
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: উত্তর নেপালে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের জেরে তৈরি হয়েছে আতঙ্কের পরিস্থিতি। পাহাড়ি এলাকায় আচমকা হড়পা বান নেমে একাধিক গ্রাম, রাস্তা ও সেতু কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। বুধবার সকালে তিব্বতের দিক থেকে হঠাৎ বিপুল জলস্রোত নেমে আসে নেপালের ভোতেকোশি নদীতে। অল্প সময়ের মধ্যেই সেই জলস্রোত ভয়াবহ রূপ নেয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, এই বিপর্যয়ে ১০০০ জনেরও বেশি মানুষ ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখনও পর্যন্ত আটজনের দেহ উদ্ধার হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে, পাহাড়ি নদীর জল মুহূর্তের মধ্যে ফুলেফেঁপে উঠে আশপাশের সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। উদ্ধারকাজ শুরু হলেও পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
নেপাল প্রশাসন সূত্রে খবর, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নেপালের রাসুয়া জেলার টিমুরে, স্যাফ্রুবেশি-সহ ভোতেকোশি নদীর তীরবর্তী এলাকা। স্থানীয়দের দাবি, বুধবার সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ হঠাৎ প্রবল গর্জনের শব্দ শোনা যায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জল ও কাদার বিশাল স্রোত নেমে আসে। সেই তোড়ে টিমুরে বাজার কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। বহু বাড়ি ও দোকানের কোনও চিহ্নও আর দেখা যাচ্ছে না। প্রবল স্রোতে বেশ কিছু সেতু কার্যত ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গিয়েছে, কোথাও আবার সেতুর অংশ ভেঙে পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। বেশ কিছু এলাকায় রাস্তার উপর দিয়ে জল ও কাদার স্রোত বইতে দেখা গিয়েছে।
রাসুয়া জেলার প্রায় এক ডজন জনপদে ক্ষয়ক্ষতির খবর মিলেছে। এর মধ্যে স্যাফ্রুবেশি, বেত্রাবতী, মাইলুং, সাল্লেতার, শান্তিবাজার, পৈরেবেশি, খালতি বস্তি, সোলে, ত্রিশূলী ও বাট্টারে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রাসুয়া ও নুয়াকোটের মধ্যে একাধিক এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। বেশ কিছু জায়গায় স্থানীয় প্রশাসন এখনও বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। হড়পা বানের জেরে দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলির সঙ্গে যোগাযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্ধারকাজেও ব্যাপক সমস্যা তৈরি হয়েছে। টিমুরের হেলিপ্যাড পর্যন্ত জলের তোড়ে ভেসে যাওয়ায় উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার সেখানে অবতরণ করতে পারেনি। ফলে দুর্গম এলাকায় আটকে থাকা মানুষকে উদ্ধার করতে সমস্যা হচ্ছে। বন্যার জেরে নেপাল-চিন সীমান্তের টিমুরে মোতায়েন থাকা নয় জন সশস্ত্র পুলিশকর্মী-সহ মোট ৪১ জন নিরাপত্তাকর্মী নিখোঁজ হয়েছেন বলে জানিয়েছে নেপালের কর্তৃপক্ষ। ওই এলাকার পুলিশ অফিস এবং সীমান্তের কাছে থাকা আরও কয়েকটি পুলিশ পোস্টও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা যাচ্ছে, রাসুয়ায় বড় ধরনের বৃষ্টিপাতের কারণে এই বন্যা হয়নি। স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের দিকে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়েছিল। সেই জল হঠাৎ ভোতেকোশি নদীতে ঢুকে পড়ে হড়পা বান তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে কোনও হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে জল নেমে এসেছিল কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। নেপালে বর্ষাকালে পাহাড়ি এলাকায় হড়পা বান ও ভূমিধস নতুন ঘটনা নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয় অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, হিমবাহ গলে যাওয়া এবং হঠাৎ বন্যার ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। অতীতে নেপালের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় হড়পা বান ও হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণের জেরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এদিকে বিপর্যস্ত এলাকায় প্রশাসনের তরফে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। নদীর কাছাকাছি এবং নিচু এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনী। প্রাথমিক রিপোর্টে ক্ষয়ক্ষতির ছবি ভয়াবহ হলেও ঠিক কতজনের মৃত্যু হয়েছে বা কতজন নিখোঁজ, তা এখনও স্পষ্ট নয়। দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের পরই হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা জানা সম্ভব হবে। আপাতত উদ্ধার ও ত্রাণকাজকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
