন নয় । এর মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে ভারত বিরোধী আন্তর্জাতিক চক্র । এই চক্র দ্বিতীয় ধাপে দেশের বৈচিত্র্য ও বিভিন্নতা কাজে লাগিয়ে ভারতবাসীর ঐক্য ভেঙে দেওয়ার উদ্যোগ নেয় । ভাষা, ধর্ম, সম্প্রদায়, খাদ্যাভাস, পোশাক সহ বিভিন্ন বৈচিত্র্যের নামে একজন ভারতীয় থেকে আরেকজনকে আলাদা করার চক্রান্তের ফল হিসাবে দেশের নানা প্রান্তে মাথাচাড়া দেয় বিচ্ছিন্নতাবাদ । একই সঙ্গে উগ্রবাদ বা সাম্রাজ্যবাদ এক বিশাল সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। স্বাধীনতার অমৃতকালে পৌঁছে দেখা যাচ্ছ এসব সমস্যাকে বেশ নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে দেশ । তবে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও উগ্রবাদী শক্তিগুলো দেশের ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট করতে না পেরে মাদক ও জুয়ার ব্যাবহার করে যুব সমাজ ও পরবর্তী প্রজন্মকে বিপথে চালিত করার চেষ্টা নিয়েছে । এর বিষবাষ্প আন্তর্জাতিক সীমান্ত ঘেঁষা এলাকাগুলো থেকে গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে । আশার কথা কড়া হাতে এর মোকাবিলা চলছে ।
এই সমস্যা থেকে মানব সম্পদ বেরিয়ে আসার পাশাপাশি ক্রমাগত বাড়তে থাকা জনসংখ্যা এবং বাড়তে থাকা শিক্ষার হার আরো এক জটিলতা তৈরি করেছে । শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকার সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থানের জটিলতা তৈরি হতে থাকে । আজকের দিনে ভারতবর্ষ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যার কর্মপ্রার্থীদের দেশগুলোর মধ্যে একটি । এছাড়া স্বাধীনতার প্রায় দেড় দশক পর থেকেই উঠে আসে নারীশিক্ষা ও মহিলা ক্ষমতায়নের এবং মহিলাদের সামাজিক সম্মান ও আর্থিক সমৃদ্ধির বিষয়গুলো । হিসেব করলে দেখা যায় গোটা অমৃত কালের প্রথম কয়েক দশক সরকারি ক্ষেত্রে চাকুরীর মাধ্যমে কর্মসংস্থানের দাবি মেটানো গেছে । এর বড় কারণ ছিল দেশের সীমিত সংখ্যক এলাকায় বুনিয়াদি শিক্ষা থেকে উচ্চ ও কারিগরি শিক্ষার সুবিধা সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়া । কিন্তু যখন গোটা দেশজুড়ে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে, আরো বেশি সংখ্যায় যুবকেরা শিক্ষিত হচ্ছেন তখন থেকেই শুধু সরকারি ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের দাবি মেরানো সম্ভব হচ্ছিল না । নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে অনেকটা অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে । উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় মেয়েরা আজকে প্রশাসন ও সমাজের এবং অবশ্যই পরিবারের গুরুদায়িত্ব সামলাচ্ছেন সফলতার সঙ্গে । কিন্তু মহিলা ক্ষমতায়ন এবং আর্থ - সামাজিক সশক্তিকরনের আওতায় বাইরে রয়ে গেছেন এর চেয়েও বড় সংখ্যার মহিলারা । অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে না এমন নয় । কিন্তু তার গতি খুবই শ্লথ । এর সঙ্গে রয়েছে মানব সম্পদের জন্য যথাযথ সংখ্যায় উন্নত, রোজগার কেন্দ্রিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যা চাহিদার তুলনায় খুবই কম । অনিয়ন্ত্রিত জন্মহার বা পরিবার পরিকল্পনার অভাব এর অন্যতম কারন । আমদের দেশে বহুদিন জনপ্রিয় ধারণা ছিল ' বড় পরিবার সুখী পরিবার '। বর্তমানে পরিবারের আকার অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এলেও সম্পূর্ন নিয়ন্ত্রণে আসেনি । দেশবাসী মনে করছেন ও আন্তরিকভাবে চাইছেন অমৃত কালের উদযাপনে এই বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া আরম্ভ হোক । এই পদক্ষেপ করতে প্রত্যেক রাজনৈতিক দল, সংস্থা ও সংগঠন এবং প্রত্যেক ভারতবাসীকে নিজের কর্তব্য পালন করতে হবে ঐক্যবদ্ধভাবে । আর এরজন্য শপথ নেওয়ার বা লাখ শুরু করার অমৃত কলই সবচেয়ে উপযুক্ত সময় বলে মনে করছেন দেশের মানুষ ।
