
দূরন্ত বার্তা ডিজিটাল ডেস্ক: বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ বারই প্রথম দুর্গাপুজো। স্বাভাবিকভাবেই এবারের পুজো ঘিরে বাড়তি আগ্রহ রয়েছে বঙ্গবাসীর। এরই মধ্যে থিমপুজো নিয়ে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নির্গুণানন্দ মহারাজের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে বিতর্ক। সেই আবহেই সোমবার পুজো কমিটিগুলির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৈঠক শেষে থিমপুজো-সহ পুজো আয়োজনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রাজ্য সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি। এদিন স্পষ্ট তিনি জানান, থিমপুজো চাইলে করা যেতেই পারে। তবে পুজো কমিটিগুলিকে খেয়াল রাখতে হবে, যাতে কোনওভাবেই সনাতনী সংস্কৃতিতে আঘাত না লাগে। তাই থিম ভাবনাচিন্তার ক্ষেত্রে পুজো কমিটিগুলিকে আরও সতর্ক হতে হবে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। বলে রাখা ভালো, সম্প্রতি নির্গুণানন্দ মহারাজ থিমপুজো নিয়ে নিজের মতামত জানান। তিনি স্পষ্ট দাবি করেন, থিমপুজো করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে দেশের নানা জায়গার মন্দিরকে থিম হিসাবে বেছে নিতে পারেন পুজো কমিটির সদস্যরা। কারণ, মন্দিরেই অধিষ্ঠান দেবীর। এদিন শুভেন্দুর বক্তব্যেও সেই একই প্রতিফলন বলেই মনে করছেন অনেকে।
এরপরই পুজো নিয়ে একাধিক সিদ্ধান্তের কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী। জানালেন, পুজো কমিটি গুলোকে অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে ১ লক্ষ টাকা। লাগবে না বিদ্যুতের টাকা। তবে স্পষ্ট করে দিলেন, মাতৃপক্ষের আগে কোনও পুজো উদ্বোধন হবে না। অর্থাৎ মহালয়ার পরই হবে উদ্বোধন। কার্নিভালও হবে না। তবে সরকারের তরফে শারদ সম্মানের আয়োজন করা হবে। তৃণমূল জমানায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুজো কমিটিগুলোকে অনুদান দেওয়া শুরু করেছিলেন। প্রথম বছর সব ক্লাবকে দেওয়া হয়েছিল ২৫ হাজার টাকা। পরবর্তীকালে বেড়েছে অনুদানের পরিমাণও। গতবছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে দুর্গাপুজোর অনুদান বাবদ ক্লাবগুলো পেয়েছিল ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা করে। তবে পালাবদলের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, বড় ক্লাবগুলোকে আর্থিক অনুদান দেওয়া হবে না। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হবে সেদিকেই নজর ছিল সকলের। সোমবার পুজো বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী জানালেন, সব ক্লাবকে অনুদান বাবদ দেওয়া হবে ১ লক্ষ টাকা। তবে বড় পুজো কমিটিগুলোকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন, “বড় বাজেটের কমিটিকে আবেদন, আপনারা আর্থিক সাহায্য নেবেন না। আপনাদের আমি ধন্যবাদ জানাব।” পাশাপাশি অনুদানের জন্য কীভাবে আবেদন করতে হবে, তাও জানান তিনি। এদিন মুখ্যমন্ত্রী জানান, এবারের পুজোয় বিদ্যুৎ ও দমকলের কোনও খরচ লাগবে না। গত কয়েকবছর বাংলায় পুজো উদ্বোধন হয়েছে আগেভাগেই। এবার শুভেন্দু স্পষ্ট জানিয়েছেন, মহালয়ার আগে কোনও পুজো উদ্বোধন হবে না। মহালয়ায় ইডেন গার্ডেনে মেগা শোর মাধ্যমে পুজোর উদ্বোধন করা হবে। মমতা জমানায় কার্নিভ্যাল দেখেছে বাংলা। তবে এবার আর তা হবে না। এদিন মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২৪ অক্টোবরের মধ্যে বিসর্জনের প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। বিসর্জনে ব্যবহার করা যাবে না ক্রেন।
আজ মিলন মেলা প্রাঙ্গনে পুজো বৈঠক থেকে শহর থেকে জেলার ক্লাবগুলির জন্য অনুদান ঘোষণা করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই বৈঠক থেকেই মুখ্যমন্ত্রীর সাফ বার্তা, অষ্টমীর দিন রাজ্যের সব মদের দোকান বন্ধ থাকবে। মহাষ্টমীতে দিনভর কোনও বারেও মিলবে না মদ। পুজোর চার দিন, অর্থাৎ ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত মদের দোকান খোলা থাকে রাজ্যে। আর পুজোর ক’দিন চাহিদাও যে তুঙ্গে থাকে, তা একাধিক মদের দোকানের বাইরের লম্বা লাইনের ছবিটাই প্রমাণ করে দেয়। কিন্তু এবার চারদিনের মধ্যে একদিন মদের দোকানের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করল সরকার। শুভেন্দু অধিকারী জানান, যে দিন মা দুর্গার পায়ে অঞ্জলি দেবেন, সেদিন রাজ্যে সব মদের দোকান বন্ধ থাকবে। শুধু তাই নয়, কোনও বারেও মদ মিলবে না বলে জানিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী। অর্থাৎ আগে শুধুমাত্র দশমীতে ‘ড্রাই ডে’ থাকত। এবার পুজোয় সব মিলিয়ে দু’দিন বন্ধ দুর্গাপুজোয়।
পুজোয় বাজবে না ডিজে। বিসর্জনেও নিষিদ্ধ ডিজে। কড়া নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শারদোৎসবে সেই কথা জানিয়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। নতুন সরকারের আমলে প্রথম দুর্গাপুজোকে ঘিরে মেগা পরিকল্পনা বিজেপি সরকারের। রাজ্যে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পরই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতার রেড রোডে দুর্গাপুজোর কার্নিভ্যালের সূচনা করেছিলেন। নাম করা পুজো কমিটিগুলির প্রতিমা রেড রোডে ওই কার্নিভ্যালে আনা হত। একাধিক অনুষ্ঠানও হত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৎকালীন মন্ত্রিরা ছাড়াও বিশিষ্টরা উপস্থিত থাকতেন। প্রতিবছর সেই কার্নিভ্যাল আড়ে-বহরে বাড়তেও থাকে। পুজো শেষ হয়ে গেলেও কেন কার্নিভ্যাল হবে? সেই প্রশ্ন বারেবার তুলেছে সেসময়ের বিরোধীরা। এবার সেই কার্নিভ্যালই বন্ধ হল নতুন সরকারের আমলে। কার্নিভ্যালের সবুজ সংকেত কি বিজেপি সরকার দেবে? সেই চর্চা বেশ কিছুদিন ধরেই চলছিল। মিলনমেলার মঞ্চ থেকে আজ, সোমবার মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করলেন এবার থেকে কার্নিভ্যাল হবে না। নির্দিষ্ট রীতি-রেওয়াজ মেনেই দুর্গাপুজো হবে। তৃণমূল আমলে রেড রোড ছাড়াও জেলায় জেলায় কার্নিভ্যাল হত। সেসব কার্নিভ্যালও বন্ধ এবার থেকে। বিগত সরকারের সময় প্রতিমা বিসর্জনের সময় ক্রেন ব্যবহার করা হত। সেই নিয়েও বিভিন্ন মহলে বিতর্ক, প্রশ্ন ছড়িয়েছিল। এবার বিসর্জনের ক্ষেত্রেও কোনও ক্রেন ব্যবহার হবে না। ঘাটে কোনও ক্রেন ব্যবহার হবে না। সেই কথাও জানিয়ে দেওয়া হল।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এই প্রস্তুতি বৈঠকে সরকারি আমন্ত্রণপত্রে দশভুজার ১১ হাত বিশিষ্ট ছবি ঘিরে তৈরি হয় বিতর্ক। যদিও সেই বিতর্কে ইতি টেনে নিজেই ক্ষমা চেয়ে নিলেন শুভেন্দু অধিকারী। শুধু তাই নয়, এই বিষয়ে বিজ্ঞাপন সংস্থাকে যে সতর্ক করা হয়েছে তাও জানান তিনি। আগামিদিনে সরকার এক্ষেত্রে সতর্ক থাকবে বলেও মন্তব্য মুখ্যমন্ত্রীর। এদিন মিলন মেলা প্রাঙ্গণে সমস্ত পুজো কমিটিগুলির সঙ্গে বৈঠকে বসেন মুখ্যমন্ত্রী। তাৎপর্যপূর্ণ এই বৈঠকের আগে সরকারি একটি আমন্ত্রণপত্র উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছায়। এমনকী একাধিক সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়। সেখানে যে দুর্গার ছবি ব্যবহার করা হয়, তিনি একাদশভুজা! ১১টি হাতে একটি অস্ত্র অতিরিক্ত, তবে তা বোঝা যাচ্ছে না। আর এনিয়েই বিতর্ক তৈরি হয়। বিষয়টি সর্বপ্রথম নজরে আনেন সিপিএম নেতা শতরূপ ঘোষ। তিনি কটাক্ষ করে বলেন, ‘‘একটা চমৎকার সরকারী বিজ্ঞাপন! এখানে মা দুর্গার এগারোটা হাত। দেবতাদের পক্ষ থেকে দুর্গাকে দশ হাতে অস্ত্র দেওয়া হয়েছিল অসুর বধের জন্য। আর বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে ঠাকুরকে একটা এক্সট্রা হাত দেওয়া হয়েছে, পুজোর সময় বাঙালির উপর কেউ নিরামিষ খাওয়ার ফতোয়া জারি করতে এলে তাকে কানের গোড়ায় থাবড়া মেরে প্যান্ডেল এবং বাংলা থেকে বের করে দেওয়ার জন্য।” এমনকী বিভিন্ন স্তরে এই বিষয়ে শুরু হয় বিতর্ক। এরপরেই এই বিষয়ে মুখ খোলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মিলন মেলা প্রাঙ্গনে পুজো বৈঠকের শুরুতেই তিনি বলেন, ”প্রথমেই আমি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আজকে ত্রুটিপূর্ণ একটি বিজ্ঞাপন সকালে বেরিয়েছিল। এজন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। যারা এই ত্রুটিপূর্ণ বিজ্ঞাপন দিয়েছেন তাঁদের সতর্ক করা হয়েছে। পরবর্তীকালে সরকার এই বিষয়ে যত্নবান থাকবে।” বলে রাখা প্রয়োজন, এর আগে এই ইস্যুতে মুখ খোলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও। সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে তিনি স্পষ্ট জানান, ”মা দুর্গা আরও শক্তিশালী হয়ে গিয়েছেন! যদিও আমি বিজ্ঞাপনটি দেখিনি। দেখুন কোন এজেন্সি ছাপতে গিয়ে ভুল করেছে। এগুলো কি রাজনীতির বিষয়? সংশোধন করে নেবে।”
