দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: দলের সুসময়ে নন্দীগ্রাম থেকে শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে বিধানসভা নির্বাচনে লড়াই করেছিলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে সেই আসনে পরাজিত হন তিনি। এবার নন্দীগ্রামে উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে ফের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রার্থী হওয়া নিয়ে দলের অন্দরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বুধবার কার্যত দলনেত্রীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন ‘কালীঘাটপন্থী তৃণমূল’-এর নেতা আবু তাহের। তাঁর অভিযোগ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলের স্থানীয় নেতৃত্ব বা কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা না করেই প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
আবু তাহেরের বক্তব্য, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের নাম নিজেই ঘোষণা করেছিলেন। অথচ নন্দীগ্রামের স্থানীয় কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন ও রাজনৈতিক লড়াই করে আসছেন। সেই প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, বাম আমল থেকেই তাঁরা নন্দীগ্রামে রাজনৈতিকভাবে লড়াই করে আসছেন। পরবর্তীকালে বিজেপির তরফেও তাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করা হয়েছে বলে দাবি তাঁর। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁদের বিরুদ্ধে কমপক্ষে একশোটি মামলা রয়েছে। এত কিছু সত্ত্বেও দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করেননি। আবু তাহেরের কথায়, “২০২১ সালে নিজেই নিজের নাম ঘোষণা করে দিয়েছেন। আমরা আন্দোলন করেছি। আমরা বাম আমল থেকে লড়াই করেছি। পরবর্তীকালে বিজেপিও একাধিক মামলা দিয়েছে। কমপক্ষে ১০০টি মামলা রয়েছে। তা সত্ত্বেও আমাদের সঙ্গে কথা বলেননি। তখন দলের সুদিন ছিল। এখন দলের দুর্দিন। এখন নিজে দাঁড়ান।” তাঁর এই বক্তব্যকে ঘিরেই তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে।
ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকেই তৃণমূলের সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। দলের অন্দরমহল কার্যত দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। একদিকে রয়েছে ‘কালীঘাট তৃণমূল’, অন্যদিকে ‘ঋতব্রত শিবির’। দলের আসল নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, দলের নাম ও নির্বাচনী প্রতীক কোন গোষ্ঠীর দখলে থাকবে, তা নিয়েও টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে তৃণমূলের প্রতীকে শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষ প্রার্থী দেবে, তা নিয়েও দলের ভিতরে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনকে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। প্রার্থী নির্বাচন প্রসঙ্গে আগেই তৃণমূলকে কটাক্ষ করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনে প্রার্থী বাছাইয়ের বিষয়টি নিয়েই তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন। তবে শুভেন্দু অধিকারীর সেই বক্তব্যের পর ‘কালীঘাটপন্থী তৃণমূল’-এর তরফে পালটা কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এবার দলেরই এক নেতার বক্তব্য সামনে আসায় পরিস্থিতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এরই মধ্যে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার পর মঙ্গলবার সর্বদলীয় বৈঠক ডাকেন পূর্ব মেদিনীপুরের জেলাশাসক নিরঞ্জন কুমার। প্রশাসনের ডাকা ওই বৈঠকে জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু সেখানে তৃণমূলের তরফে কোনও প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না বলে জানা গিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এই অনুপস্থিতি ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে তৃণমূল আদৌ প্রার্থী দেবে কি না, তা নিয়েই এখন রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। দলের প্রতীক ও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যখন অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন চলছে, তখন নন্দীগ্রামের মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন পক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবু তাহেরের মন্তব্য এবং সর্বদলীয় বৈঠকে তৃণমূলের অনুপস্থিতি সেই জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে।
ফলে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচন শুধু একটি আসনের নির্বাচন হিসেবেই নয়, তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক পরিস্থিতিরও পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। দলীয় প্রতীক, প্রার্থী নির্বাচন এবং নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব নন্দীগ্রামের ভোটে কতটা পড়ে, এখন সেটাই দেখার। আপাতত সব নজর তৃণমূলের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে।