
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: এক সময় তরুণ বয়স মানেই ছিল নিশ্চিন্ত ঘুম। রাত জাগা, ভোরে ওঠা, অনিয়ম— এসবে কিছু যেত আসত না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ছবিতে বড় বদল এসেছে। শহরের তরুণ চাকুরেদের একটি বড় অংশ এখন অনিদ্রার সমস্যায় ভুগছেন। কারও ঘুম আসতে দীর্ঘ সময় লাগে, কেউ আবার মাঝরাতে বারবার জেগে ওঠেন। সকালে অ্যালার্ম বাজার সঙ্গে সঙ্গেই উঠে পড়লেও শরীর থাকে ক্লান্ত, মন থাকে অবসন্ন। সারাদিনের কর্মচাঞ্চল্য টিকিয়ে রাখতে ভরসা রাখতে হয় একের পর এক চা বা কফির কাপে। চিকিৎসকদের মতে, অনেকেই এই সমস্যাকে সাময়িক চাপ বা অফিসের স্ট্রেস বলে উড়িয়ে দেন। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি অনেক গভীর। ঘুম কেবল শরীরের বিশ্রাম নয়, এটি আমাদের জৈবিক ঘড়ি ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক ছন্দের প্রতিফলন। যখন কাজের চাপ, রাত জাগা, মোবাইল বা ল্যাপটপের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং অনিয়মিত জীবনযাপন সেই স্বাভাবিক ছন্দের বিরুদ্ধে যায়, তখন শরীর ধীরে ধীরে নিজের স্বাভাবিক ভারসাম্য হারাতে শুরু করে।
* কেন বাড়ছে অনিদ্রা: আধুনিক জীবন মস্তিষ্ককে বিশ্রামের সুযোগ দেয় না। সারাদিন কাজের চাপ, নোটিফিকেশনের বন্যা, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ— সব মিলিয়ে মন সবসময় সক্রিয় থাকে। বিশেষজ্ঞরা অনিদ্রাকে আলাদা অসুখ হিসেবে দেখতে রাজি নন; বরং এটা সারাদিনের অনিয়মের ফল। দেরিতে খাওয়া, দেরিতে ঘুম, অতিরিক্ত চিন্তা, অনিয়মিত রুটিন— এগুলো শরীরের স্বাভাবিক ছন্দকে তছনছ করে দেয়। ফলে এমন অবস্থা তৈরি হয়, যেখানে শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মন সতর্ক। স্নায়ুতন্ত্র জেগে থাকে, আর ঘুম দূরে সরে যায়।
* স্ক্রিনটাইমের প্রভাব: রাতে মোবাইল বা ল্যাপটপের নীল আলো শরীরের জৈবিক ঘড়িকে বিভ্রান্ত করে। এই আলো মেলাটোনিন হরমোনের ক্ষরণ কমায়, যা স্বাভাবিক ঘুমের জন্য প্রয়োজন। বিছানায় শুয়ে স্ক্রল করা বা সিরিজ দেখা মস্তিষ্ককে সংকেত দেয় যে দিন এখনও শেষ হয়নি। শরীর নির্দিষ্ট ছন্দে চলতে চায়। নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া, কাজ আর ঘুম হলে হজমশক্তি ও হরমোনের ভারসাম্য ঠিক থাকে। সময় বারবার বদলালে হজম দুর্বল হয়, স্নায়ুতন্ত্রও শান্ত হতে পারে না। রাতে ভারী খাবার খাওয়া বা একেবারে না খেয়ে থাকা, দুটোই ঘুমের গুণমান খারাপ করে।
* জোর করে ঘুম মানেই সমাধান নয়: অনেকে ঘুমের ওষুধ বা অ্যালকোহলের সাহায্য নেন। এতে হয়তো ঘুম আসে, কিন্তু সেই ঘুম সবসময় ভাল ঘুমে পরিণত হয় না। প্রকৃত বিশ্রাম শরীরের কোষ মেরামত করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখে। কৃত্রিমভাবে আনা ঘুমে অনেক সময় সেই সতেজতা আসে না। দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি হলে বিপাকক্রিয়া, মানসিক স্বাস্থ্য, মনোযোগ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় তার প্রভাব পড়ে।
* কিছু সহজ অভ্যাস:
সমাধান জটিল নয়, নিয়মিত ছোট পদক্ষেপই বড় পরিবর্তন আনে—
১. নির্দিষ্ট সময়ে শোয়া ও ওঠা।
২. রাতে হালকা ও তাড়াতাড়ি খাবার খাওয়া।
৩. ঘুমের অন্তত একঘণ্টা আগে স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা।
৪. ঘুমের আগে বই পড়া, মেডিটেশন, হালকা স্ট্রেচিং বা পায়ে উষ্ণ তেল মালিশ স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে।
৫. গরম কোনও পানীয়, ধীরে শ্বাস নেওয়ার অনুশীলনও উপকারী।
৬. রাতে কাজ যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলাই ভাল।
৭. নিয়মানুবর্তিতা শরীরকে আবার নিজের ছন্দে ফিরতে সাহায্য করে।
* কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি: মাঝে মাঝে ঘুম না হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু যদি দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকে, মাঝরাতে বারবার ঘুম ভাঙে, দিনে অকারণে ক্লান্ত লাগে বা অতিরিক্ত ক্যাফেইনের উপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে তা অন্য কোনও অন্তর্নিহিত সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। উদ্বেগ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা বা হজমের গোলমাল এর পেছনে থাকতে পারে। শুরুতেই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিলে কারণ চিহ্নিত করা সহজ হয়। অনেকেই ভাবেন পরে ঘুম পুষিয়ে নেবেন। কিন্তু শরীর প্রতিটি অনিয়মের হিসাব রাখে। বিশ্রাম কোনও বিলাসিতা নয়, এটি সুস্থ জীবনের মৌলিক শর্ত।
