
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: রাজ্যে দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের আবহে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি আপত্তিকর মিম ঘিরে শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক। সেই মিমে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-কে নিয়ে কুরুচিকর ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এক ৭১ বছরের মহিলার ব্যক্তিগত মর্যাদাকে আঘাত করে এমন কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন মহল।
ঘটনাটি সামনে আসতেই রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বিরোধী শিবিরের সঙ্গে যুক্ত কিছু সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকেই এই ধরনের কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে। যদিও এই অভিযোগ নিয়ে সরাসরি কোনও দল আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার করেনি। তবুও ভোটের মুখে এমন আক্রমণকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক পরিবেশ। নাগরিক সমাজের একাংশের বক্তব্য, মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ বা লিঙ্গবিদ্বেষমূলক কটাক্ষ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থী। বিশেষ করে একজন মহিলা নেত্রীকে উদ্দেশ্য করে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মিম ছড়ানোকে তারা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলেই মনে করছেন।
বিনোদন জগত থেকেও এসেছে প্রতিবাদের সুর। অভিনেতা অরিত্র দত্ত বণিক এবং অভিনেত্রী অনন্যা চট্টোপাধ্যায়-সহ একাধিক টলিউড ব্যক্তিত্ব এই ঘটনার নিন্দা করেছেন। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকলেও সেই সমালোচনা কখনওই এমন পর্যায়ে নামা উচিত নয়, যা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অরিত্রর বক্তব্য, ‘সমালোচনা আক্রমণ মিম ট্রোল ইত্যাদি কখনোই সেই জায়গায় নামানো উচিৎ নয় যা সমাজকে ধ্বংস করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পছন্দ নয়, ভোট দেবেন না তৃণমূল বাদে অন্য অনেক বোতাম ইভিএমে পাবেন। যাকে খুশি ভোট দেবেন। কাউকে না পোষালে নোটাতে দেবেন। আইন সেই অপশানও দিয়েছে নাগরিককে। তৃণমূল আসার আগেও পৃথিবী চলতো তৃণমূল না থাকলেও চলবে। কিন্তু ক্যারিকেচারের নামে যে মুখ্যমন্ত্রীর যে চিত্র ছড়ানো হচ্ছে তা অসভ্যতা এবং অসুস্থ মানসিকতার পরিচয়। আমি শুধু দেখছি নির্বাচন কমিশনের আওতায় থাকা পুলিশ বিভাগ বিশেষত সাইবার সেল আর কতক্ষণ ঘুমিয়ে থাকে।’ কারও নজরে ছবিটি পড়লে সেটা ডিলিট করার অনুরোধ করেছেন।
অন্যদিকে অভিনেত্রী রূপাঞ্জনা মিত্র ইন্ডাস্ট্রির সহকর্মী ও বিরোধী দলের সদস্য রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, পাপিয়া অধিকারী, শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের উদ্দেশে প্রশ্নবাণ, একজন মহিলা হিসেবে এই মিমটি নিয়ে কী প্রতিক্রিয়া। পরিচালক-অভিনেত্রী মানসী সিনহা, ছবি নির্মাতা প্রদীপ্ত ভট্টচার্য সাইকোলজিস্ট রত্নাবলী রায়ের একরটি পোস্ট শেয়ার করে এই মিমের তীব্র বিরোধীতা করেছেন। পরিচালক পারমিতা মুন্সীর মতে, ‘যখন রাজনৈতিক বিরোধিতা বিকৃত হয়ে যৌন বিদ্রূপে পরিণত হয়, তখন গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় অশালীনতার অবক্ষয় প্রত্যক্ষ করি। যেমনটা আজ মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর ব্যঙ্গচিত্রর দেখলাম। এই কদর্যতাকে ব্যঙ্গ বলা যায় না, রাজনীতির ভাষায় এগুলো একধরনের সিম্বলিক ভায়োলেন্স। সেখানে যৌন হয়রানি একটা মাধ্যম।’ ক্ষোভ উগরে দিয়ে আর কী লিখলেন?
অভিনেত্রী অনন্যা চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তিনি মিমটি নিজের চোখে দেখেননি আর দেখার ইচ্ছেও নেই। রাজনৈতিক মত আলাদা হলেও সর্বপ্রথম একজন মানুষ, তারপর একজন মহিলা। তাই নারীজাতির প্রতি এই ধরণের অপমান, কদর্যতা কখনই মেনে নিতে পারেন না। রাজনীতি সম্পর্কে খুব বেশি না বুঝলেও বাংলার রুচিবোধ, শিক্ষা, আদর্শ, সংস্কৃতির বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন। তাই সেই মূল্যবোধের শিক্ষা থেকেই প্রতিটি ইন্দ্রিয় যেন তপ্ত হয়ে উঠছে। পোস্টের শেষে ধিক্কার জানিয়েছে লিখছেন, ‘ধিক ধিক ধিক!’ অভিনেত্রী রূপালি রাই ভট্টাচার্যও একজন নারী হিসেবে মমতার সমর্থনে লিখেছেন, ‘আমি ওঁর অনুগামী নই কিন্তু সাংবিধানিক চেয়ার তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মহিলা হিসেবে সম্মান করতে আমি বাধ্য। শুধু আমি নয় সবাই বাধ্য। যে নোংরামি হচ্ছে তার প্রতি ঘৃণা জানাই। আর যারা এই কাজ করেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কোনও মানুষের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ক্ষোভপ্রকাশের এই পদ্ধতি শুধু অশিক্ষা নয়, বিকৃতির লক্ষণ ।’ সব মিলিয়ে, নির্বাচন পর্বে এমন বিতর্ক নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—রাজনৈতিক লড়াইয়ের সীমারেখা কোথায় টানা উচিত এবং সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার কতটা দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।
