
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সরকারের দুর্গাপুজোর অনুদান সংক্রান্ত নতুন নিয়মে সমস্যায় পড়েছে রাজ্যের কয়েক হাজার পুজো কমিটি। পুজোর অনুমতির পাশাপাশি এ বার সরকারি অনুদানের জন্যও পৃথক ভাবে আবেদন করতে বলা হচ্ছে কমিটিগুলিকে। আর সেই আবেদনের সঙ্গে পুজো কমিটির নামে থাকা প্যান কার্ড এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত তথ্য জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জানা গিয়েছে, প্রয়োজনীয় নথি ও ব্যাঙ্ক সংক্রান্ত তথ্য জমা না দিলে সরকারি অনুদানের ক্ষেত্রে থানার তরফে কোনও সহযোগিতা করা সম্ভব হবে না বলে পুজো কমিটিগুলিকে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নতুন এই নিয়ম কার্যকর হওয়ায় ইতিমধ্যেই একাধিক পুজো কমিটির মধ্যে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি ও জটিলতা। তবে নবান্ন সূত্রে খবর, নতুন নিয়ম নিয়ে আপাতত কোনও পরিবর্তনের কথা ভাবছে না রাজ্য সরকার। ফলে চলতি বছরে অনুদানের আবেদন করতে হলে নির্ধারিত নথি ও ব্যাঙ্ক সংক্রান্ত তথ্য জমা দেওয়ার নিয়মই মেনে চলতে হবে পুজো কমিটিগুলিকে।
গত বছর পর্যন্ত সরকারি অনুদান দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা ছিল। কোনও পুজো কমিটির নিজস্ব রেজ়িস্ট্রেশন বা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট না থাকলে কমিটির কোনও পদাধিকারীর প্যান নম্বর এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য জমা দিয়ে অনুদান নেওয়ার সুযোগ ছিল। সেই পদাধিকারীর নামে স্থানীয় থানার মাধ্যমে চেক দেওয়া হত। এ বার অনুদানের টাকা সরাসরি পুজো কমিটির নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে কোনও পদাধিকারীর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর সুযোগ থাকছে না। মহেশতলা বিধানসভা এলাকার বেগরখাল জোড়াবেড়ি সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির সমস্যাটিও তেমনই। প্রায় ১৫ বছর ধরে পুজো করে আসা এই কমিটি সরকারি অনুদানের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। গত বছর পর্যন্ত পুজো কমিটির সভাপতি প্রভাত চক্রবর্তীর প্যান নম্বর এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য দিয়েই অনুদানের টাকা পেয়েছে তারা। কিন্তু এ বার পুজোর অনুমতির জন্য আবেদন করতে গিয়ে মহেশতলা থানার কাছ থেকে নতুন নিয়মের কথা জানতে পারে কমিটি। নতুন নিয়ম জানার পরেই পুজো কমিটির নামে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এক আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে কমিটির সদস্যেরা জানতে পারেন, এত অল্প সময়ে প্রয়োজনীয় রেজিস্ট্রেশনের কাগজপত্র তৈরি করে প্যান কার্ড এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট করা কার্যত সম্ভব নয়। মহেশতলা এলাকার জিঞ্জিরা বাজারের একটি পুজো কমিটির ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে।
বেগরখাল জোড়াবেড়ি সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির সভাপতি প্রভাত চক্রবর্তী বলেন, ‘‘আমাদের পুজো পুরোপুরি সরকারি অনুদানের উপর নির্ভরশীল। পুজোর অনুমতির জন্য আবেদন করতে গিয়ে আমাদের সদস্যেরা মহেশতলা থানা থেকে অনুদান পাওয়ার নতুন নিয়মের কথা জানতে পেরেছেন। এত অল্প সময়ে রেজ়িস্ট্রেশন এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার সময় অনুদান পাওয়ার এই শর্তের কথা জানানো হয়নি। তাই বিষয়টি আমাদের কাছে স্পষ্ট ছিল না। এখন আমাদের শাঁখের করাতের মতো অবস্থা।’’ তবে পুজোর আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতার প্রশ্নে সরকারের নতুন নিয়মকে সমর্থনই করছেন ফোরাম ফর দুর্গোৎসবের সভাপতি সন্দীপন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘‘এই ধরনের প্রবণতাকে আমরা উৎসাহ দিতে পারি না। দুর্গাপুজো আমাদের কাছে একটি বড় বিষয়। সেখানে আর্থিক লেনদেন হবে, অথচ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং প্যান কার্ড থাকবে না— তা মেনে নেওয়া যায় না। শুধু রাজ্য সরকারের অনুদান নয়, পুজোয় বিজ্ঞাপনের অর্থও পুজো কমিটিগুলি পেয়ে থাকে নির্দিষ্ট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে। আমরা কোনও অস্বচ্ছ আর্থিক লেনদেনকে সমর্থন করতে পারি না। আর পুজো কমিটির টাকা কেনই বা কোনও ব্যক্তির নামে নেওয়া হবে?’’ প্রায় একই সুরে পশ্চিমবঙ্গ দুর্গাপুজো সমন্বয় সমিতির উপদেষ্টা প্রতীম সরকার বলেন, ‘‘যে কোনও দুর্গাপুজো সাধারণত ক্লাবের উদ্যোগে হয়। তাই ক্লাবের কোনও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকলে কোনও সমস্যা হয় না। কিন্তু যে পুজো কমিটিগুলি এতদিন ধরে কোনও ব্যক্তি বিশেষের অ্যাকাউন্টে টাকা নিয়েছে, তারা সঠিক কাজ করেননি।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘সরকার কোনও ব্যক্তিকে পুজো করার জন্য অর্থ দিতে পারে না। সরকার আর্থিক অনুদান দিয়ে থাকে কোনও সংগঠনকে। কারও কোনও সমস্যা থাকলে আমাদের তারা জানাতে পারে, আলোচনাও করা যেতে পারে। কিন্তু সেই সংগঠনগুলির আগে উচিত, নিজেদের রেজ়িস্ট্রেশন করিয়ে ব্যাঙ্ক আকাউন্ট করে পুজোর জন্য সরকারি অনুদান এবং বেসরকারি বিজ্ঞাপন নেওয়া।’’
অন্য দিকে, বেহালার একটি পুজো কমিটির সমস্যা আরও এক ধাপ বেশি। অনুদান তো দূরের কথা, পুজোর অনুমতি পাওয়া নিয়েও সংশয় রয়েছে তাদের। বেহালা থানার পাশের একটি গলিতে ৬৮ বছর ধরে হয়ে আসছে ডায়মন্ড ক্লাবের দুর্গাপুজো। কমিটির অন্যতম সদস্য মুকুলেশ দাম অভিযোগ করেন, গত সরকারের আমলে এলাকার তৃণমূলের প্রভাবশালী অংশের কারণে তাঁদের পুজোর অনুমতি মিলত না। ফলে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর পুজোর জন্য ঘোষিত অনুদান থেকেও তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন বলে তাঁর দাবি। মুকুলেশের কথায়, ‘‘গত বছর একটি সূত্র মারফত আমরা আমাদের বঞ্চনার কথা তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকে জানিয়েছিলাম। সেই সময় তিনি তাঁর সদ্যপ্রয়াত আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথকে দিয়ে আমাদের জন্য আর্থিক সাহায্য পাঠিয়েছিলেন। চন্দ্রনাথদা আমাদের আশ্বাস দিয়ে গিয়েছিলেন, রাজ্যে ক্ষমতার বদল হলে আমাদের পুজোর অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি অনুদানও দেওয়া হবে। কিন্তু চন্দ্রনাথদা প্রয়াত হয়েছেন। আমরা বেহালা থানার সঙ্গে কথা বলে পুজোর আবেদন জানিয়েছি। তবে আর্থিক অনুদান পাব কি না, তা এখনও জানা নেই।’’
প্রসঙ্গত, গত ৭ সেপ্টেম্বর কলকাতার দুর্গাপুজো কমিটিগুলির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে এ বছরের সরকারি অনুদান ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। এ বার পুজো কমিটি-পিছু এক লক্ষ টাকা করে অনুদান দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে বড় বাজেটের পুজো কমিটিগুলিকে সরকারি অনুদান না নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিলে ১০০ শতাংশ ছাড় এবং দমকলের ছাড়পত্রের ফি মকুবের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে মুখ্যমন্ত্রীর আবেদনে সাড়া দিয়ে কলকাতার কয়েকশো পুজো কমিটি সরকারি অনুদান নেবে না বলে ঘোষণা করে দিয়েছে। অন্য দিকে, শহরতলি এবং গ্রামাঞ্চলের পুজো কমিটিগুলি নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট না থাকার কারণে সমস্যায় পড়তে চলেছে পুজোর আয়োজন নিয়ে।
২০২৫ সালে রাজ্যের ৪৫,৩৩৬টি দুর্গাপুজো কমিটিকে এক লক্ষ ১০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়েছিল। সরকারি হিসাবে, সে বছর অনুদানের জন্য মোট বরাদ্দ ছিল ৪৯৮ কোটি ৬৯ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা। তার আগের বছর, ২০২৪ সালে, একই সংখ্যক পুজো কমিটিকে ৮৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে মোট খরচ হয়েছিল ৩৮৫ কোটি ৩৫ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা। ফলে এক দিকে সরকারি অনুদানের পরিমাণ এ বার কমেছে, অন্য দিকে অনুদান পাওয়ার প্রক্রিয়ায় পুজো কমিটির নিজস্ব প্যান কার্ড এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বাধ্যতামূলক হওয়ায় নতুন করে তৈরি হয়েছে প্রশাসনিক জটিলতা। পুজোর দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই এই নিয়ম কী ভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বিভিন্ন পুজো কমিটির মধ্যে।
