
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: রাজ্যের মন্ত্রী তথা বিধাননগরের বিজেপি বিধায়ক শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের ‘বিধায়ক দরবারে’ আচমকাই হাজির হলেন রাজারহাট-নিউটাউনের বিজেপি বিধায়ক পীযূষ কানোরিয়া। সেখানেই শারদ্বতের সঙ্গে প্রকাশ্যে বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। শারদ্বতের উদ্দেশে গলা চড়িয়ে কথা বলার পাশাপাশি আঙুল তুলে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করতেও দেখা যায় পীযূষকে। তোলাবাজি এবং সিন্ডিকেট নিয়ে শারদ্বতের সামনে একের পর এক অভিযোগ ও ক্ষোভ উগরে দেন পীযূষ। দমদম পার্কে দুই বিজেপি বিধায়কের এই প্রকাশ্য বাক্বিতণ্ডার ঘটনায় রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে চর্চা। ঘটনাকে ঘিরে অস্বস্তিতে পড়েছে রাজ্যের শাসকদলও।
মঙ্গলবার নিজের বিধানসভা এলাকায় দক্ষিণ দমদম পুরসভার ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে বিধায়ক দরবারে বসেছিলেন শারদ্বত। রাত পৌনে ৮টা নাগাদ বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকে তিনি যখন এলাকার মানুষের অভিযোগপত্র পড়ছিলেন হঠাৎই সেখানে উপস্থিত হন পীযূষ। মঞ্চের সামনে যেখানে সাধারণ মানুষ বসেছিলেন সেখানে বসে পড়েন তিনি। পীযূষের এ ভাবে শারদ্বতের ‘বিধায়ক দরবারে’ উপস্থিত হওয়ায় প্রাথমিক ভাবে কিছুটা অবাক হন অনেকেই। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন মন্ত্রী। শারদ্বত বলেন, ‘‘আমাদের মধ্যে পার্শ্ববর্তী বিধানসভার বিধায়ক পীযূষ কানোরিয়া উপস্থিত হয়েছেন। পীযূষদা, আপনি মঞ্চে উঠে আসুন।’’ পীযূষ তখন বলেন, ‘‘আমি অন্য বিধানসভার বিধায়ক, এটা আপনি বলতে পারেন না।’’
অশান্তির সূত্রপাত সেখানেই। যদিও পরে শারদ্বতের অনেক অনুরোধের পর তাঁর পাশের চেয়ারে গিয়ে বসেন পীযূষ। কিন্তু তাতেও যে পরিস্থিতি ঠিক হয়নি, তা বুঝতেই পারছিলেন উপস্থিত সকলে। থমথমে মুখ নিয়ে শারদ্বতের পাশে বসেছিলেন পীযূষ। বৈঠক চলাকালীন শারদ্বত কয়েকটি চিঠি পড়ে শোনান। সেই সব চিঠিতে সিন্ডিকেট এবং তোলাবাজির অভিযোগ ছিল। বেশির ভাগ চিঠিই ছিল বেনামি। অভিযোগপত্রগুলি পড়ার পরে শারদ্বত স্পষ্ট জানান, সব অভিযোগই গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে। নির্মাণসামগ্রী কেনার ব্যাপারে স্বাধীনতা রয়েছে এলাকার মানুষের। সেখানে কারও কিছু বলার থাকতে পারে না। শারদ্বতের বার্তা, ‘‘এখন বদলের সরকার। আপনারা সরকার বদলে দিয়েছেন। আমরা বলছি, ভয় আউট ভরসা ইন। না খাব, না কাউকে খেতে দেব। কাউকে ভয় পাওয়ার দরকার নেই। তৃণমূল জমানায় এ সব হত।’’
তোলাবাজি এবং সিন্ডিকেট আটকানো নিয়ে মন্ত্রীর বার্তার সূত্র ধরে সভাশেষে পীযূষ মাইক্রোফোন নিয়ে উচ্চস্বরে বলতে শুরু করেন। ততক্ষণে তিনি মঞ্চ থেকেও নেমে গিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ‘‘জীবনে কাউকে সিন্ডিকেট চালাতে দিইনি।’’ পীযূষের সংযোজন, ‘‘দমদম পার্কে অনেক ঘটনা আছে। লালকুঠি থেকে আমরা এত দিন যাদের ঢুকতে দিইনি, আবার তাদের রাজনৈতিক ভাবে কেন ঢোকানো হচ্ছে, সেটা আপনাকে বলতে হবে।’’ ‘ভিখারি’ নামে একজনের কথা উল্লেখ করে পীযূষ বলেন, ‘‘আমাদের অফিসে মেশিন (বন্দুক-পিস্তল) নিয়ে ভয় দেখিয়েছিল, তাকে কেন আপনার পাশে বসা লোকেরা (এলাকায়) ঢোকাচ্ছেন, তার কৈফিয়ত দিতে হবে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘দমদম পার্ক শান্ত আছে। সেটা যেন কোনও ভাবে অশান্ত না-করা হয় সেটা দেখুন। এটা আপনার কাছে আমার অনুরোধ।’’ তার পরেই পীযূষ বলেন, ‘‘এখানে দক্ষিণ দমদম পুরসভার ইও (এগ্জ়িকিউটিভ অফিসার) ম্যাম বসে আছেন। একটা জায়গার ১৮টা লাইটের কন্ট্রাক্ট একটা লোক পেয়েছেন। কেন পেয়েছেন? কার মদতে পেয়েছেন? তার উত্তর দিন।’’ এক মন্ত্রীর সামনে আরেক দলীয় বিধায়কের উত্তেজিত কথাবার্তায় উপস্থিত অনেকে হতভম্ব হয়ে পড়েন।
মঙ্গলবার পর পর যা ঘটল, তাতে ‘বিস্মিত’ স্থানীয় বিজেপি নেতাকর্মীরা। ঘটনাক্রম নিয়ে কাটাছেঁড়া শুরু হয়ে গিয়েছে বিজেপির অন্দরে। বিজেপি কর্মীদের একাংশের মতে, সাধারণত এক বিধায়কের দরবারে অন্য বিধায়কের উপস্থিতি লক্ষ করা যায় না। মঙ্গলবার ঠিক তার উল্টোটাই ঘটেছে। বিধাননগরের বিধায়কের দরবারে পীযূষের আসার কারণ নিয়ে সন্দিহান শারদ্বত ‘ঘনিষ্ঠ’ বিজেপি কর্মীদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, যে অভিযোগগুলো জমা পড়েছিল তা পড়ে শোনাচ্ছিলেন শারদ্বত। সেখানে হঠাৎ করে ‘সিন্ডিকেট’ থেকে টাকা নেওয়া, না-নেওয়ার অভিযোগ খণ্ডন করতে থাকেন পীযূষ। স্থানীয় এক বিজেপি নেতার কথায়, ‘‘পীযূষবাবু নিজে থেকেই সিন্ডিকেট নিয়ে সাফাই দিতে শুরু করেন। এ তো ঠাকুরঘরে কে রে হয়ে গেল!’’
মঙ্গলবারের ঘটনা নিয়ে শারদ্বত বলেন, ‘‘আমার বিধানসভার অন্তর্গত বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলছিলাম। সেখানে এসে পাশ্ববর্তী বিধানসভার বিধায়ক পীযূষ কানোরিয়া এসে নীচে বসে পড়েন। পরে আমি বলায় উপরে উঠে এসে বসেন। বাকি কী হয়েছে না হয়েছে, তা নিয়ে দল যদি আমার কাছে কিছু জানতে চায়, তবে দলকে জানাব।’’ পীযূষের দাবি, ‘‘দমদম পার্কে আমার আদি বাড়ি, আমি ওখানকার বাসিন্দা। উনি বলতে ভুল করেছেন। উনি বলছিলেন পাশের বিধায়ক, হয়তো ভুল করেছেন। তার পর তো দেখলেন উনি কী ভাবে আমাকে ডেকে মঞ্চে বসালেন। আমি কোনও দিন কাউকে দক্ষিণ দমদম পুরসভায় সন্ত্রাস চালাতে দিইনি। চেষ্টা করেছি মানুষের কাজ যেন সঠিক হয়। মানুষ যেন সঠিক বিচার পায়। কেউ যদি তা খণ্ডন করার চেষ্টা করেন, তবে আমি ছেড়ে কথা বলব না।’’
