
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ২৫ বছর পূর্ণ করেছেন নরেন্দ্র মোদি। এই উপলক্ষে দিল্লিতে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আগামী ভারতের জন্য একাধিক লক্ষ্য তুলে ধরলেন তিনি। মোদির বক্তব্য, ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য পূরণ করা হবে। একই সঙ্গে আত্মনির্ভর ভারত গড়ার লক্ষ্যও অর্জন করা সম্ভব হবে বলে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। নিজের বক্তব্যে সেই প্রত্যয়ের কথাই তুলে ধরে ‘উই উইল ডু ইট’ স্লোগান দেন মোদি। অর্থাৎ, লক্ষ্যপূরণে ভারত সফল হবেই বলে বার্তা দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে উঠে আসে বিকশিত ভারত গড়ার পরিকল্পনার পাশাপাশি মহাকাশ গবেষণা, প্রতিরক্ষা এবং ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রকে আরও শক্তিশালী করার প্রসঙ্গও।
বুধবার ‘উন্নত ভারত সংকল্প সভা’য় বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, “২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আমি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেই, তখন কল্পনাও করিনি যে একদিন প্রধানমন্ত্রী হব। এবং টানা ২৫ বছর সরকারের প্রধান হিসেবে এই মাইলফলক ছোঁব। দেশের মানুষের ভালোবাসার জন্যই এটা সফল হয়েছে। দেশবাসীর প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।” মোদি আরও বলেন, “আমার জীবনে কোনও ঘটনাই বৃথা যায়নি। যারা আমায় জিতিয়েছেন, “তাঁরা বিনয়ী হতে শিখিয়েছেন। যারা হারিয়েছেন, তাঁরা ফের উঠে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন। শুভাকাঙ্খীরা উৎসাহিত করেছেন, আর সমালোচকরা আত্মসমালোচনার সুযোগ দিয়েছেন। প্রতিটি সংকটে ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়েছি। প্রতিটি সাফল্য দায়িত্ব বাড়িয়েছে, আরও বড় লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার সাহস যুগিয়েছে।” এদিনের ভাষণে দেশের উন্নতির পথে ৬টি লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেন মোদি। যেগুলি হল, ১. ২০৪৭-এর মধ্যে বিকশিত ভারত। স্বাধীনতার ১০০ বছরে ভারতকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা। ২. বিশ্বের সেরা তিন অর্থনীতির দেশে পরিণত করা হবে ভারতকে। ৩. আত্মনির্ভর ভারতের লক্ষ্যে প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশকে স্বাবলম্বী করে তোলা। ৪. ভারতকে ম্যানুফ্যাকচারিং হাবে পরিণত করা। উৎপাদন শিল্পে ভারত হয়ে উঠবে বিশ্বের প্রধান কেন্দ্র। ৫. মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ভারতের আধিপত্য আরও মজবুত করা এবং ৬. ভারতে বিশ্বমানের অলিম্পিক গেমস আয়োজন।
বুধবার বেলা ১০টার পরে দিল্লি ইন্দিরা গান্ধী স্টেডিয়াম থেকে জনতার উদ্দেশে ভাষণ শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী। বক্তব্যের বিভিন্ন সময় আবেগপ্রবণ হয়েছেন মোদি। আবার পরক্ষণেই দেশের উন্নতিতে কঠিন বার্তা দেওয়ার সময় তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। ভাষণের শুরুতেই দেশবাসীকে মাথানত করে প্রণাম জানান তিনি। ‘উই উইল ডু ইট’ স্লোগানও দেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেকে বরাবরই শিক্ষার্থী মনে করেন। সবসময়ই তিনি শিখছেন। “শেখার শক্তই যেন কখনও কম না হয়।” সেই কথা শোনা গিয়েছে তাঁর কণ্ঠে। করোনা পরিস্থিতি থেকে মাওবাদি দমন, জঙ্গি দমন ইস্যুতে পাকিস্তানকে ‘শিক্ষা’ দেওয়ার বার্তা উঠে এসেছে মোদির বার্তায়। ভারতের উন্নতি, দেশের মানুষের বিকাশ, আধুনিক ভারত তৈরিই লক্ষ্য। ‘বিকশিত ভারতে’র লক্ষ্যে সবসময় তিনি কর্মে নিযুক্ত। কখনও ফলের আশা না করে কর্ম করে যাওয়াই তাঁর সংকল্প। নিজেকে দেশের ‘সেবক’ বলে আরও একবার পরিচয় করিয়ে এই বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী। ভারতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। রাষ্ট্রসমৃদ্ধি, আত্মনির্ভরতার বার্তা দিলেন নরেন্দ্র মোদি। তাঁর কথায়, “প্রতিবার জনতা সেবক হিসেবে আমাকে বেছে নিয়েছে। ২০০১ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যখন শপথ নিয়েছিলাম, তখন ভাবতে পারিনি, কখনও এই পর্বে আসব। সবই জনতা-জনার্দনের আর্শীবাদের ফল।”
এদিন সকালে দিল্লির সরোজিনী নগরের শ্রীবিনায়ক মন্দিরে পুজো দেন মোদি। সোশাল মিডিয়ায় সেই ছবি দিয়ে তিনি লেখেন, ‘আমি শ্রী গণেশের কাছে দেশের সবার সুস্বাস্থ্য কামনা করেছি। বিঘ্নহর্তার আশীর্বাদে দেশ উন্নতির পথে এগিয়ে যাবে।’ মোদি বলেন, “আমাদের হৃদয়ে একটাই সংকল্প থাকা উচিত, আমাদের ভারতের প্রাচীন গৌরব ফিরিয়ে আনতে হবে। যে ভারত একসময় বিশ্বের অর্থনীতির নেতৃত্ব করত। যে ভারতকে গোটা বিশ্ব দেখে অবাক হত। কিন্তু সময়ের চাকা বদলে যায়। পরাধীনতায় জর্জরিত হয়ে আমরা পিছিয়ে গিয়েছি। ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অভাব, দুর্ভিক্ষ, বিদেশি আক্রমণ আমাদের সম্মান ও গৌরবে আঘাত হেনেছে। কিন্তু মা ভারতীর সন্তানদের সাহস নষ্ট হয়নি। নতুন কোনও মহাপুরুষ আমাদের পথ দেখিয়েছেন।” তারপর বাংলার দুই মনীষীর বাণী উল্লেখ করে তিনি বলেন, “স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, একদিন গৌরবশালী ও মহান ভারতের উদয় হবে। মহর্ষি অরবিন্দ বলেছিলেন, ভারতের গৌরব সূর্য আবার একদিন উঠবে। যা গোটা বিশ্বকে আলোকিত করবে। অদম্য সাহস নিয়ে আমাদের পূর্বসূরীরা এগিয়ে গিয়েছেন। আমরা তাঁদের অগ্নিসন্তান। আজ আমাদের দেশ সেই সাহসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই আমাদের আজ বড় লক্ষ্য সামনে রাখতে হবে। সেটাই বিকশিত ভারতের লক্ষ্য। আমাদের অর্থনীতিকে সেরা তিনে নিয়ে আসতে হবে। ড্রাগমুক্ত ভারত গড়ে তুলতে হবে। পর্যটন, স্বাস্থ্য বা শিক্ষায় যেন শুধু ভারতের কথা হয়। গোটা বিশ্বে ভারতের প্রযুক্তির কথা হবে।”
বুধবার দিল্লিতে ‘উন্নত ভারত সংকল্প সভা’য় বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, “আজ ৩৭০ ধারা অতীত হয়েছে। নকশালদের কোমর ভেঙে গিয়েছে।” অতীতের প্রসঙ্গ টেনে মোদি বলেন, ‘একটা সময় সন্ত্রাসীরা নির্ভয়ে দেশে ঘুরে বেড়াত। একের পর এক সন্ত্রাসবাদী হামলা হলেও কোনও সুরাহা ছিল না। মানুষ ধরেই নিয়েছিল এর সমাধান নেই। তবে এখন সময় বদলে গিয়েছে। জঙ্গিদের কোমর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এখন এক শক্তিশালী ভারত দেখছে বিশ্ব। যেখানে আমরা ঘরে ঢুকে মেরেছি। নতুন ভারতে সন্ত্রাসের কোনও জায়গা নেই।’ কারও নাম না নিলেও এই বার্তা যে পাকিস্তানের উদ্দেশে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “আগে বিশ্বে কোথাও সংকট এলে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ত। কিন্তু এখন সময় বদলে গিয়েছে।”
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারত আজ এভাবেই নিজের পায়ের নিচে জমি শক্ত করেছে, হয়ে উঠেছে আত্মনির্ভর। সেই সশক্তিতে আরও বলীয়ান হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে দেশ। তাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন ভারতের পাইলট স্মিত মচ্ছর, যে নাম এখন গোটা বিশ্বে চর্চিত। উড়ান শিল্পে ভারতকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে সেই স্মিতকে ঘিরে নতুন স্বপ্ন দেখছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। বুধবার প্রশাসক মোদির ২৫ বছর উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি বললেন, ‘‘আজ ভারতের পাইলটকে নিয়ে চর্চা হচ্ছে, কাল মেড ইন ইন্ডিয়া বিমান নিয়ে কথা হবে। নতুন গতিতে, আরও বড় লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হবে।” ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসার পর নরেন্দ্র মোদির ‘আত্মনির্ভর ভারতে’র স্বপ্ন পূরণ হয়েছে অনেকটাই। গত ১২ বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈদেশিক নির্ভরতা কমেছে। এর সবচেয়ে বড় সাফল্য করোনা মহামারীর ভ্যাকসিন তৈরি। এছাড়া প্রতিরক্ষা খাতে অর্থাৎ বিভিন্ন সমরাস্ত্র তৈরিতে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে ভারত। এই সবই সম্ভব হয়ে নরেন্দ্র মোদির নিবিড় প্রচেষ্টা আর পরিশ্রমে। এবার তাঁর লক্ষ্য, মেড ইন ইন্ডিয়া মডেলকে অনুসরণ করে নিজস্ব বিমান তৈরি। দেশকে আরও বেশিদিন নেতৃত্ব দিতে চেয়ে প্রধানমন্ত্রী সেই লক্ষ্যের কথা প্রকাশ করলেন।
We will do it! https://t.co/8hlrL3gOsY
— Narendra Modi (@narendramodi) October 7, 2026
