Editorial

2 hours ago

একতার শক্তিই ইউরোপের ভবিষ্যৎ

G7 summit
G7 summit

 

বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যে ইউরোপ একসময় আমেরিকার নিরাপত্তা ছাতার নিচে নিশ্চিন্তে নিজের অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও সামাজিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে গিয়েছিল, সেই ইউরোপ আজ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী অবস্থান, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অনিশ্চয়তা এবং পশ্চিমা জোটের অভ্যন্তরে দেখা দেওয়া মতপার্থক্য ইউরোপকে একটি কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে—নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কি এবার নিজেদেরই নিতে হবে? দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ন্যাটো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই সামরিক জোট ইউরোপকে স্থিতিশীলতা দিয়েছে, শীতল যুদ্ধের উত্তেজনা সামলেছে এবং বহু সংকটের সময় নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করেছে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে সেই নিশ্চয়তা আর আগের মতো অবিচল বলে মনে হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতা ইউরোপীয় নেতাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে—যদি একদিন আমেরিকা তার ভূমিকা সীমিত করে দেয়, তাহলে ইউরোপের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে?এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ইউরোপের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে অভ্যন্তরীণ বিভাজন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক শক্তি, সামরিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এক নয়। ফ্রান্স যেখানে ইউরোপীয় কৌশলগত স্বাধীনতার পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে সওয়াল করছে, সেখানে জার্মানি অনেক সময় বাস্তববাদী অর্থনৈতিক হিসাবকে অগ্রাধিকার দেয়। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো রাশিয়ার হুমকিকে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা সংকট হিসেবে দেখে, আবার দক্ষিণ ইউরোপের কিছু দেশ অভিবাসন ও অর্থনৈতিক চাপকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে একটি অভিন্ন প্রতিরক্ষা নীতি গড়ে তোলা সহজ কাজ নয়।তবে ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ইউরোপ যখন বিভক্ত হয়েছে তখন সংকট বেড়েছে, আর যখন এক হয়েছে তখন শক্তি অর্জন করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্ম হয়েছিল সহযোগিতার ভিত্তিতে। অর্থনীতি, বাণিজ্য, শিক্ষা ও মানবাধিকার—সবক্ষেত্রেই এই সহযোগিতা ইউরোপকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অঞ্চলে পরিণত করেছে। এখন সেই সহযোগিতার প্রয়োজন প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপীয় দেশগুলো যৌথ প্রতিরক্ষা প্রকল্প গ্রহণের চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রায়শই দেখা গেছে জাতীয় স্বার্থ, শিল্পগত প্রতিযোগিতা এবং রাজনৈতিক মতবিরোধ সেই উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করেছে। একটি দেশ চায় প্রযুক্তির নেতৃত্ব, অন্য দেশ চায় উৎপাদনের দায়িত্ব, আর তৃতীয় দেশ চায় অর্থনৈতিক সুবিধা। ফলস্বরূপ, যে প্রকল্পগুলো ইউরোপকে আরও শক্তিশালী করতে পারত, সেগুলোর অনেকই মাঝপথে থমকে গেছে এখানেই মূল শিক্ষা লুকিয়ে আছে। আধুনিক বিশ্বের নিরাপত্তা কেবল ট্যাঙ্ক, যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না। এটি নির্ভর করে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, শিল্পভিত্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার প্রতিরক্ষা এবং রাজনৈতিক ঐক্যের ওপর। একটি দেশ একা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, বহুমাত্রিক এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা তার পক্ষে কঠিন। কিন্তু একত্রিত ইউরোপ সেই সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে নিরাপত্তা এবং অর্থনীতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগ মানে শুধু অস্ত্র কেনা নয়; এটি নতুন কর্মসংস্থান, গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং শিল্পোন্নয়নের সুযোগও তৈরি করে। যদি ইউরোপ যৌথভাবে প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ করে, তাহলে শুধু সামরিক শক্তিই নয়, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও শক্তিশালী হবে। একইসঙ্গে বাইরের প্রযুক্তি ও অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমবে।কিন্তু প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কেবল অর্থনৈতিক বা সামরিক বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্নও। ইউরোপের দেশগুলোকে বুঝতে হবে যে জাতীয় স্বার্থ এবং যৌথ স্বার্থ সবসময় পরস্পরবিরোধী নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে যৌথ স্বার্থই জাতীয় স্বার্থকে সুরক্ষিত করে। একটি দেশ যদি এককভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, তবে তার ব্যয় ও ঝুঁকি বহুগুণ বাড়বে। কিন্তু একসঙ্গে কাজ করলে সেই দায়িত্ব ও ব্যয় ভাগাভাগি করা সম্ভব।আজকের পৃথিবীতে রাশিয়ার মতো সামরিক চ্যালেঞ্জ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সাইবার হামলা, ভুয়ো তথ্য প্রচার, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার মতো নতুন হুমকি। এসব মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত কৌশল। কোনো একক রাষ্ট্র একা এই লড়াই জিততে পারবে না। তাই ইউরোপের সামনে পথ একটাই—সহযোগিতা, সমন্বয় এবং পারস্পরিক আস্থা।

ইউরোপের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে কেবল তার সামরিক শক্তি দিয়ে নয়, বরং তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে। যদি দেশগুলো সংকীর্ণ জাতীয় প্রতিযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করতে পারে, তাহলে ইউরোপ শুধু নিজের নিরাপত্তাই নিশ্চিত করবে না, বরং বিশ্ব রাজনীতিতেও আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন অবস্থান গড়ে তুলবে।বর্তমান সময় ইউরোপকে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড় করিয়েছে। বিভক্তির পথ তাকে দুর্বল করবে, আর সহযোগিতার পথ তাকে শক্তিশালী করবে। ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে ইউরোপের সবচেয়ে বড় অর্জন এসেছে ঐক্যের মাধ্যমে। নতুন এই অনিশ্চিত যুগেও সেই সত্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ইউরোপের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির চাবিকাঠি আজও একটাই—সহযোগিতা।

You might also like!