
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: সমগ্র ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মহাদেশটির একাধিক দেশে তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের গণ্ডি পেরিয়েছে। লাগাতার এই দাবদাহের জেরে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং তৈরি হয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) এই প্রবল তাপপ্রবাহকে ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে উল্লেখ করে সতর্ক করেছে। সংস্থার দাবি, ইউরোপের প্রায় ১৫ কোটি মানুষ বর্তমানে এই বিপজ্জনক আবহাওয়ার প্রভাবের মুখে পড়েছেন।
ইতিমধ্যে এই তীব্র দাবদাহে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ফরাসি জনস্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিকতম রিপোর্ট অনুযায়ী, ফ্রান্সে নতুন করে আরও ১,০০০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর ফলে ২১শে জুন থেকে শুরু হওয়া এই তাপপ্রবাহে ইউরোপজুড়ে মোট মৃতের সংখ্যা ১,৩০০ ছাড়িয়ে গেছে। স্বাস্থ্য সংস্থাগুলি সতর্ক করেছে যে, নার্সিং হোম এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মৃত্যুর সম্পূর্ণ তথ্য এখনও হাতে না আসায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবের কারণেই এই নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান এবিষয়ে একটি জরুরি সতর্কবার্তা জারি করে জানিয়েছেন, ইউরোপ হল পৃথিবীর দ্রুততম উষ্ণায়নশীল মহাদেশ, যা বিশ্বের বাকি অংশের তুলনায় দ্বিগুণ দ্রুত গতিতে উত্তপ্ত হচ্ছে।

পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, বহু দেশে স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং অতিরিক্ত লোডের কারণে পাওয়ার গ্রিডগুলিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে এই চরম তাপমাত্রা বজায় থাকার কারণে মানুষের হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস এবং মস্তিষ্কের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে প্রবীণ এবং আগে থেকেই কোনো না কোনো শারীরিক অসুস্থতায় ভোগা মানুষদের ক্ষেত্রে এই আবহাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাস্তবিক অর্থে, ইউরোপের দেশগুলি এই চরম গ্রীষ্ম ও তাপপ্রবাহ মোকাবিলার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। এখানকার অধিকাংশ পুরোনো ঘরবাড়ি এবং স্কুলগুলিতে কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (AC) নেই। তার ওপর, গ্রীষ্মের এই মরসুমে রাতেও তাপমাত্রা না কমায় মানুষ কোনোভাবেই গরম থেকে স্বস্তি পাচ্ছে না। শুধুমাত্র ফ্রান্সেই নয়, জার্মানি, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র এবং অস্ট্রিয়াতেও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে পৌঁছে পূর্বের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। তীব্র গরমে রেললাইন ও অবকাঠামো রক্ষার্থে জার্মানিতে ট্রেন পরিষেবা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ট্রাম চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।
এই চরম খরা ও উত্তাপের প্রভাব পড়েছে ইউরোপের শিল্প ও কৃষিক্ষেত্রেও। নদীর জল অতিরিক্ত উষ্ণ হয়ে যাওয়ার কারণে হাঙ্গেরির বিখ্যাত 'পাকস পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র' তার উৎপাদন ক্ষমতা কমাতে বাধ্য হয়েছে। অন্যদিকে, ইতালির প্রধান নদী 'পো'-এর জলস্তর এতটাই নিচে নেমে গেছে যে, সমুদ্রের নোনা জল নদীর বুক চিরে প্রায় ১৮ কিলোমিটার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে, যা স্থানীয় কৃষিকাজকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এর পাশাপাশি, তীব্র গরমের হাত থেকে বাঁচতে নদী ও হ্রদে স্নান করতে নেমে অসাবধানতাবশত ডুবে মারা গেছেন বহু মানুষ, যা এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে আরও বেশি বেদনাদায়ক করে তুলেছে।

