
কলকাতা, ২৮ ফেব্রুয়ারি : বিজ্ঞানের প্রথম সারির একগুচ্ছ দিক নির্দেশকদের উপস্থিতিতে মঙ্গলবার কলকাতায় অনুষ্ঠিত হল ৩০ তম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কংগ্রেসের দু’দিন ব্যাপী উদযাপনের প্রথম দিন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন স্তরের সর্বশেষ গবেষণার নানা ফসল, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পথরেখা নিয়ে বলেন নানা ক্ষেত্রের তারকা বিজ্ঞানী।
জাতীয় বিজ্ঞান দিবসের উদ্দেশ্য বিজ্ঞানের সার্বিক প্রসার। বর্তমান অস্থিরতার সময়ে সবাই আমরা বিজ্ঞানের শরণাপন্ন। বিজ্ঞান আমাদের চেতনা ও মননে। আজ ইন্টারনেটের দৌলতে গোটা বিশ্ব হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। বিশ্বায়নের ফলে গোটা দুনিয়া আজ তোলপাড়। বিশ্বের হাল-হকিকত সংবাদ অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা জানতে পারি, বিজ্ঞানের হাত ধরে। এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার বিশেষজ্ঞদের আর্জি, বিজ্ঞানকে আরও জনকল্যাণমুখী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে হবে। মাতৃভাষার মাধ্যমে বিজ্ঞান শিক্ষা ও বিজ্ঞানচর্চার বিষয়ে আরও অগ্রাধিকার দিতে হবে। মানুষকে আরও বিজ্ঞানমনস্ক করে তুলতে হবে।
একটা সময় গোটা উপমহাদেশে দীর্ঘকাল ধরে বিজ্ঞান সাধনার পথ দেখিয়েছে এই বাংলা। বোস ইন্সটিট্যুটের অধিকর্তা অধ্যাপক ডঃ উদয় বন্দ্যোপাধ্যায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেন, সত্যেন বসু বলতেন, যিনি বাংলায় বিজ্ঞান বলতে পারেন না, তিনি হয় বাংলা বোঝেন না। বা, বিজ্ঞান বোঝেন না। দেশবিদেশের বিভিন্ন ভাষা তিনি জানতেন। কিন্তু অনুভব করতেন, মাতৃভাষায় সহজ করে বিজ্ঞানকে পরিবেশন না করলে বিষয়টার যথার্থ রূপ দেওয়া মুসকিল। জগদীশ চন্দ্র বসু ‘কচুরিপানার উপকারিতা’র মত সহজ বিষয় নিয়ে বাংলায় আলোচনাসভা করতেন।
উদয়বাবু বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মধ্যে কেউ কেউ হয়ত বিভেদের অস্তিত্ব খোঁজেন। কিন্তু আসলে একই বৃন্তে একাধিক রূপ। এ দুয়ের সুষম সমন্বয়েই সমাজ প্রকৃত উপকার পাবে। ভগিনী নিবেদিতাও এই সরল সত্যের কথা জানিয়েছিলেন। আর, বিজ্ঞানের পরিসরটাও তো অনেক বড়। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা, ৭০ কিলোর একটি মানুষের চরিত্র এবং ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে মাত্র ৯০০ মিলিগ্রাম ডিএনএ। কিভাবে মন খারাপ হলে দেহে ‘সেরাম’ তৈরি হয়। এই জৈব শক্তি কিভাবে, কতটা আমাদের প্রভাবিত করে— বিস্মিত হতে হয় তার বিশদ জানলে। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের ‘মাইটোকেন’ আমরা পাই মায়ের কাছ থেকে। তাই মহিলাদের বিশেষ সম্মান করবেন।
রাজ্যের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও জৈবপ্রযুক্তি দফতরের মন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাস বলেন, এটা ঠিক, বিজ্ঞান হোক মাতৃভাষায়। এই বিশেষ বিষয়টা আমরা এবারের শিরোনাম করব ঠিক করেছিলাম। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “আলোকের এই ঝরনাধারায় ধুইয়ে দাও“। বিজ্ঞানের সঙ্গে শিল্পের ভাবনার এই সুষম মিলন। বিজ্ঞানের সঠিক প্রসারই আমাদের ভবিষ্যতের পথের দিশারি হতে পারে। কয়লা, পেট্রোল প্রভৃতির ভাঁড়ার ফুরিয়ে আসছে। তাই আমাদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে। দুঃখের ব্যাপার, উন্নত দেশগুলোর তুলনায় ভারতের গবেষণা ও উন্নয়নখাতে সরকারি বরাদ্দের হার অত্যন্ত কম। এর মধ্যেও বলব, যে যা তৈরি করবেন নিজস্বতা (পেটেন্ট) নিয়ে নেবেন। তাহলে অধিকার পেয়ে যাবেন। আমরা চাই এই পেটেন্টের মাধ্যমে ‘এন্ট্রিপ্রিনিওরশিপ’ নিক। জিআই সার্টিফিকেটের মত গবেষকরা গুরুত্ব সহকারে প্রচার করুন। যাতে সমাজ আপনার উন্মেষের সুফল পায়।
কেন্দ্রীয় সরকারের ভেরিয়েবেল এনার্জির অধিকর্তা অধ্যাপক ডঃ সুমিত সোম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেন, দূষণ আমাদের মাথাব্যথার একটা বড় কারণ। ভারতে কোনও তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ঘন্টায় এক গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় এক হাজার টন কার্বন ডাই অক্সাইড তৈরি হয়। এদেশে ৪১০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। প্রতি ঘন্টায় দশমিক দুই মিলিয়ন কার্বন ডাই অক্সাইড তৈরি হয়। মাত্রাটা সাঙ্ঘাতিক রকমের বেশি। সে তুলনায় পারমানবিক চুল্লিতে অনেক বেশি গ্রিন হাউস গ্যাস পাওয়া যায়। তেজস্ক্রিয় বিকিরণ হয় যৎসামান্য। নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিলে বিবদের কোনও আশঙ্কা থাকে না। ১৯৫৬ সালে ভারতে প্রথম পরমাণু চুল্লি চালু হয়েছিল। তার পর থেকে উল্লেখযোগ্য কোনও দুর্ঘটনা হয় নি। আমাদের এসব খতিয়ে দেখতে হবে। কিছু লোকের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। সুচিন্তিতভাবে এগোনো দরকার। রেডিও আইসোটোপের গুরুত্ব ক্যান্সারের চিকিৎসায় উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রকের বিভাগীয় প্রধান দেবপ্রিয় দত্ত বলেন, বাংলা বরাবরই বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষনার পথপ্রদর্শক। এখনও দেশের রাজ্যভিত্তিক ‘ইনোভেশন ইনডেক্স’-এর তালিকায় বাংলা গড়ের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে। এ রাজ্যে ৪৭টি গবেষনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯টি ‘জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ’ মর্যাদা পেয়েছে। তবে, একটা বড় জনগোষ্ঠী বিজ্ঞানের সুফল সেভাবে পাননি। সবার কাছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফল পৌঁছে দিতে পারলে তবেই আমরা সার্থক হব।
মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইএনটি বিভাগের প্রধান, অধ্যাপক ডঃ সুদীপ দাসকে এদিন সম্বর্ধনা জানানো হয়। মন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাস বলেন, চিকিৎসকরা সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও যদি ব্যবহারিক ক্ষেত্রে তাঁদের উন্মেষের প্রকাশ করেন, সমাজ তার সুফল পাবে। সুদীপবাবু বলেন, বাচ্চারা কোনও জিনিস গিলে ফেললে সময় বিশেষে বড্ড জটিলতা দেখা যায়। সে রকম মুসকিল আসানের পথ নির্দেশ করে তিনি রোগীদের সহায়ক হওয়ার চেষ্টা করেছেন।
এদিন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রারম্ভিক ভাষণ দেন উদ্যোক্তা দফতরের প্রধান সচিব হৃদেশ মোহন। তিনি জানান, মঙ্গল ও বুধ— এই দু’দিনে ১২টি অধিবেশনে ১৬০টি গবেষণাপত্র পাঠ হবে। বিভিন্ন নামী সংস্থার শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থীরা চর্চা করবেন সম্ভাবনাময় নানা বিষয় নিয়ে। অনুষ্ঠানে পিসি মহালানবীশ স্মারক বক্তৃতা দেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ‘পদ্মশ্রী’, ‘জাতীয় বিজ্ঞান চেয়ার’-এর অধিকারী ডঃ শঙ্কর কুমার পাল। তাঁর আলোচনার বিষয় ‘মেশিন এনকারেজমেন্ট অ্যান্ড ডেটা সায়েন্স’। স্মারক বক্তৃতা থাকছে জগদীশ চন্দ্র বসু, শান্তিস্বরূপ ভাটনগরের মত বিশিষ্ট কিছু বিজ্ঞানীর নামেও।
মঞ্চে সমবেত অতিথিরা সি ভি রমনের প্রতিকৃতীতে মালা দেন। তাঁদের স্বাগত জানান রাজ্যের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দফতরের যুগ্ম সচিব শ্রাবনী ধর। অনুষ্ঠানের শুরুতে বিজ্ঞান দিবসের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন অনুষ্ঠানের সংযোজক সতীনাথ চট্টোপাধ্যায়। মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বলনের সময় তিনি পরিবেশন করেন উপনিষদের স্তোত্রের একাংশ। অতিথিদের উপহারের মধ্যে ছিল লোকশিল্পের অনন্য নিদর্শন ডোকরার তৈরি সরস্বতী মূর্তি ও ঘরে রাখার উপযোগী চারা।
প্রসঙ্গত, প্রসিদ্ধ ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন-এর ‘রামন এফেক্ট'-এর আবিষ্কারের সম্মানে ১৯৮৭ সাল থেকে ভারতে প্রতি বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় বিজ্ঞান দিবস সাড়ম্বরে পালিত হয়। ১৯২৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন আবিষ্কার করেন ‘রামন এফেক্ট”। এর জন্য ১৯৩০ সালে পদার্থবিদ্যায় তিনি নোবেল পুরস্কার পান। জাতীয় বিজ্ঞান দিবসের জন্য প্রতি বছরেই নির্ধারিত হয় কোনও থিম। জাতীয় বিজ্ঞান দিবস ২০২৩ সালের থিম 'সর্বজনীন কল্যাণে বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞান'। বিভিন্ন থিম বিগত বছরগুলোতে ছিল। দেশের বিভিন্ন শিক্ষামূলক, বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তিগত, মেডিকেল ও গবেষনা প্রতিষ্ঠানে প্রতি বছর জাতীয় বিজ্ঞান দিবস পালিত হয়। মানুষের কল্যাণে বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বিশদ ভাবে প্রতিফলিত হয় এই থিমে। জাতীয় বিজ্ঞান দিবস উদযাপন করে পালিত হয় বিভিন্ন কর্মসুচি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষনা প্রতিষ্ঠানে।
