
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: কিছু দিন আগে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সমস্ত স্মার্টফোনগুলিকে আদেশ দিয়ে জানানো হয়েছে সমস্ত নতুন স্মার্টফোনে Sanchar Saathi অ্যাপ ইনস্টল করে দিতে হবে। তবে সাধারণ মানুষ এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রাইভেসি ও নজরদারি নিয়ে জোরদার সমালোচনা করেছে এবং এর পর সরকারের পক্ষ থেকে আদেশ বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে এই অ্যাপটি অপশনাল হিসাবে থাকবে। সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে এই আদেশের পর অ্যাপটির জনপ্রিয়তা বিপুল হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মাত্র এক দিনে 6 লক্ষ নতুন রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। তাই জোর করে আর এই অ্যাপ ইনস্টল করার প্রয়োজন নেই।
দেশের দূর সঞ্চার বিভাগের (DoT) একটি সুরক্ষা অ্যাপ এবং ওয়েব পোর্টাল হল Sanchar Saathi। সাধারণ মানুষকে সাইবার ফ্রড, ফোন চুরি এবং জাল কল/ম্যাসেজের মতো সমস্যাগুলি থেকে বাঁচানোর জন্য 2023 সালে এই অ্যাপটি লঞ্চ করা হয়েছিল। অ্যাপের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ তাদের ফোন নাম্বার পরীক্ষা করতে পারবেন, তাদের নামে কোনো অচেনা নাম্বার রেজিস্টার থাকলে সেটি রিপোর্ট করতে পারবেন এবং চুরি যাওয়া ফোনের IMEI ব্লক করতে পারবেন। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই অ্যাপে 1.4 কোটির চেয়েও বেশি ইউজার রয়েছে এবং প্রতিদিন প্রায় 2,000 সাইবার ফ্রড রিপোর্ট হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে প্রথমে জানানো হয়েছিল, এই অ্যাপটি প্রতিটি ফোনে ইনস্টল থাকতে হবে এবং ইউজাররা এটি ডিলিটও করতে পারবেন না। এই কারণেই বিতর্কের সৃষ্টি হয়। Apple এর মতো নামজাদা কোম্পানি এই ধরনের আগে থেকে ইনস্টল করা আলরিমুভেবল অ্যাপের সমর্থন করে না এবং তাই কোম্পানিগুলিও চিন্তিত ছিল। অপরদিকে বিভিন্ন ডিজিটাল রাইট সংস্থার মতে এর ফলে ইউজারদের প্রাইভেসি এবং ফোনের কন্ট্রোলে হস্তক্ষেপ পড়বে। পরে সরকারের তরফ থেকে স্পষ্ট জানানো হয় এই অ্যাপ শুধুমাত্র সুরক্ষার জন্য দেওয়া হবে এবং ইউজাররা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী যখন ইচ্ছা আনইনস্টল করতে পারবেন।
Sanchar Saathi অ্যাপের ফিচার:
‘Chakshu’ ফিচার: এই অ্যাপের মাধ্যমে ইউজাররা কোনো সন্দেহজনক কল, SMS বা WhatsApp ম্যাসেজ রিপোর্ট করতে পারবেন। যেমন – জাল KYC অ্যালার্ট, পরিচয় গোপন করে স্ক্যাম বা ফিশিং লিঙ্ক। এই ফিচার আধিকারিকদের ফ্রডের প্যাটার্ন বুঝতে সাহায্য করে। তবে কারোর সঙ্গে আর্থিক জোচ্চুরি হয়ে গেলে 1930 নাম্বারে কল করে বা cybercrime.gov.in ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারবেন।
স্প্যাম এবং অপ্রয়োজনীয় কমার্শিয়াল কলের রিপোর্ট: যেসব কল এবং ম্যাসেজ TRAI এর নিয়ম উলঙ্ঘন করে সেগুলির অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন। সাত দিনের মধ্যে অভিযোগ করা হলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
বিপজ্জনক লিঙ্ক এবং অ্যাপের রিপোর্ট: এই ফিচারের মাধ্যমে ইউজাররা ফিশিং লিঙ্ক, অসুরক্ষিত APK ফাইল এবং ফ্রড ওয়েবসাইটের রিপোর্ট করতে পারবেন। এর ফলে দ্রুত সাইবার ক্রাইম চিহ্নিত করা সম্ভব এবং সময় মতো আধিকারিকরা উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবেন।
নিজের নামে যুক্ত মোবাইল নাম্বার পরীক্ষা: এই ফিচার ব্যাবহার করে ইউজাররা চেক করতে পারবেন তাদের নামে কতগুলি ফোন নাম্বার রেজিস্টার রয়েছে। এর ফলে জানা যাবে নিজের নামে অজ্ঞাতসারে কোনো নাম্বার থাকলে সেটি দেখা এবং রিপোর্ট করা যায়।
হারানো বা চুরি যাওয়া ফোন ব্লক: এই ফিচারের মাধ্যমে ইউজাররা তাদের হারানো বা চুরি যাওয়া ফোনের IMEI ব্লক করতে পারবেন, যাতে ফোনটি কেউ ব্যাবহার করতে না পারে। ফোন খুঁজে পেলে IMEI আনব্লকও করা যাবে।
ফোনের সত্যতা যাচাই: এই ফিচারের মাধ্যমে IMEI চেক করে ইউজাররা জানতে পারবেন ফোনটি আসল না কি নকল। পুরনো ফোন কেনার সময় এই ফিচার যথেষ্ট উপযোগী।
ভারতীয় নাম্বারের মতো দেখতে আন্তর্জাতিক স্ক্যাম কলের রিপোর্ট: কিছু স্ক্যামারদের ইন্টারন্যাশনাল কল নাম্বার +91 দিয়ে শুরু হয়। Sanchar Saathi অ্যাপে এইসব নাম্বার রিপোর্ট করা যায়।
কোনো এলাকায় ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারের তথ্য: এই অ্যাপের সাহায্যে ইউজাররা তাদের PIN কোড, ঠিকানা বা প্রোভাইডারের নাম দিয়ে তাদের এলাকায় কোন কোন ওয়্যার্ড ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার রয়েছে সেই তথ্য দেখতে পারবেন।
বিশ্বস্ত কন্ট্যাক্ট এবং হেল্পলাইন নাম্বার যাচাই: অ্যাপে একটি সুরক্ষিত ডাইরেক্টরি দেওয়া হয়েছে। এখানে ইউজাররা ব্যাঙ্ক এবং অন্যান্য বড় সংস্থার সঠিক কাস্টোমার কেয়ার নাম্বার, ইমেইল এবং ওয়েবসাইট ডিটেইলস পাবেন।
কেন সরকার প্রিলোড করাতে চায়?
ভারতে মোবাইল ফ্রডের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে চলেছে এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে চুরি যাওয়া মোবাইল ফোন ব্যাবহার করা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে Sanchar Saathi অ্যাপের মাধ্যমে ইতিমধ্যে 7 লক্ষের চেয়েও বেশি হারানো বা চুরি যাওয়া মোবাইল খোঁজা সম্ভব হয়েছে। শুধুমাত্র গত অক্টোবর মাসেই 50,000 ফোন রিকভার করা হয়েছে। এত বড় সংখ্যা দেখে সরকার চেয়েছিল যত বেশি সম্ভব মানুষ এই অ্যাপটি ব্যাবহার করুক এবং সাইবার ফ্রডের হাত থেকে সুরক্ষিত থাকুক।
কোন কোন পারমিশন চায় এই অ্যাপ?
Android ফোনে ইনস্টল করার সময় এই অ্যাপটিকে কল লগ, ক্যামেরা, SMS, ফোন কল এবং নোটিফিকেশনের মতো পারমিশন দিতে হয়। এর সঙ্গে ইন্টারনেট কানেকশন প্রয়োজন। কল এবং ম্যাসেজ সংক্রান্ত সুরক্ষা ফিচার সঠিকভাবে কাজ করবে জন্য এইসব পারমিশন প্রয়োজন।
কোথা থেকে ডাউনলোড করবেন Sanchar Saathi অ্যাপ?
অত্যন্ত সহজেই Sanchar Saathi অ্যাপ ডাউনলোড করা যায়। অ্যান্ড্রয়েড ফোনের জন্য গুগল প্লে স্টোর এবং আইফোনের জন্য অ্যাপেল অ্যাপ স্টোরে এই অ্যাপ রয়েছে। স্টোর অ্যাপ ওপেন করে দূর সঞ্চার বিভাগ (DoT) এর Sanchar Saathi সার্চ করতে হবে এবং অন্য সব অ্যাপের মতোই ডাউনলোড করতে হবে।
কিভাবে রেজিস্টার করবেন?
ডাউনলোডের পর Sanchar Saathi অ্যাপ সেটআপ করা খুবই সহজ। অ্যাপ ওপেন করে প্রথমে মোবাইল নাম্বার দিতে হবে। এরপর সেই নাম্বারে আসা ওটিপি এন্টার করতে হবে। নাম্বার ভেরিফিকেশন হয়ে গেলে অ্যাপের ড্যাশবোর্ড দেখা যাবে এবং সমস্ত সুরক্ষা ফিচার ব্যাবহার করা যাবে।
Sanchar Saathi অ্যাপ কি কি করতে পারে?
ভারতীয় স্মার্টফোন ইউজারদের জন্য একটি সুরক্ষা কিট হিসাবে Sanchar Saathi অ্যাপ তৈরি করা হয়েছে।
এই অ্যাপে Know Your Mobile (KYM) ফিচার রয়েছে, এখানে কোনো ফোনের IMEI নাম্বার দিয়ে চেক করা যাবে সেটি আসল, চুরির রিপোর্ট করা আছে না কি ব্ল্যাকলিস্ট করা আছে। অন্য আরেকটি ফিচার ব্যাবহার করে জানা যায় ইউজারদের নামে কয়টি ফোন নাম্বার রেজিস্টার রয়েছে। ফলে কারোর নামে যদি অচেনা নাম্বার রেজিস্টার থাকে সেটি রিপোর্ট করা যায়।
কারোর ফোন হারিয়ে গেলে বা চুরি হয়ে গেলে সেটির IMEI ব্লক করা যায়, ফলে কেউ সেই ফোনে নেটওয়ার্ক ব্যাবহার করতে পারবেন না।
অ্যাপের Chakshu ফিচারের সাহায্যে ইউজাররা ফ্রড কল, স্প্যাম ম্যাসেজ বা ফিশিং লিঙ্কের রিপোর্ট করতে পারবেন। ফলে সাইবার ফ্রডে ব্যাবহৃত +91 এর মতো দেখতে ইন্টারন্যাশনাল কলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।
Sanchar Saathi একটি যথেষ্ট উপযোগী এবং সুরক্ষা সম্পর্কিত অ্যাপ। তবে এটিকে বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের পছন্দ হয়নি। সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তা দেখে সরকার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে এবং বর্তমানে এই অ্যাপ সম্পূর্ণ অপশনাল। যারা ফোন চুরি, জাল কল, ফিশিং লিঙ্ক বা ইউজারের নামে ভুল নাম্বার সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা থেকে সুরক্ষিত রাখতে চান তাঁরা এই অ্যাপ ব্যাবহার করতেই পারেন।
