
দুর্গাপুর, ২২ অক্টোবর : ফের অভিনব কায়দায় গাঁজ পাচার! পিকআপ ভ্যানে বিশেষ বাক্স তৈরী করে তার ওপর নার্সারির চারগাছ নিয়ে যাওয়ার নামে আন্তঃরাজ্য গাঁজা পাচার। ১৯ নং জাতীয় সড়কের অন্ডালের ভাদুর মোড় এসটিএফ ও পুলিশের জালে ধরা পড়ল পড়ল ওই আন্তঃরাজ্য গাঁজা পাচারচক্র। উদ্ধার হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ কুইন্টাল গাঁজা। ঘটনায় জড়িত ৩ জনকে গ্রেফতার করল পুলিশ। শনিবার ধৃতদের আসানসোল আদালতে তোলা হলে বিচারক তাদের জামিন খারিজ করে দেন।
প্রসঙ্গত, পুজোর মরশুমে নাশকতা ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঠেকাতে সক্রিয় আসানসোল-দুর্গাপুর কমিশনাররেট পুলিশ। নাকা চেকিংয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশী চলছে জোরকদমে। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে ১৯ নং জাতীয় সড়কের ওপর অন্ডালের ভাদুর মোড়ে এসটিএফ ও পুলিশ হানা দেয়। গোপনসুত্রে খবর পাওয়া মত একটি পিকআপ ভ্যান আটক করে। গাড়ী ভর্তি নানান চারাগাছ। তারপর সন্দেহজনক গাড়িটি তল্লাশী শুরু করে এসটিএফ ও পুলিশ। পুরোনো গাড়ির দু'দিকের ডালাগুলিতে ছিল নতুন রঙের। এবং ডালাগুলি অস্বাভাবিক মোটা। আর তাতেই আরও সন্দেহ হয়। ডালা খুলতেই চক্ষু চড়কগাছ তদন্তকারীদের। ডালার ভেতর বিশেষ বাক্স। তার মধ্যে থোকা থোকা সাজানো গাঁজার প্যাকেট। এসটিএফ সূত্রে জানা গেছে উদ্ধার হওয়া গাঁজার পরিমাণ ৪ কুইন্টাল ৪৫ কেজি। উদ্ধার হওয়া গাঁজা বাজেয়াপ্ত করে পুলিশ গাড়িটি আটক করা ছাড়াও পাচার চক্রে জড়িত চালক সহ তিনজনকে গ্রেফতার করে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ধৃতদের নাম সুধীর পান্ডে, বিহারের সারান জেলার বেলডির বাসুতি গ্রামের বাসিন্দা। সম্প্রতি ধানবাদে বাহুলিতে থাকে। এছাড়াও বাকি দুজন পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়গপুরের বাসিন্দা সান্টু ভূঁইয়া ও সনৎ ভূঁইয়া। জানা গেছে, ঝাড়খণ্ডের নাম্বার প্লেট লাগানো গাড়িটি পাচারের গাঁজা নিয়ে রওনা দিয়েছিল উড়িষ্যার বিশাখাপত্তনম থেকে নদিয়ার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। শনিবার অভিযুক্তদের আসানসোল জেলা আদালতে তোলা হলে বিচারক ধৃতদের জামিন খারিজ করে দেন।
উল্লেখ্য, চলতি বছর গত ১৭ মে ওড়িষ্যা থেকে এরাজ্যে একইরকম কায়দায় পাচারের আগে কোকওভেন থানার শ্যামপুর মোড় কয়েক লক্ষ টাকার গাঁজা সহ ধরা পড়ে পাচারকারীরা। ওইদিন রাতে গোপনসুত্রে খবর পেয়ে এসটিএফ ও কোকওভেন থানার পুলিশ দুর্গাপুর শ্যামপুর মোড়ে হানা দেয়। এবং তল্লাশী শুরু করে। ওই সময় একটি লরি আটক করে তল্লাশী শুরু করে। তাতে লরির পিছনে বিশেষভাবে তৈরী বক্স নজরে পড়ে। বক্সগুলো খুলতেই গাঁজার বান্ডিল বেরিয়ে আসে। প্রায় ৩০০ কেজি গাঁজা উদ্ধার হয়। পাচার চক্রে শেখ বশির, আনন্দ বিশ্বাস, ঝন্টু ঘোষ, সঞ্জয় মল্লিক, কার্তিক সাহা ও দেবজ্যোতি সরকার ছ'জনকে গ্রেফতার করে। ধৃতরা ওড়িষ্যার জলেশ্বর থেকে একটি লরিতে গাঁজা নিয়ে নবদ্বীপ যাচ্ছিল। গত ১৪ মে পান্ডবেশ্বর ডালুরবাঁধে ইসিএলের জবরদখল আবাসনে গাঁজা সহ দুজন ধরা পড়ে। তাদের কাছ থেকে ৪০ কেজি ৯০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার হয়। গত ২৬ আগষ্ট অন্ডালে পাচারের আগে পুলিশের অভিযানে প্রচুর গাঁজা সহ ধরা পড়ে দুই পাচারকারী। ধৃতদের কাছ থেকে উদ্ধার হয় প্রায় সাড়ে ২২ কেজি গাঁজা। গত ২৪ জুলাই লাউদোহার তিলাবনির জঙ্গলে পাচারের আগে পুলিশের জালে ধরা পড়ে বস্তাভর্তি গাঁজাসহ দুই বমাল। গত ২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর দুর্গাপুর থানার নীলডাঙা এলাকায় পুলিশের জালে ধরা পড়ে এক গাঁজা পাচার কারী। তার কাছ থেকে প্রায় ২৫ কেজি ৪০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার হয়ে। ২০২১ সালের জুলাই মাসে পানাগড় -মোরগ্রাম সড়কের ওপর কাঁকসার হাসপাতালমোড় সংলগ্ন আন্ডারপাশে মাদক সহ দুজন পুলিশ ও এসটিএফের জালে ধরা পড়ে। ধৃতদের সঞ্জিব ভক্ত নদিয়ার পলাশিপাড়ার বাসিন্দা, আর একজন বিধান বৈদ্য বাঁকুড়ার সোনামুখির ডিহিপাড়ার বাসিন্দা। তাদের কাছে প্রায় ৯৭০ গ্রাম হেরোইন, যার বাজার মুল্য প্রায় কোটি টাকার ওপর। এছাড়াও ১০২০ গ্রাম অ্যালপ্রাজোলাম উদ্ধার হয়েছে। এই নেশার ঔষধটি মুলত ঘুমের জন্য ব্যাবহৃত হয়। ২০২১ সালের ডিসেম্বরের গোড়াতে কাঁকসার বনকাটির ১১ মাইল এলাকা থেকে প্রশান্ত রায় নামে এক মাদক পাচারকারী ধরা পড়ে। তার কাছ থেকে ২৬০ গ্রাম ব্রাউনসুগার উদ্ধার হয়। যার আনুমানিক মুল্য প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা। তার আগে ওইবছরই গত ২০২১ সালের ৫ নভেম্বর দুর্গাপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে মনিরুল শেখ, নামে এক যুবককে প্রায় কোটি টাকার হেরোইন সহ গ্রেফতার করে পুলিশ। নদিয়ার পলাশিপাড়া থানা এলাকার বাসিন্দা মনিরুল শেখ উত্তরপ্রদেশ থেকে এই মাদক পাচারের উদেশ্য নিয়ে দূর্গাপুর স্টেশনে নেমেছিল। দুর্গাপুর ষ্টেশনে নামার পর সেখান থেকে স্টেশন বাস স্ট্যান্ডের পিছনের রাস্তা ধরে বাইরে বেরিয়ে আসছিল। ওই সময় পুলিশ সন্দেহজনক ভাবে তাকে আটক করে। তার কথায় অসঙ্গতি থাকায় পুলিশের সন্দেহ হয়। তল্লাশি করতেই তার কাছ থেকে প্রায় ৫০০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার হয়। তারপরই পুলিশ মনিরুলকে গ্রেফতার করে। এছাড়াও ২০১৮ সালের আগষ্ট মাসে ২৮০ গ্রাম হেরোইন ও আগ্নেয়াস্ত্র সহ তিনজন সুপারিকিলার ধরা পড়ে দুর্গাপুর বেনাচিতির উত্তরপল্লী এলাকায়। সম্প্রতি গত ২৯ সেপ্টম্বর দূর্গাপুজোর আগে লক্ষাধিক টাকার ব্রাউন সুগার সহ অন্ডালের কাজোড়া লছিপুর এলাকায় দুজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের কাছে প্রায় ২৩ গ্রাম ব্রাউন সুগার উদ্ধার করে পুলিশ। পুজোর মরশুমে আবারও এদিনের ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই শোরগোল পড়েছে শিল্পাঞ্চলজুড়ে। প্রশ্ন এখানেই, পুজোর মরশুমে কি সক্রিয় মাদকপাচারকারীরা? মাদকপাচারকারীরা কি শিল্পাঞ্চলকে করিডর হিসাবে ব্যাবহার করছে? যদিও এদিনের ঘটনায় পুলিশ জানিয়েছে," ধৃতদের আদালতে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। ঘটনার তদন্ত চলছে। নাকা চেকিং জারি আছে।"
