
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: “পাল্টানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার!”
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের রণকৌশল হিসেবে বিজেপি এবার সরাসরি ‘পরিবর্তন’-এর ডাক দিল। গত শনিবার (১৭ জানুয়ারি) মালদহের সভা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রথমবার এই নতুন স্লোগানটি তুলে ধরেন— “পাল্টানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার!” রবিবার সিঙ্গুরের ঐতিহাসিক সভাতেও এই একই স্লোগান শোনা যায় তাঁর মুখে। এই স্লোগানকে ঘিরেই এখন বঙ্গ রাজনীতিতে চলছে জোরদার চর্চা।
রবিবার হুগলির সিঙ্গুরের সভাতেও সেই স্লোগান শোনা গিয়েছিল মোদীর মুখে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শেষ হওয়ার আগেই নদিয়ার রোড শো থেকে পাল্টা জবাব দিয়ে দিলেন তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২১ সালের নির্বাচনী প্রচারের ঢঙেই আত্মবিশ্বাসী সুরে দাবি করলেন, এ বারও বাংলা থাকবে তার ‘মেয়ের কাছেই’।
রবিবার নদিয়ার চাপড়ায় রোড শো ছিল তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেকের। একই দিনে প্রধানমন্ত্রীর সভাও ছিল সিঙ্গুরে। মোদীর ভাষণ শুরু হওয়ার কিছু ক্ষণের মধ্যেই ভাষণ দিতে শুরু করেন অভিষেক। সেখানেই নতুন স্লোগান নিয়ে মোদীকে কটাক্ষ করেন তিনি। কটাক্ষ করে বলেন, ‘‘কাল মোদীজি বলেছেন, পাল্টানো দরকার। বাংলার মানুষকে আপনারা শাস্তি দিয়ে পাল্টাতে চান। আমি একমত আপনার সঙ্গে, পাল্টানো দরকার। কিন্তু বাংলার মানুষ পাল্টাবে না, পাল্টাবেন আপনারা। পাল্টাবে দিল্লি-গুজরাতের বহিরাগতেরা। যারা আগে জয় শ্রীরাম বলে সভা শুরু করত, এখন তারাই জয় মা কালী আর জয় মা দুর্গা বলে সভা শুরু করে! বাংলার মানুষ আপনাদের কাছে মাথা নত করবে না।’’

শনিবার মালদহের সভায় মোদী বলেছিলেন, ‘‘এখন বাংলায় সুশাসনের সময় এসেছে। বিজেপি বাংলায় সুশাসন এনেই ছাড়বে! আপনারা সবাই মিলে আমার সঙ্গে একটা সঙ্কল্প গ্রহণ করুন। আমি বলব, পাল্টানো দরকার। আপনারা বলবেন, চাই বিজেপি সরকার।’’ এ কথা বলে পর পর পাঁচ বার স্লোগান তোলেন প্রধানমন্ত্রী। জনতা তার প্রত্যুত্তর দেয়। রাত পোহানোর আগে মোদীর বাঁধা স্লোগান নিয়ে নতুন গানও প্রকাশ করে ফেলে বিজেপি। রবিবার সকাল থেকে সিঙ্গুরের সভাস্থলে সেই গানই বাজছিল একটানা। সিঙ্গুরের সভায় ভাষণ দেওয়ার সময়েও মোদী নতুন স্লোগানের পুনরাবৃত্তি করতে ভোলেননি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শেষের আগেই জবাব দিয়ে দেন অভিষেক।
পাশাপাশি, নদিয়ার রোড শো থেকে বিজেপির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেও একাধিক অভিযোগ তুলেছেন অভিষেক। তাঁর দাবি, তেহট্টের এক বিজেপি এক নেত্রী নর্দমা তৈরির নামে দলের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অন্য এক গ্রাম পঞ্চায়েতে নয়ছয় করেছেন ১০০ দিনের কাজের টাকা। গত লোকসভা ভোটে কৃষ্ণনগর কেন্দ্রে তৃণমূলের মহুয়া মৈত্রের কাছে ৫৭ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত বিজেপির প্রার্থী অমৃতা রায় তাঁর দলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তুলেছিলেন, তা-ও স্মরণ করিয়ে দেন অভিষেক। অভিযোগ করেন, কৃষ্ণনগর শহরে একটি বাড়ি ‘জবরদখল’ করে বিজেপির পার্টি অফিস চলছে। সেই সূত্রেই অভিষেকের প্রশ্ন, ‘‘যে দলের পার্টি অফিসই অবৈধ, সেই দলকে আমাদের নাগরিকত্বের বৈধতার পরিচয় দিতে হবে?’’
অভিষেক জানান, কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার টাকা না দিলেও আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সরাসরি ২০ লক্ষ মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে বাংলার বাড়ি প্রকল্পের প্রথম কিস্তির টাকা পাঠিয়ে দেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। শেষে মোদীর স্লোগানের পাল্টা হিসাবে তৃণমূল সেনাপতি বলেন, ‘‘আগের বার বলেছিলাম, বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়। এ বার বলছি, মেয়ের কাছেই থাকবে বাংলা, কর তুই পারিস যতই হামলা, পারলে এবার মোদীবাবু দিল্লি সামলা!’’

পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম-২ ব্লকের আমদাবাদ সমবায় সমিতির ভোটে বিজেপি-কে সবক’টি আসনে হারিয়ে ১২-০ ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন শাসকদলের প্রার্থীরা। রাজ্য বিজেপি-র অন্যতম মুখ তথা বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নন্দীগ্রামে তৃণমূলের এই জয়কে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। আর তৃণমূল এই জয়ের কৃতিত্ব দিচ্ছে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। গত বৃহস্পতিবার তিনি নন্দীগ্রামে গিয়ে সেবাশ্রয় প্রকল্পের সূচনা করে আসাতেই এমন ফল হয়েছে বলেই দাবি পূর্ব মেদিনীপুর জেলা তৃণমূল নেতৃত্বের।
রবিবার ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পর ফলপ্রকাশে দেখা যায়, সমবায় বোর্ডের সমস্ত পদেই তৃণমূলের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, মানুষের উন্নয়নমূলক কাজ এবং সাম্প্রতিক সামাজিক পরিষেবা কর্মসূচির প্রভাবেই এই ফল সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের উদ্যোগে শুরু হওয়া ‘সেবাশ্রয়’ কর্মসূচিকে এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হিসাবে তুলে ধরছেন জেলা নেতারা। তাঁদের বক্তব্য, সেবাশ্রয়ের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ওষুধ বিতরণ, প্রশাসনিক পরিষেবা এবং বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা গ্রামস্তরে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। তার ফলেই সাধারণ মানুষের মধ্যে শাসকদলের প্রতি আস্থা বেড়েছে। নন্দীগ্রামের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ গড়ে তুলতে এই কর্মসূচির বড় ভূমিকা রয়েছে বলেই দাবি তৃণমূলের। তাই সেই প্রকল্প মারফত আগামী বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধী দলনেতাকে কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারবেন তাঁরা।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদের সভাধিপতি তথা পটাশপুরের তৃণমূল বিধায়ক উত্তম বারিক বলেন, “নন্দীগ্রামের সমবায় নির্বাচনের ফল বলে দিচ্ছে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেবাশ্রয় প্রকল্প ম্যাজিক দেখাতে শুরু করেছে। আমরা আশা করব, এই সমবায় নির্বাচনের ফলের মতোই আগামী বিধানসভা নির্বাচনেও নন্দীগ্রাম আসন জিতে তাঁকে ও দলনেত্রীকে উপহার দিতে পারব।’’ জবাবে বিজেপি-র তমলুক সাংগঠনিক জেলার সহ-সভাপতি প্রলয় পাল বলেন, “নন্দীগ্রাম বিধানসভায় গত এক বছরে প্রায় ৭০টি সমবায়ের নির্বাচন হয়েছে। তার ৯৫ শতাংশ আসনেই আমরা জয় পেয়েছি। এটাও ঠিক যে তৃণমূল ২-৩টি সমবায় নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। সেই পর্যায়েই আমদাবাদ সমবায় সমিতির ভোটে ওরা জিতেছে।” তিনি আরও বলেন, “সমবায় নির্বাচনের জয় যদি অভিষেকের সেবাশ্রয় প্রকল্পের ফল হয়ে থাকে, তা হলে আমরা বলব আগামী বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দুবাবুর বিরুদ্ধে অভিষেক বা তাঁদের মুখ্যমন্ত্রী যেন প্রার্থী হন। ২০২১ সালের মতোই আবার নন্দীগ্রামের মানুষ তাঁদের যোগ্য জবাব দিয়ে দেবেন।’’
