
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: ধনতেরাস ও দীপাবলির আগে সোনার বাজারে টানা দরপতনের চাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শক্তিশালী মার্কিন ডলার, মার্কিন বন্ডের উচ্চ ফলন এবং দীর্ঘদিন সুদের হার চড়া থাকার আশঙ্কা—এই তিনটি কারণই সোনার দামের উপর চাপ তৈরি করছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছনোর পর মাল্টি কমোডিটি এক্সচেঞ্জে (এমসিএক্স) সোনার দাম অনেকটাই কমেছে। তবে উৎসবের মরশুমে কেনাকাটার চাহিদা বাড়লে সোনার দাম ফের ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে বলে মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞদের একাংশ। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি এমসিএক্সে প্রতি ১০ গ্রাম সোনার দাম সর্বোচ্চ ১,৮০,৭৭৯ টাকায় পৌঁছেছিল। বর্তমানে দাম প্রায় ১,৪২,৮০০ টাকা, অর্থাৎ রেকর্ড উচ্চতার তুলনায় প্রায় ৩৮,০০০ টাকা কম। তবে এই দর নির্দিষ্ট সময়ের বাজারদরের উপর নির্ভরশীল এবং কেনার আগে সর্বশেষ দাম যাচাই করা জরুরি।
কেন সোনার দামে চাপ তৈরি হয়েছে?
বোনানজার সিনিয়র রিসার্চ অ্যানালিস্ট নির্পেন্দ্র যাদবের মতে, শক্তিশালী মার্কিন ডলার, বাড়তে থাকা ট্রেজারি বন্ডের ফলন এবং মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার সংক্রান্ত পরিবর্তিত প্রত্যাশা সোনার দামের উপর চাপ তৈরি করছে। বছরের শুরুতে বড় উত্থানের পর বিনিয়োগকারীদের মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতাও দাম কমার অন্যতম কারণ। সোনা নিয়মিত সুদ দেয় না। ফলে বন্ডের ফলন বেড়ে গেলে বিনিয়োগকারীদের কাছে বন্ড তুলনামূলক আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। এর প্রভাব পড়ে সোনার চাহিদা ও দামের উপর। ফিউচার্স বাজারে অস্থিরতাও দামের ওঠানামা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ধনতেরাসের আগে কি ফের বাড়তে পারে সোনার দাম?
ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশন ফর গোল্ড এক্সেলেন্স অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডসের (IAGES) সিইও কৌশলেন্দ্র সিনহার মতে, উৎসবের মরশুমে সোনার চাহিদা শক্তিশালী থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সোনার দাম সাম্প্রতিক উচ্চতা থেকে কমলেও বহু ক্রেতার কাছে এটি এখনও মূল্য সঞ্চয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এখন ক্রেতারা শুধু গয়নার নকশা বা দাম নয়, সোনার বিশুদ্ধতা, দায়িত্বশীল উৎস এবং কেনাকাটায় স্বচ্ছতার দিকেও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে গয়না কেনার ক্ষেত্রে বিক্রেতার উপর আস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে উৎসবের চাহিদা বাড়লেই সোনার দাম নিশ্চিতভাবে বাড়বে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। আন্তর্জাতিক বাজার, ডলারের গতিপ্রকৃতি এবং সুদের হার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তও দামের দিক নির্ধারণে বড় ভূমিকা নেবে।

মার্কিন ফেডের সিদ্ধান্তের দিকে নজর
বাজার বিশেষজ্ঞ অনুজ গুপ্তের মতে, মার্কিন ১০ বছরের বন্ডের ফলন কমলে সোনার দামের উপর চাপ কিছুটা কমতে পারে। তাঁর বক্তব্য, বন্ডের ফলন ও ডলারের দুর্বলতা সোনার বাজারে ফের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরির সুযোগ করে দিতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করেছেন, দাম বাড়লেও সেই উত্থান স্বল্পস্থায়ী হতে পারে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের ফেড বৈঠককে ঘিরে প্রত্যাশা নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে সোনা, রুপো ও শেয়ারবাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
বোনানজার নির্পেন্দ্র যাদবও স্বল্পমেয়াদে সোনার বাজার নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, মার্কিন ডলার, বন্ডের ফলন, মূল্যবৃদ্ধির তথ্য এবং ফেডের নীতিগত অবস্থানই পরবর্তী দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে। পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ এবং বিনিয়োগের ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সোনার ভূমিকা দীর্ঘমেয়াদে চাহিদাকে সমর্থন করতে পারে। ভারতে ডলারের বিপরীতে টাকার ওঠানামাও দেশীয় সোনার দামে প্রভাব ফেলবে।
ধনতেরাস ও দীপাবলি ২০২৬: সোনার দামের সম্ভাব্য লক্ষ্য
এনরিচ মানির সিইও আর পন্নমুদির মতে, এমসিএক্সে সোনার দামের তাৎক্ষণিক প্রতিরোধের স্তর রয়েছে ১,৪৩,০০০ থেকে ১,৪৩,৭০০ টাকার মধ্যে। এর পরবর্তী প্রতিরোধের স্তর ১,৪৫,৩০০ থেকে ১,৪৬,০০০ টাকা। অন্যদিকে, তাৎক্ষণিক সাপোর্ট বা সমর্থনের স্তর ১,৪০,০০০ থেকে ১,৪১,০০০ টাকার মধ্যে।
অনুজ গুপ্তের মতে, মার্কিন ১০ বছরের বন্ডের ফলন আরও কমলে এবং ফেডের সিদ্ধান্ত বাজারের অনুকূলে গেলে ধনতেরাস ও দীপাবলির আগে সোনার দামে কিছুটা উত্থান দেখা যেতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে এমসিএক্সে প্রতি ১০ গ্রাম সোনার দাম ১,৪৬,০০০ টাকার প্রতিরোধের স্তর পেরিয়ে ১,৪৯,০০০ থেকে ১,৫০,০০০ টাকার দিকে এগোতে পারে। এই লক্ষ্যগুলি বিশেষজ্ঞদের সম্ভাব্য বাজার-অনুমান, নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বা সুদের হার নিয়ে প্রত্যাশা বদলে গেলে সোনার দাম আবারও কমতে পারে।
এখন সোনা কিনবেন, নাকি অপেক্ষা করবেন?
ধনতেরাস বা দীপাবলিতে গয়না কেনার পরিকল্পনা থাকলে শুধু দাম আরও কমবে বা বাড়বে, এই অনুমানের উপর সিদ্ধান্ত না নেওয়াই ভালো। ক্রেতারা কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করতে পারেন:
গয়না কেনার জন্য: বাজেট ও কেনার প্রয়োজন নির্দিষ্ট থাকলে বিভিন্ন বিশ্বস্ত বিক্রেতার দর তুলনা করুন। শুধু প্রতি গ্রাম সোনার দাম নয়, মেকিং চার্জ, অপচয় বাবদ খরচ এবং প্রযোজ্য করসহ মোট বিল দেখুন।
বিশুদ্ধতা যাচাই করুন: হলমার্ক, ক্যারেট এবং বিক্রেতার বিলের তথ্য পরীক্ষা করুন।
বিনিয়োগের জন্য: স্বল্পমেয়াদে উৎসবের আগে দাম বাড়বে ধরে একসঙ্গে বড় অঙ্ক বিনিয়োগ করার ঝুঁকি বিবেচনা করুন। কেনার আগে নিজের সময়সীমা, ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা এবং পোর্টফোলিওতে সোনার ভূমিকা বুঝে নিন।
দাম আরও কমার অপেক্ষায় থাকলে: সম্ভাব্য লাভের পাশাপাশি দাম উল্টো দিকে গেলে কী করবেন, সেটিও আগে ঠিক করুন।
রেকর্ড উচ্চতা থেকে সোনার দামের বড় পতন ক্রেতাদের কাছে কেনার সুযোগ তৈরি করেছে বলে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করছেন। আবার শক্তিশালী ডলার ও উচ্চ বন্ডের ফলন স্বল্পমেয়াদে দামের উপর চাপ বজায় রাখতে পারে। ধনতেরাস ও দীপাবলির আগে সোনার দাম বাড়বে কি না, তা মূলত আন্তর্জাতিক বাজার এবং মার্কিন ফেডের নীতিগত সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে। তাই গয়না কেনা ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে সম্ভাব্য দামের লক্ষ্যকে নিশ্চয়তা হিসেবে না দেখে বর্তমান বাজারদর, মোট খরচ এবং ব্যক্তিগত আর্থিক পরিস্থিতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
