
দুরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্কঃ শাসক দল থেকে বিরোধী সকলের কাছে এখন পাখির চোখ আসন্ন ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন। আসন্ন এই নির্বাচনে বিজেপি সরকারকে গদিচ্যুত করতে কংগ্রেসের ‘হাত’ ধরতে রাজি তৃণমূল। বিজেপির বিরোধী জোট প্রসঙ্গে সোমবার নবান্নে এমনটাই জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে পাশাপাশিই তিনি কংগ্রেসের জন্য শর্ত ও দিয়েছেন। এ ব্যাপারে মমতার শর্ত ছিল খুব সহজ— যে যেখানে শক্তিশালী, সে সেখানে একচ্ছত্র ভাবে লড়বে। অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গে জোট হলে তার চাবিকাঠি থাকবে মমতা তথা তৃণমূলের হাতে।
তবে এই শর্ত মেনে নেবে, এমন কোনও ইঙ্গিত এখনো মেলে নি। যদিও কংগ্রেস সম্পর্কে এমন মনোভাব প্রকাশের আগেই অন্যান্য বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ শুরু করে দিয়েছিলেন মমতা। যা থেকে এমনটাই ইঙ্গিত মিলছিল যে, তৃণমূল ‘নীতিবদল’ করতে চলেছে।উল্লেখ্য, মার্চের গোড়ায় সাগরদিঘি উপনির্বাচনে পরাজয়ের পরেই মমতা ঘোষণা করেছিলেন, আগামী লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল একলা লড়বে। তৃণমূলের জোট হবে মানুষের সঙ্গে।তবে চলতি মাসে কর্ণাটকের ভোটের ফলাফল সমস্ত হিসাব বদলে দিয়েছে।
তবে মমতার এই জোট নীতির মধ্যে সিপিএম অবশ্য এর মধ্যে ‘নীতিহীনতা’ই দেখছে। অধুনা বামেদের ‘বন্ধুদল’ কংগ্রেসেরও একই বক্তব্য। তাদের দাবি, অস্তিত্বের সঙ্কট বুঝেই তৃণমূল আবার জোটের কথা বলছে। আর রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল তথা কেন্দ্রের শাসক বিজেপির অবশ্য বক্তব্য, একলা লড়াইয়ের ক্ষমতা নেই বলেই তৃণমূল নেত্রী জোট গড়ার কথা বলছেন।
কিন্তু মমতার কেন এই মত বদল? তৃণমূলের একাংশের মতে, মমতা সব সময়েই জানতেন, কংগ্রেস অপ্রাসঙ্গিক না হলে তৃণমূল জাতীয় রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হবে না। ফলে তিনি বরাবরই কংগ্রেসের থেকে পৃথক অস্তিত্ব বজায় রাখতে উদ্যোগী হয়েছেন। গত লোকসভা ভোটে দেশে আশাতীত খারাপ ফল করেছিল কংগ্রেস। রাজ্যেও বিধানসভা ভোটে শূন্য হয়ে গিয়েছিল তারা। সকলেই ধরে নিয়েছিলেন, কংগ্রেসের আরও অধোগতি অনিবার্য। কিন্তু সেই পরিস্থিতিতেই রাহুল গান্ধী ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’ শুরু করেন।এই যাত্রায় বিরোধী দল গুলিকে শামিল হতে অনুরোধ করেছিলেন, যদিও তৃণমূল তাতে সাড়া দেয়নি।
কিন্তু ওই কর্মসূচির ফলে কংগ্রেস যে প্রাসঙ্গিক হয়েছে, তা তৃণমূলের একাংশ মেনে নিচ্ছেন। সেই প্রাসঙ্গিকতা আরও জোরদার হয়েছে রাহুলের লোকসভার সাংসদ পদ কেড়ে নেওয়ার পর। তত দিনে অবশ্য মমতার একলা চলার ঘোষণা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু রাহুলের সাংসদ পদ খারিজ হওয়ার পর মমতা রাহুলের পাশে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে কড়া আক্রমণ করেন।এর মধ্যে তৃণমূল তাদের ‘জাতীয় দল’-এর তকমা হারায়। তার পরেই আসে কর্নাটকের বিধানসভার ভোট। যেখানে অপ্রত্যাশিত ভাল ফল করে কংগ্রেস। ফলে জাতীয় রাজনীতিতে তাদের প্রাসঙ্গিকতা এবং গুরুত্ব আরও বাড়ে। বিজেপি তথা নরেন্দ্র মোদীর বিরোধী ‘মুখ’ হিসাবে খানিকটা বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরে পান রাহুল।
যদিও একে ‘নীতিবদল’ বলতে চাইছে না তৃণমূল। দলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক তথা মুখপাত্র কুণাল ঘোষের বক্তব্য, ‘‘আমাদের নেত্রীর ঘোষিত সিদ্ধান্তটাই তো হচ্ছে বিজেপির বিরোধী জোট। কিন্তু সাগরদিঘির ভোটে যে ভাবে সিপিএম, কংগ্রেস, বিজেপি জোটবদ্ধ হয়েছিল, তাতে তিনি রাজ্যের ক্ষেত্রে এটা বোঝাতে গিয়েছিলেন যে, উনি একলাই যথেষ্ট। এই রাজ্যে আমাদের কারও সঙ্গে জোটের দরকার নেই। মমতা’দি এটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জাতীয় ক্ষেত্রে তো ওঁর ঘোষিত নীতিই হল জোট বেঁধে লড়াই।’’
যদিও এর বিরোধীতা করে বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বলেন ‘‘মুখ্যমন্ত্রী বুঝে গিয়েছেন আগামী লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যে কী দশা হতে চলেছে। দলের নবজোয়ার যাত্রা তো আসলে সমীক্ষা। সেই রিপোর্ট পেয়ে গিয়েছেন তিনি। মুখ বাঁচাতে এর-ওর হাত ধরতে চাইছেন। যেটা হতে পারে সেটা চোরেদের জোট। জাতীয় দলের তকমা হারানো তৃণমূল চাইছে এ দিক-ও দিক গিয়ে যদি ভিক্ষার ঝুলি কিছুটা ভরা যায়। কিন্তু সে আশা বৃথা।’’
এ প্রসঙ্গে সিপিএম এবং কংগ্রেসের বক্তব্যে মিল রয়েছে। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বক্তব্য, ‘‘তালের ঠিক নেই। তৃণমূলের রাজনীতির ছন্দপতন হয়েছে। যদি লক্ষ্য ঠিক না থাকে, যদি আদর্শ বা নীতি না থাকে, তবেই বলতে হয় আমি কোন পথে যে চলি, কোন কথা যে বলি! প্রতিদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখেশুনে সেটাই মনে হয়।’’ কংগ্রেস নেতা আব্দুল মান্নানের বক্তব্য, ‘‘সাগরদিঘি দিয়ে শুরু হয়েছে। এ বার সর্বত্র মানুষ তৃণমূলকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবে। আতঙ্কে ভুগছেন মমতা। অতীতে কংগ্রেসকে হটাতে বিজেপির হাত ধরেছিলেন। এখন উল্টোটা করতে চাইছেন।’’
তবে মমতা যে জোট পরিকল্পনা বহু পূর্ব থেকেই করছিলেন তা স্পষ্ট ছিল। উল্লেখ্য,কিছু দিন আগে তিনি নিজে যান ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়কের বাড়িতে। যদিও নবীন বলেন, ‘‘এটা সৌজন্য সাক্ষাৎ। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী দেখা করতে চেয়েছিলেন। রাজনীতি নিয়ে কোনও কথা হয়নি।’’ আর মমতা বলেন, ‘‘৩৬৫ দিনই তো রাজনীতি থাকে! নবীনের সঙ্গে আমাদের ভাল সম্পর্ক। ওরা আগামী দিনে ভাল ফল করবে।’’কলকাতাতেও একের পর এক বৈঠক শুরু হয়েছিল। নবান্নে এসেছিলেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার এবং উপমুখ্যমন্ত্রী তথা লালুপ্রসাদের পুত্র তেজস্বী যাদব। সেই বৈঠকের পরে দু’জনকে পাশে বসিয়ে মমতা বলেছিলেন, ‘‘আমি প্রস্তাব দিয়েছি, বিরোধীদের বৈঠকটা বিহারে হলে ভাল হয়। আগে বার্তা দিতে হবে, আমরা সকলে একসঙ্গে রয়েছি। আমরা চাই বিজেপি যাতে শূন্য হয়ে যায়।’’উল্লেখ্য, ১৮ মার্চ অখিলেশের সঙ্গে বৈঠক করেন মমতা, সেই বৈঠকের সময়ে অবশ্য মমতার নীতি ছিল, বিজেপি এবং কংগ্রেসের সঙ্গে সমদূরত্ব রেখে বাকি দলকে নিয়ে জোট গড়া। তার নামও ঠিক হয়নি তখন। মমতা-অখিলেশ বৈঠকের দিল তৃণমূলের প্রবীণ সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘‘আমরা এখনই থার্ড ফ্রন্ট গঠনের কথা বলছি না। আমরা শুধু এটাই বলছি, আগে নির্বাচন হতে দিন। যে রাজ্যে যে দলের ক্ষমতা বেশি, সেখানে তারাই বিজেপির বিরুদ্ধে লড়ুক। এই মুহূর্তে এটাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দর্শন।’’
এত দিন বিরোধী জোটের প্রশ্নে কংগ্রেসকে এড়িয়েই গিয়েছেন মমতা, তবে এই মুহুর্তে বরফ গলতে শুরু করাতে প্রশ্ন আগামী ২৭ তারিখ নীতি আয়োগের বৈঠকে দিল্লি গিয়ে কি মমতা কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করবেন বিরোধী ঐক্য নিয়ে? তৃণমূলের একাংশের দাবি, কর্নাটকের ভোটের পরে যে আবহ তৈরি হয়েছে, তাতে তেমন সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।সেক্ষেত্রে কংগ্রেস নেতৃত্বের আগ্রহ কতটা সেটাও দেখার।
