
দুরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্কঃ দ্যা ইন্টারন্যাশনাল মিশন ফর সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড চ্যারিটি(ইমসঃ) এর উদ্যোগে ২১শে ডিসেম্বর ২০২৪ উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের অন্তর্গত কানোজ জেলার অধীন নীরা, সরাইমীরা এবং রাউলী গ্রামে ৪৩ তম বর্ষ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে অখন্ড পরিকাঠামো পরিচালনায় শিশু শ্রমিকদের সার্বভৌমিক বিশেষ প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষা, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং অধিকার, শিশু শ্রমিকদের দারিদ্র্য নিরসন, আর্থিক নিরাপত্তার সংস্থান, শিশু শ্রমিকদের কর্মস্থলে দৈহিক ও যৌন নিপীড়ন এবং শোষণ প্রতিরোধ, শিশু শ্রমিকদের ক্রীড়া ও নৃত্য পরিষেবা, শিশুর পরিবেশ, স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিশু শ্রম নিয়ন্ত্রণ এবং পুষ্টি ও প্রতিষেধক সহায়তা কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
কর্মশালায় ৬৯২ জন শিশু শ্রমিক অংশগ্রহণ করে। ২২শে ডিসেম্বর ২০২৩ ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্গত গোমতী জেলার অধীন উদয়পুর, সোনামুড়া এবং জামতলা গ্রামে শিশু শ্রমিকদের বিদ্যালয় শিক্ষা, প্রবহমান শিক্ষা, আর্থিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং শিশু শ্রমিকদের শান্তি, সম্মান, সহিষ্ণুতা, স্বাধীনতা, সাম্য ও ঐক্যের বাতাবরণে এই বিশ্বের প্রতিটি শিশু শ্রমিক যাতে নিজেদের সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে তা নিশ্চিত করাই হল এই কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য। ২৩শে ডিসেম্বর ২০২৩ মহারাষ্ট্র রাজ্যের অন্তর্গত শোলাপুর জেলার অধীন শিবাজীনগর, পিলিব এবং ভালসং গ্রামের ৫৯৭ জন শিশু শ্রমিকদের সর্বাঙ্গীণ প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষা, শিশু নিগ্রহ, শিশু শ্রমিকদের ভিনরাজ্যে পাচার প্রতিরোধ, শিশুদের নৃত্য ক্রিয়া পরিষেবা কর্মশালার আয়োজন করা হয়। ২৪শে ডিসেম্বর ২০২৩ কর্ণাটক রাজ্যের অন্তর্গত বেলগাম জেলার অধীন তিলকাদি, নেহেরুনগর এবং ভোতারামাটি গ্রামে গৃহস্থের কাজে নিয়োজিত কর্মশালায় ৭৮৪ জন শিশু শ্রমিকদের যৌন নিগ্রহ প্রতিরোধ, শিশু শ্রমিকদের পুষ্টি, খাদ্য সুনিশ্চিতকরণ, শিশু শ্রমিকদের বৃত্তিমূলক শিক্ষা কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
২৫শে ডিসেম্বর ২০২৩ পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যের অন্তর্গত মালদা জেলার অধীন রাতুয়া, ভূতনী এবং বৈষ্ণবনগর বিদ্যাসাগর বালিকা বিদ্যালয়ে কর্মশালায় ৪৯৯ জন শিশু শ্রমিকদের প্রবহমান শিক্ষা, গার্হস্থ্য নির্যাতন, শিশুদের উৎপীড়ন প্রতিরোধ, শিশু শ্রমিকদের পুষ্টি, স্বাস্থ্য পরিষেবা, টীকাকরণ এবং স্বনির্ভর প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। কর্মশালায় ৮৩৪ জন শিশু শ্রমিক অংশ নেন। কর্মশালায় মিশনের মহাসচিব তথা ভারতীয় গোয়েন্দা এবং তদন্ত সংস্থার (আই.ডি.আই.ও) মুখ্য সচিব শ্রী দেবাশীষ ঘোষ বক্তৃতা রাখেন। তিনি বলেন যে, আইন আছে আইনের জায়গায় কিন্তু শিশু শ্রম চলছে অবাধে, সবার চোখের সামনে, যারা শ্রম জোগাচ্ছে, তাদেরও প্রয়োজন, যারা শ্রমকে কাজে লাগাচ্ছে তাদেরও লাভ। তাছাড়া আইনের ফাঁকফোকর তো আছেই। সেই ফাঁককে কাজে লাগিয়ে আইন লংঘন করে অবাধে চলছে শিশু শ্রম। দারিদ্র্যতাই শিশু শ্রমের প্রধান কারণ নয়, দারিদ্র্যের প্রকোপ সমান থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র শিক্ষার প্রসারের সাহায্যে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা আশ্চর্যজনকভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন -এর প্রদত্ত সংজ্ঞানুযায়ী সেই সমস্ত শিশু যারা স্থায়ীভাবে প্রাপ্তবয়স্কের জীবনযাপন শুরু করেছে যারা কম মজুরির কারণে দীর্ঘক্ষণ এমন পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হয় যা তাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। শরীর ও মনের সুস্থ্য বিকাশের পথে প্রতিবন্ধক, যা তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে, যা প্রায়শই তাদের উন্নত ভবিষ্যতের পক্ষে উপযোগী শিক্ষা গ্রহণের পথে অন্তরায়, তারাই শিশু শ্রমিক। শিশু শ্রমের বাজারে কন্যাশিশুর চাহিদা অত্যন্ত বেশী। যে সমস্ত পেশায় শিশুকন্যাদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম প্রধান পতিতাবৃত্তি। ভারতে পতিতাবৃত্তিতে শিশুশ্রমের চাহিদা বাড়ছে।
বর্তমানে দেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যাটা প্রায় ৬ কোটি থেকে ৮ কোটি। ৫ থেকে ১৪ বয়ঃসীমার শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ। রাষ্ট্রসংঘের মতে ভারতীয় শ্রমিক সমাজের ৫৫ শতাংশই নাবালক। ফুটপাথের বাসিন্দা- অরক্ষিত শিশুর সংখ্যা ভারতে ১ কোটি ১০ লক্ষ। পশ্চিমবঙ্গে শিল্পক্ষেত্রে কাজের ধারার যেভাবে পরিবর্তন হচ্ছে, তাতে নির্মান শিল্প সহ অসংগঠিত ক্ষেত্রে শ্রমিকের সংখ্যা হুহু করে বেড়ে চলেছে। এই মুহূর্তে রাজ্যে মোট শ্রমিকের প্রায় ৯০ শতাংশই কাজ করেন অসংগঠিত ক্ষেত্রে। এদের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। তার ওপর কৃষিতে রোজগার কমে যাওয়ায় কৃষক থেকে শ্রমিক হওয়ার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। আর এই সুযোগে কলকারখানার মালিক ও প্রমোটার গোষ্ঠী কোনও নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে ব্যাপক হারে বেআইনী নিয়োগ চালিয়ে যাচ্ছে। মজুরি বা নিরাপত্তার প্রশ্নে ন্যূনতম শর্ত মানা হচ্ছে না। এমনই এক নিয়ন্ত্রনহীন পরিস্থিতিতে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। নিয়োগকারীরা সেটাই চায়। কারণ শিশু শোষণ অনেক বেশি সহজ ও নিরাপদ। এর সবচেয়ে বড় কারণ হল শিশু শ্রমিকদের পড়াশুনার প্রতি আগ্রহের অভাব, বলা বাহুল্য, আগ্রহের এই অভাবের জন্য কিন্তু শিশুরা দায়ী নয়, এই দায়ভাগ সম্পূর্ণই অভিভাবকের। উপযুক্ত শিক্ষা ছাড়া কেবলমাত্র কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দারিদ্র্যের সাময়িক সমাধান হতে পারে। চিরস্থায়ী নয়। একথা যতক্ষণ না দরিদ্র সমাজকে বোঝানো যাবে ততক্ষণ সেই সমাজকে শিশু শ্রমের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা যাবে না। তাই শিশু শ্রম বিলোপ করার জন্য চাই দেশের আর্থ-সামাজিক বিকাশের স্বার্থেই শিশু শ্রম প্রথার অবসানের বিষয়টিকে সার্বজনীন শিক্ষার পাশাপাশি রাখতে হবে। আইনের রক্ষক, শ্রমিকদের নিয়োগকর্তা নাগরিক সমাজ সকলকেই সক্রিয় হতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগর, বজবজ অঞ্চলে বাজি কারখানায়, হাওড়ায় শিল্পাঞ্চলে ছোট ও মাঝারি ঢালাই কারখানায়, লেদ, ওয়েলডিং, গ্রাইন্ডিং কারখানায়, আবার কখনও পূর্ব মেদিনীপুরের মাদুর তৈরীর কারখানায়, আজও হাজার হাজার, লক্ষ, লক্ষ শিশু শ্রমিক ঘাম-রক্ত ঝরাচ্ছে। সুতরাং শিশু শ্রম প্রথা নির্মূল করার বিষয়টিকে সামাগ্রিকভাবে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও শিক্ষা সংক্রান্ত কর্ম পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করার জন্য সচেতনতার প্রসার, জনসাধারনের অংশগ্রহণ, আর্থ-সামাজিক পূণর্বাসনের বিকল্প ও সুবিধানক ব্যবস্থা, শিশুশ্রম সংক্রান্ত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনসমূহের যথাযথ প্রয়োগই হল মিশনের মুখ্য উদ্দেশ্য। কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন মিশনের মহাসচিব ও বিশিষ্ঠ জনেরা।
