
কলকাতা, ২ আগস্ট : কোভিডের পর পশ্চিমবঙ্গে শিশুপাচারের ঘটনা দ্বিগুণ। এই ঘটনা কতটা সত্যি? কতটা নাড়া দিয়েছে এ রাজ্যের সংশ্লিষ্ট মহলকে?
গেমস ২৪x৭ এবং কৈলাশ সত্যার্থী চিলড্রেন্স ফাউন্ডেশন সংকলিত ভারতে শিশুপাচার সংক্রান্ত রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে কোভিড-পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গে শিশু পাচারের ঘটনা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত এক দশকে, সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি একটি সক্রিয় অবস্থান নিয়েছে, যার ফলে অভিযোগের সংখ্যা বেড়েছে, যদিও জনসচেতনতা বৃদ্ধি এখনও সমস্যাদীর্ণ।
কার্যকরভাবে শিশু পাচার প্রতিরোধের জন্য দেশে একটি সামগ্রিক পাচার-বিরোধী আইন প্রণয়ন প্রয়োজন।
ভারতে শিশুপাচার সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন অনুসারে, কোভিড-পরবর্তী বছরগুলিতে (২০২১-২২) পশ্চিমবঙ্গে শিশুপাচারের গড় সংখ্যা কোভিড-পূর্ব বছরগুলির (২০১৬-২০২০) ৩৫ থেকে ৭২ হয়েছে অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। মহামারী-পরবর্তীকালে শিশুপাচারের ঘটনা বৃদ্ধিতে শীর্ষ দশের তালিকায় থাকা অন্যান্য রাজ্যগুলির মধ্যে রয়েছে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্ণাটক, দিল্লি ও রাজস্থান।
মাটিগাড়াতে আয়োজিত সাম্প্রতিক পাচার-বিরোধী কনক্লেভেও আলোচনা হল বিষয়টি। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর যে অসংখ্য নারী ও শিশু ভারতে পাচার হয়ে আসেন, তাদের পুনর্বাসন বা দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া এখনও বেশ কঠিন রয়ে গেছে বলে বিশেষজ্ঞরা স্বীকার করছেন।
ভারতে সরকারি কর্মকর্তা ও এনজিও-কর্মীরা বলছেন এক্ষেত্রে আইনি জটিলতা ও কূটনৈতিক বাধা এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছে না, ফলে ভারতের বহু সরকারি হোমে বাংলাদেশী নারীরা বছরের পর বছর কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।
পরিস্থিতি যে এতটা জটিল, তা মানতে রাজি নন পশ্চিমবঙ্গ শিশু সুরক্ষা কমিশনের চেয়ারপার্সন তথা চলচ্চিত্র পরিচালক সুদেষ্ণা রায়। প্রশ্নের উত্তরে এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, “অনেকে এ ব্যাপারে অনেক রকম তথ্য দেয়। কার তথ্য আপনি নিচ্ছেন, সেটা কিন্তু বিবেচ্য বিষয়। আর, কত নিখোঁছ যে ফিরে আসছে, তার ওপর গুরুত্ব দেবেন না?”
শিশুপাচার নিয়ে প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে কাজ করছেন সত্যগোপাল দে। তিনি স্বীকার করেছেন, এটা একটা বড় সমস্যা। এই সঙ্গে দাবি করেছেন, “আজ পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে শিশুপাচার বাড়েনি। এই রাজ্যের বিস্তীর্ণ গোলা সীমান্ত এর একটা বড় কারণ। খেবল বাংলাদেশ নয়, অন্য কিছু সামগ্রির মত শিশুও পাচার হচ্ছে।“
তাহলে সমাধানের পথ কী? সত্যগোপালবাবুর মতে, “ওইভাবে কোনও সাধানসূত্র দেওয়া যাবেনা। যৌন এবং অঙ্গপাচার— মূলত এই দুই কারণে শিশু পাচার হয়। গ্রামের অভাবীদের ভুল বুঝিয়ে বা প্রলুব্ধ করে বিয়ের নামে কিশোরীদের নিয়ে আসা হয়। কিন্তু সেগুলো যে ছলনা, সেটা বোঝা যায় পড়ে।”
নারীপাচারের পাশাপাশি উদ্ধার-পরবর্তী সমস্যাও একটা বড় জটিলতা। মাটিগাড়ার সভায় ভারতের নামী অ্যান্টি-ট্র্যাফিকিং বিশেষজ্ঞ ড: পি এম নায়ার বলেন, ভারতে পাচার হওয়া বাংলাদেশী বা নেপালীদের প্রত্যাবাসনে প্রধান সমস্যা হল ভারতের আদালতে তাদের জন্য একটা ‘হোম ভেরিভিকেশন রিপোর্ট’ জমা দিতে হয়। এটা একটা আইনি বাধ্যবাধকতা – যাতে ওই বিদেশিরা কোথাকার লোক, কী তাদের পরিচয় সে সব তথ্য সংগ্রহ করে ও যাচাই করে আদালতকে জানাতে হয়। অনেক সময় বাংলাদেশ থেকে সে রিপোর্ট জোগাড় করতে বহু মাস, কখনও বা বহু বছরও গড়িয়ে যায়। এই রিপোর্ট দ্রুত হাতে পাওয়ার যেহেতু কোনও উপায় নেই, ফলে ভিক্টিমদেরও নীরবে যন্ত্রণা সয়ে যেত হয় দিনের পর দিন।
পশ্চিমবঙ্গ শিশু অধিকার সুরক্ষা আয়োগ কিছুকাল আগে এক মজার খেলার আদলে কচিকাঁচাদের মধ্যে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। যে কোনো বিষয় খেলার ছলে শেখানো হলে শিশুরা রপ্ত করতে পারে সহজে। সেই ভাবনা থেকেই পশ্চিমবঙ্গ শিশু অধিকার সুরক্ষা আয়োগ কিশোর-কিশোরীদের উপহার দিল অভিনব এক খেলা। সাপলুডোর মতোই বোর্ডগেম। নাম ‘ফাঁদমুক্তি’।
শিশুদের ধর্মীয় এবং নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রাচীন ভারতে চালু হয়েছিল সাপলুডো খেলা। অনেকে বলেন, ত্রয়োদশ শতকে সন্ত জ্ঞানদেব এই খেলার প্রচলন করেন। তবে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকেও এরকম খেলা ছিল, তার প্রমাণ মিলেছে। এখন সারা বিশ্বে সাপলুডো জনপ্রিয়। পশ্চিমবঙ্গ শিশু অধিকার সুরক্ষা আয়োগ এবার সেই মজার খেলার আদলেই কচিকাঁচাদের মধ্যে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিল।
যে কোনও বিষয় খেলার ছলে শেখানো হলে শিশুরা রপ্ত করতে পারে সহজে। সেই ভাবনা থেকেই পশ্চিমবঙ্গ শিশু অধিকার সুরক্ষা আয়োগ কিশোর-কিশোরীদের উপহার দিল অভিনব এক খেলা। সাপলুডোর মতোই বোর্ডগেম। নাম ‘ফাঁদমুক্তি’। শিশুপাচার, শিশুদের যৌন নির্যাতন, বাল্যবিবাহ এবং আরও নানা সামাজিক সমস্যা নিয়ে অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের মনে স্বচ্ছ ধারণা জাগানোই উদ্দেশ্য। সঠিক আচরণ, পড়াশোনায় মনোযোগ প্রভৃতি ইতিবাচক অভ্যাস গড়ে তোলায় জোর দেওয়া হয়েছে। সরকারি নানা প্রকল্পের উপকারিতাও তুলে ধরছে এই খেলা।
খেলাটির পরিকল্পনা করেছেন ডঃ শুভ্রজ্যোতি মুখোপাধ্যায়। একটানা ১০ বছর ধরে তিনি শিশু সুরক্ষা এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর চিন্তাধারাকে সার্থক রূপ দান করেন সোমা মুখোপাধ্যায়, যিনি গত ১৫ বছর ধরে শিশুদের জন্য নানারকম খেলা এবং খেলনার উদ্ভাবন করে আসছেন। উপদেষ্টা হিসেবে আছেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক সুদেষ্ণা রায়। তাঁর কথায়, “শিশুদের জীবনে কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ, সেটা বোঝার জন্যই এই খেলা। নিজেদের সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি অধিকার সম্পর্কেও জানতে পারবে তারা।”
