
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক:দিল্লির রামলীলা ময়দানে বিরোধীদের বিক্ষোভ কর্মসূচির আগে পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতার সভা থেকে ইন্ডি জোটকে নিশানা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার বিজেপির ‘গণতন্ত্র বাঁচাও, অরাজকতা হটাও’ কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ও সিপিএমকে একযোগে আক্রমণ করেন তিনি। বিশেষ করে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সিপিএমের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবির রাজনৈতিক সৌজন্য ও ঘনিষ্ঠতা নিয়ে কটাক্ষ করেন শুভেন্দু। তাঁর কথায়, “এখন আন্টি আর বেবির মধ্যে ভাব-ভালোবাসা হয়ে গিয়েছে।” ‘আন্টি’ বলতে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই বুঝিয়েছেন, সভামঞ্চ থেকেই তা স্পষ্ট করে দেন মুখ্যমন্ত্রী।
গড়বেতার সভা থেকে বাম ও তৃণমূলকে একসারিতে রেখে আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, তৃণমূল ও বামেদের মধ্যে কোনও ফারাক নেই। তাঁর খোঁচা, “যাহাই সিপিএম, তাহাই তৃণমূল।” গড়বেতার মানুষকে অভিনন্দন জানিয়ে শুভেন্দু বলেন, এখানকার মানুষ দ্বিতীয় স্বাধীনতার আনন্দ উপভোগ করছেন। চোর তৃণমূলকে গড়বেতার মানুষ শূন্য করে দিয়েছে। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূল অনেক অত্যাচার করেছে। কাউকে ছাড়া হবে না।
কলকাতা ও হাওড়ার পুরভোট নিয়েও হুঙ্কার দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, মানুষ সিপিএম ও তৃণমূলকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দেবে। ফলতা, রেজিনগর, নন্দীগ্রাম তিন আসনেই জিতেছে বিজেপি। এবার পুরভোটেও শূন্য পাবে তৃণমূল ও বামেরা।মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, ভোটের সময় ডাক্তার প্রণত টুডুর মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই মামলার এফআইআরের কপিটা তাঁকে পাঠাতে বলেন মুখ্যমন্ত্রী। এই মামলায় ক’জন গ্রেপ্তার হয়েছে, আর ক’জন হয়নি তা তিনি নিজে দেখবেন। তাঁর কথায়, “যাঁরা গ্রেপ্তার হয়নি তাঁদের চুলের মুঠি ধরে জেলে ঢোকাতে হবে।”
মহম্মদ সেলিমকে আক্রমণ করে সিপিএমকে কড়া বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। বাম আমলে পশ্চিম মেদিনীপুরের অধীনে ছিল গড়বেতা। লাল শাসনের আমলে গড়বেতা এলাকা রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ঠ সরগরম ছিল। বাম আমলে ‘ছোট আঙারিয়া গণহত্যা’র ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল সেসময়ের রাজ্য রাজনীতি। ২০০১ সালে তৃণমূল কর্মী বক্তার মণ্ডলের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। পাঁচ তৃণমূল কর্মী নিখোঁজ হয়ে যান। অভিযোগ উঠেছিল, বাড়িতে আগুন লাগিয়ে ওই তৃণমূল কর্মীদের পুড়িয়ে মারা হয়েছিল।
সেই ঘটনা নিয়ে একাধিক তদন্ত হয়েছে। ওই ঘটনার মূল সাক্ষ্মী বক্তার মণ্ডলও মারা গিয়েছেন বেশ কয়েক বছর আগে। এরপর কংসাবতী নদী দিয়ে বয়ে গিয়েছে প্রচুর জল। রাজনীতিতেও একাধিক বাঁক এসেছে। সেই ঘটনার পর রাজ্যে দুটি সরকার বদলে গিয়েছে। এখন রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায়। পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতা তৃণমূল আমলে গঠিত ঝাড়গ্রাম জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। লালমাটির এই গড়বেতায় আজ, শনিবার সভা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
সিপিএম নেতা সুশান্ত ঘোষ বলেন, “মামলা হয়ে বিচার হয়ে গিয়েছে। এখন আর নতুন করে ফাইল খুলে মুখ্যমন্ত্রী কী করবেন? এটা নিয়ে হাইকোর্টে ১৫ বছর ধরে একটা মামলা চলছে। হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দিয়ে রেখেছে। আগের সরকারের আইনজীবীরা হাজির হতেন না বলে এখনও বিচাররাধীন হয়ে রয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “নতুন সরকার এসে ইতিমধ্যেই আমার বিরুদ্ধে একটি কেস দিয়েছে জামিন অযোগ্য ধারায়। সেটাতে আগাম জামিন নিয়েছি। শর্ত দেওয়া রয়েছে প্রতি সপ্তাহে চন্দ্রকোনা রোড থানায় হাজিরা দিতে হবে। এই মামলায় আমি ছাড়াও শতরূপ ঘোষ ও জেলা সম্পাদক বিজয় পালকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।”
রাজ্যের উন্নয়নে একাধিক বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি সিপিএমকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করলেন। এদিন মঞ্চ থেকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করলেন সিপিএম নেতা মহম্মদ সেমিলকে। ছোট আঙারিয়া গণহত্যার ফাইল ফের খোলা হবে। সেই হুঁশিয়ারিও দিলেন। তাঁর হুঙ্কার, ‘ছোট আঙারিয়া থেকে সব কেসের ফাইল রিওপেন করব।” বাম আমলে নন্দীগ্রামের মাটি সাধারণ মানুষের রক্তে লাল হয়েছিল। বঙ্গ রাজনীতিতে আজও চর্চায় ‘রক্তাক্ত সূর্যোদয়’। সেই প্রসঙ্গও এদিন মুখ্যমন্ত্রীর কথায় উঠে এল।
দিন কয়েক আগে সিপিএম নেতা মহম্মদ সেলিম ঝাড়গ্রামে গিয়ে বিজেপিকে আক্রমণ করে বক্তব্য রেখেছিলেন। সেই নিয়েই এবার মহম্মদ সেলিমকে আক্রমণ করলেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর হুঙ্কার, “মহম্মদ সেলিম আপনার এত সাহস। আপনি বলেছিলেন, বিজেপি এসেছে সিপিএমকে আক্রমণ করতে। জনগণ প্রতিরোধ করেছে। আমি আজকে বলে গেলাম, ছোট আঙারিয়া থেকে শুরু করে ২০০৭-এ নন্দীগ্রামে, গড়বেতায় যে সিপিএম পার্টি অফিস ছিল, সেখান থেকে যারা যারা বন্দুক নিয়ে নন্দীগ্রামে রক্তাক্ত সূর্যোদয় করতে গিয়েছিল, তাঁদের কেস আমি রিওপেন করব। একটাকেও ছাড়া হবে না।”
বাম আমলে গড়বেতার বিধায়ক ছিলেন সিপিএম নেতা সুশান্ত ঘোষ। তাঁর দুই সঙ্গী ছিলেন তপন ঘোষ ও সুকুর ঘোষ। ‘ছোট আঙারিয়া গণহত্যা’য় সুশান্ত ঘোষ-সহ তপন-সুকুরের নাম জড়িয়েছিল। এদিনের সভামঞ্চে তপন-সুকুরের প্রসঙ্গও তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “আমি এর আগেও ওদের জবাব দিয়েছি। তপন-সুকুর একসময় বলেছিল, শুভেন্দু অধিকারী ঢুকলে পা ভাঙব। আমি তিনদিনের মধ্যে চন্দ্রকোনা রোডে এসে সুশান্ত ঘোষের বুকের উপরে দাঁড়িয়ে সভা করে গিয়েছিলাম।” তাহলে কি বাম আমলে ঘটা একাধিক রাজনৈতিক হত্যা, ‘গণহত্যা’-সহ দুষ্কর্মের ফাইল খোলা হবে? মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারির পর সেই চর্চা শুরু হয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে।
তাহলে কি ফের সুশান্ত ঘোষরা তদন্তের আওতাভুক্ত হবেন? কী হয়েছিল ২০০১ সালের ৪ জানুয়ারি? গড়বেতার ছোট আঙারিয়া গ্রামে বাড়ি ছিল তৃণমূল কর্মী বক্তার মণ্ডলের। তাঁর বাড়িতে আগুন লাগানো হয়েছিল বলে অভিযোগ। সেই ঘটনার পর পাঁচজন তৃণমূল কর্মী নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন! তৃণমূল কর্মীদের সিপিএম পুড়িয়ে মেরেছিল বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনায় সুশান্ত ঘোষ, তপন ও সুকুরের নাম অভিযুক্ত হিসেবে উঠেছিল। ঘটনার তদন্তও হয়েছিল। একাধিক গ্রেপ্তারিও হয়েছিল। ২০০৯ সালে সাক্ষীর অভাবে আদালত অভিযুক্তদের খালাস করে দিয়েছিল।
