
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: সনাতন ধর্মে যে ক’টি তিথি আধ্যাত্মিক চেতনার শিখর বলে মানা হয়, তার মধ্যে মহাশিবরাত্রি অন্যতম। এটি কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং ভক্তি, ত্যাগ এবং অন্তরের অন্ধকার দূর করে আত্মশুদ্ধি লাভের এক পরম লগ্ন। প্রতি বছর মাঘ-ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশ তিথিতে ভক্তরা দেবাদিদেব মহাদেবের আরাধনায় মগ্ন হন।
২০২৬ সালে মহাশিবরাত্রির তারিখ নিয়ে ভক্তদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। কারণ এই বছরে মহামাসের কৃষ্ণ চতুর্দশ তিথি দুই দিন বিস্তৃত। অনেকেরই মনে প্রশ্ন, তাহলে মহাশিবরাত্রি কি ১৪ ফেব্রুয়ারি, না ১৫ ফেব্রুয়ারি পালিত হবে। পঞ্জিকা অনুযায়ী এই বিভ্রান্তির নিরসন করা জরুরি, কারণ মহাশিবরাত্রির মূল গুরুত্ব নিশীথ বা রাত্রিকালের পূজার সঙ্গে যুক্ত।
দৃক পঞ্চাঙ্গ অনুসারে
দৃক পঞ্চাঙ্গ অনুসারে, মহামাসের কৃষ্ণ চতুর্দশ তিথি শুরু হচ্ছে ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বিকেল ৫টা ০৪ মিনিটে এবং শেষ হচ্ছে ১৬ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টা ৩৪ মিনিটে। যেহেতু নিশীথ কাল মধ্যরাত্রির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সেই সময় চতুর্দশ তিথি থাকবে, তাই ২০২৬ সালে মহাশিবরাত্রি পালিত হবে ১৫ ফেব্রুয়ারি রবিবার। এই রাতের শিবপূজা করাই সবচেয়ে ফলপ্রসূ বলে শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে।
মহাশিবরাত্রি ২০২৬ সালের শুভ মুহূর্তগুলিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাহ্ম মুহূর্ত ভোর ৫টা ২১ মিনিট থেকে ৬টা ১২ মিনিট পর্যন্ত থাকবে, যা ধ্যান ও জপের জন্য বিশেষ উপযোগী। দুপুরে অভিজিৎ মুহূর্ত থাকবে ১২টা ১৫ মিনিট থেকে ১২টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত, এই সময় শিবলিঙ্গে জল ও বেলপাতা অর্পণ করা যেতে পারে। তবে মহাশিবরাত্রির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হল নিশীথ পূজা। ২০২৬ সালে নিশীথ পূজার সময় গভীর রাত ১২টা ১১ মিনিট থেকে রাত ১টা ০২ মিনিট পর্যন্ত থাকবে।
শাস্ত্র মতে, মহাশিবরাত্রির রাতে চর প্রহরে শিবপূজা করলে বিশেষ ফল লাভ হয়। প্রথম প্রহর শুরু হবে ১৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা ১১ মিনিট থেকে রাত ৯টা ২৩ মিনিট পর্যন্ত। দ্বিতীয় প্রহর থাকবে রাত ৯টা ২৩ মিনিট থেকে গভীর রাত ২টা ৩৬ মিনিট পর্যন্ত। তৃতীয় প্রহর শুরু হবে রাত ২টা ৩৬ মিনিট থেকে ভোর ৩টা ৪৭ মিনিট পর্যন্ত এবং চতুর্থ প্রহর চলবে ১৬ ফেব্রুয়ারি ভোর ৩টা ৪৭ মিনিট থেকে সকাল ৬টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত। প্রত্যেক প্রহরে শিবলিঙ্গে জল, দুধ বা পঞ্চামৃত দিয়ে অভিষেক করলে ভগবান শিব প্রসন্ন হন বলে বিশ্বাস।মহাশিবরাত্রির উপবাস ভাঙার সময়ও শাস্ত্রসম্মতভাবে নির্ধারিত। ২০২৬ সালে উপবাস ভাঙার শুভ সময় হবে ১৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৩টা ২৪ মিনিট পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে ফলাহার বা সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ করাই শ্রেয়।
এই বছরে মহাশিবরাত্রিতে বিশেষ কিছু যোগও তৈরি হচ্ছে। পঞ্জিকা অনুসারে, সর্বার্থ সিদ্ধি যোগ এই দিনে থাকবে, যা সকাল ৭টা ০৪ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৭টা ৪৮ মিনিট পর্যন্ত থাকবে। এই যোগে শিবপূজা করলে বহুদিনের ইচ্ছা পূরণের সম্ভাবনা থাকে। পাশাপাশি ব্যতিপাত যোগও থাকবে ১৬ ফেব্রুয়ারি ভোর ২টা ৪৭ মিনিট পর্যন্ত এবং শ্রবণ নক্ষত্র উত্তরাষাঢ়ার সঙ্গে যুক্ত থাকবে, যা এই তিথির আধ্যাত্মিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
মহাশিবরাত্রির পূজায় ব্যবহৃত সামগ্রীও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শিবলিঙ্গে বেলপাতা, ভাঙ, ধুতুরা, ভস্ম এবং সাদা ফুল অর্পণ করা হয়। অভিষেকের জন্য গঙ্গাজল, দুধ, দই, মধু, ঘি এবং পঞ্চামৃত ব্যবহার করা শুভ বলে মনে করা হয়। ধূপ, দীপ, কর্পূর, চন্দন এবং সুগন্ধি দিয়ে শিবপূজা সম্পূর্ণ হয়। অনেক ভক্ত শিবকে বস্ত্র এবং অলংকার অর্পণ করেও পূজা করেন।=
সব মিলিয়ে বলা যায়, মহাশিবরাত্রির তারিখ (Mahashivratri 2026 Date) অনুযায়ী ১৫ ফেব্রুয়ারি এই পবিত্র ব্রত পালনের জন্য সর্বাধিক শুভ। সঠিক তিথি, নিশীথ পূজার সময় মানলে এবং শাস্ত্রসম্মত নিয়ম মেনে ভগবান শিবের আরাধনা করলে জীবনে শান্তি, শক্তি এবং কল্যাণ লাভ হয়।
