
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: একটা সময় দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে পরকীয়াকেই মনে করা হত। সবকিছু ঠিকঠাক চলার মাঝেই হঠাৎ ঝগড়া, মনোমালিন্য, দূরত্ব—আর তার নেপথ্যে তৃতীয় কোনও ব্যক্তির উপস্থিতি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে সেই ছবি। বর্তমানে অনেক সম্পর্কেই পরকীয়া নেই, নেই বড় কোনও বিবাদও। তবুও ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছেন দু’জন মানুষ। আর এই দূরত্বের নেপথ্যে উঠে আসছে এক নতুন সমস্যা—সময়ের অভাব।
শুনতে হয়তো খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু আধুনিক ব্যস্ত জীবনে ‘সময়’ই যেন হয়ে উঠেছে সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সংকট। কর্মক্ষেত্রের চাপ, অফিসের ডেডলাইন, যাতায়াতের দীর্ঘ সময় এবং বাড়ি ফিরেও কাজের ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে নিজের জন্যই সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তার উপর অধিকাংশ দম্পতির ক্ষেত্রেই দু’জনেই কর্মরত হওয়ায় দু’জনের দৈনন্দিন সময়সূচিও হয়ে উঠছে আরও ব্যস্ত। দিনের শেষে যে সামান্য সময়টুকু হাতে থাকে, সেখানেও ঢুকে পড়েছে স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার নেশা। একই ঘরে, এমনকী একই বিছানায় থেকেও দু’জন হয়তো নিজেদের ফোনে ব্যস্ত। কেউ রিল দেখছেন, কেউ সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রোল করছেন। একে অপরের সঙ্গে কথা বলার বদলে এভাবেই কেটে যাচ্ছে মূল্যবান সময়। তারপর ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুম। এভাবেই অজান্তেই সম্পর্কের মধ্যে তৈরি হচ্ছে দূরত্ব।
এর সঙ্গে রয়েছে সামাজিক ও পারিবারিক দায়িত্বের চাপ। অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর ছুটির দিন এক হয় না। আবার ছুটি এক হলেও সারাদিনের ক্লান্তি এতটাই বেশি থাকে যে একে অপরকে দেওয়ার মতো মানসিক বা শারীরিক শক্তি অবশিষ্ট থাকে না। ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় একসঙ্গে বেড়াতে যাওয়া, পছন্দের খাবার খেতে যাওয়া কিংবা নিছক পাশাপাশি বসে গল্প করার মতো ছোট ছোট মুহূর্তগুলো। গ্লিডেন ও IPSOS-এর একটি নতুন সমীক্ষাতেও উঠে এসেছে এই পরিবর্তিত বাস্তবতার ছবি। সমীক্ষা অনুযায়ী, ৩৩ শতাংশ ভারতীয় মনে করেন, কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্যের অভাব এবং সঙ্গীর সঙ্গে পর্যাপ্ত ‘কোয়ালিটি টাইম’ কাটাতে না পারাই তাঁদের সম্পর্কের অন্যতম বড় সমস্যা। এই পরিস্থিতিকেই বলা হচ্ছে ‘টাইম পোভার্টি’ বা ‘সময়ের দারিদ্র্য’।
সময়ের এই অভাব ধীরে ধীরে সম্পর্কের আবেগকেও প্রভাবিত করতে পারে। একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কমতে থাকলে দু’জনের মধ্যে কথাবার্তা কমে যায়, একে অপরের জীবনের ছোটখাটো বিষয়গুলোও অজানা থেকে যায়। একসময়ের ঘনিষ্ঠ মানুষ দু’জন কখন যেন পরস্পরের কাছে অপরিচিত হয়ে উঠতে শুরু করেন। আর সেই দূরত্ব দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকলে সম্পর্ক ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ে। তবে এই সমস্যার সমাধানের জন্য বড় কোনও রোম্যান্টিক আয়োজনের প্রয়োজন নেই। বরং ব্যস্ততার মধ্যেই একে অপরের জন্য কিছুটা সময় আলাদা করে রাখাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা ফোন দূরে রেখে দু’জনে কথা বলতে পারেন। সম্ভব হলে অন্তত একটি বেলা একসঙ্গে খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করুন। কাজের ফাঁকে ছোট্ট একটি মেসেজ কিংবা ফোন করে জেনে নিতে পারেন, কেমন কাটছে সঙ্গীর দিন।
রাতে আলাদা আলাদা ফোন স্ক্রোল করার বদলে একসঙ্গে কোনও সিনেমা বা সিরিজ দেখতে পারেন। সারাদিনের ক্লান্তির পর ঘরের যাবতীয় কাজ একজনের উপর না চাপিয়ে দু’জনে ভাগ করে নিলে একদিকে যেমন কাজের চাপ কমবে, তেমনই তৈরি হবে একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সবসময় বড় বড় প্রতিশ্রুতির প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন ছোট ছোট মুহূর্তকে গুরুত্ব দেওয়া। ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে সঙ্গীর জন্য সামান্য সময় বরাদ্দ করাই হয়তো ফিরিয়ে দিতে পারে হারিয়ে যাওয়া ঘনিষ্ঠতা। কারণ, অনেক সময় সম্পর্ক ভাঙার জন্য তৃতীয় কোনও ব্যক্তির প্রয়োজন হয় না—দু’জনের মাঝখানে তৈরি হওয়া দীর্ঘ নীরবতাই যথেষ্ট।
